বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/৬ষ্ঠ/যশোধরা রায়চৌধুরী
সংখ্যা/২১শে আষাঢ়, ১৪৩১
যশোধরা রায়চৌধুরী সংখ্যা | ধারাবাহিক গল্প
রাখি সরদার
চক্ষুদান
[১ম পর্ব]
"কমলেশ হঠাৎ মেজাজ হারিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,
“এর আগে কোনদিন এমন হয়েছে! গণেশের চোখ আঁকতে গিয়ে পাগলা হাতি আমাকে তাড়া করেছে?”
হীরু তাড়াতাড়ি একটা বিড়ি দেয়।"
সাদা সাদা কুসুম ছাওয়া আকাশ। ধুলোবাতাসে কাশের
গন্ধ। ঘাসে ঘাসে আলতো শিশিরের ফোঁটা। কুমোরটুলি
পাড়ায় ব্যস্ততা। খড়, বাঁশ, গর্জনতেল, দোমেটের
ঘ্রাণ। আজকের রাত পোহালেই মহালয়া। কুমোরটুলির শিল্পালয়ে শিল্পালয়ে প্রতিমা
বায়নাদারদের ভিড়। কার প্রতিমা কতটা সুন্দর হচ্ছে তার প্রতিযোগিতা। কমলেশ গণেশ
মূর্তির সামনে রং তুলি নিয়ে বসেই থাকে। কী যে ভাবছে! মিলন হালদার কমলেশের পিছনে
এসে দাঁড়ায়, “এই কমল বসে আছিস যে!
আজকের মধ্যে এই এতগুলো সিংহ, ময়ূর, প্যাঁচার চোখ
আঁকতে পারবি তো? দ্যাখ তুই কখন কাজটা করবি জানি না। কিন্তু কাল তোকে মায়ের
চক্ষুদান করতে হবে কথাটা মনে রাখিস। আজকাল তোর কাজে যেন মন নেই, কেন?
“এই যে করছি, আজ এগুলো সব কমপ্লিট করব।’’
গজগজ করতে করতে মিলন অন্যদিকে চলে যায়। কুমোরটুলিতে মিলনের আরও একটা স্টুডিয়ো। সেখানে সব থিমের প্রতিমা তৈরি হয়। এই স্টুডিয়োটা আগে নিখিলেশ পালের ছিল। নিখিলেশ পাল কমলেশের বাবা। বাবার কথা মনে পড়াতে কমলেশ আনমনা হয়ে পড়ে। তার বাবা যখন বেঁচে ছিলেন এই স্টুডিয়ো ছিল প্লাস্টিক ছাউনি দেওয়া বাঁশের চালা। তখন এমন পাকাপোক্ত ছাউনি ছিল না। এই চালায় কত কর্মচারী কাজ করত। কতজনকে তার বাবা ধরে ধরে মূর্তি গড়া শিখিয়েছে। সে নিজেও তার বাঁহাতটি নিয়ে বাবার কাছে কাজ শিখেছে। জন্ম থেকেই তার ডানহাতটি ছিল না। সে-কারণে বাবা কোনোদিন তাকে ভারী কাজ দেয়নি। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে বাড়ি ফিরে তার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলত,
“খোকা দুঃখ করিস না। একটা হাত নেই তো কী হয়েছে, চোখ তো আছে। তোকে ওই এক হাতেই মায়ের
চোখ আঁকা শিখিয়ে দেব। সারাজীবন মূর্তির চোখ এঁকেই তোর সংসার চলে যাবে। চোখ আঁকা কী মুখের কথা! এই চোখ দিয়েই তো জগতজননী গোটা সংসারকে আগলে রেখেছেন।”
অকস্মাৎ তাদের তিনজনের সুখের সংসারে বজ্রপাত নেমে এল। গতবছর দুর্গাপ্রতিমার অনেক অর্ডার পেয়েছিল। আনন্দে সেবার নৌকা ভাড়া করে উলুবেড়িয়া থেকে মাটি আনতে গিয়ে ফেরার পথে নৌকাতেই তার বাবা মারা যায়। সংসার অচল হয়ে পড়ে। এই মিলন হালদার তাদের থেকে এই চালা ও প্রতিমা তৈরির সাজসরঞ্জাম কিনে দেয়। মিলনের মধ্যে কোনোরকম শিল্পীসত্তার ছিটেফোঁটা নেই। একসময় পাড়ার মস্তান ছিল। কীভাবে যেন তার হাতে প্রচুর টাকা আসে। কুমোরটুলিতে দুটো স্টুডিয়ো এখন। দয়াপরবশ তাকে কাজটা দেয়। এখানে তার মতো প্রতিমার এত জীবন্ত চোখ আঁকতে আর কেউ পারে না। কিন্তু আজ তার সঙ্গে এমন হচ্ছে কেন! কেন আঁকতে পারছে না! তবে কী তার সাধনায় বিঘ্ন ঘটল! প্রতিবারের মতো সে এবারও গণেশজির চোখ আঁকতে যায় কিন্তু পারে না। বাবার শেখানো মন্ত্র ‘ওঁ গং গণপতয়ে নমঃ’ পাঠ করে। তারপর তুলি নিয়ে চোখ আঁকতে গিয়েই বিপত্তি। তার মনে হলো এক বুনো হাতি তার দিকে তেড়ে আসছে। এই বুঝি তার বৃহৎ শুঁড়ে তুলে তাকে আছাড় মারবে! হাতের তুলি ফেলে ভয়ার্ত চোখে কমলেশ উঠে দাঁড়ায়। পাশে বসে হীরু ঠাকুরের চুল বুনছিল। কমলেশকে ওভাবে উঠে দাঁড়াতে দেখে হীরু বলে ওঠে,
“কী হল কমলদা! ওভাবে উঠে পড়লে যে! তুমি তো এখনও চোখ আঁকা শুরুই করলে না! এত কাজ কখন শেষ করবে?’’
কমলেশ শঙ্কিতস্বরে বলে ওঠে,
“কীভাবে আঁকি বল তো? গণেশের চোখ আঁকতে যাব-কী মনে হল একটা পাগলা হাতি তেড়ে আসছে!”
“হা-হা-হা-, কমলদা, তোমার না মাথাটা গিয়েছে। চুপ করো, অন্যেরা শুনলে কথাটা মিলনদার কানে পৌঁছতে
সময় লাগবে না। আর সুরথদা শুনলে তোমার কাজটা স্রেফ খেয়ে ফেলবে। মিলনদা সুরথদার কথায় ওঠে-বসে। সুরথদা তোমাকে এখান থেকে তাড়াতে পারলে বাঁচে। পারছে না কেবল দীনু কাকার জন্য। দীনু কাকা তোমাকে বড্ড ভালবাসে।”
“দে, একটা বিড়ি দে, বাইরে গিয়ে ফুঁকে আসি।’’
“এখন বিড়ি খাবে! তুমি তো মূর্তির চোখ আঁকার সময় কোনদিন খাও না!”
কমলেশ হঠাৎ মেজাজ হারিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,
“এর আগে কোনদিন এমন হয়েছে! গণেশের চোখ আঁকতে গিয়ে পাগলা হাতি আমাকে তাড়া করেছে?”
হীরু তাড়াতাড়ি একটা বিড়ি দেয়। কমলেশ বিড়িটা নিয়ে বাইরে চলে যায়। সেইসময় মিলন ফিরে আসে। হীরুর দিকে তাকিয়ে গলা চড়ায়,
“হীরু, কমলকে বাইরে দেখলাম যে! কাজে ফাঁকি দিচ্ছে?”
পরক্ষণেই গণেশ মূর্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝিয়ে ওঠে,
“একি! একটারও চোখ আঁকেনি!”
মিলনের হাঁকডাকে অন্যান্য কর্মচারীরা এসে জড়ো হয়। সুরথ বলে ওঠে,
“কতবার তোকে বলছি মিলন ওকে বাদ দে। খোঁড়া ল্যাংড়াদের দিয়ে হবে না। আরে শিল্পীর কী অভাব।”
হীরুর দিকে তাকিয়ে সুরথ চতুর চোখে বলে,
“এই হীরু, তোর উপর একটু আগে বাবু মেজাজ দেখাচ্ছিল না? কী হয়েছিল?’’
“না, মানে, ও কিছু না।”
মিলন ধমকায়,
“এই তোতলাবি না। কী বলছিল কমল?”
“কমল দা একটা বিড়ি চাইছিল। কাজের সময় তো কমলদা নেশা করে না, সে বিষয়ে বলাতে কমলদা চটে গিয়েছিল।”
সুরথ বলে ওঠে,
“বাবুর কী চোখ আঁকতেও কষ্ট! নাকি সব ছেড়েছুড়ে বিরাগী হবে! আমাদের মতো তো গাধার খাটুনি খাটতে
হয় না। মাটি তৈরি, কাঠামো বানানো। করিস তো বাপু ওই মায়ের মুখ গড়া আর মূর্তিগুলোর চোখ আঁকা।”
“এই যে করছি, আজ এগুলো সব কমপ্লিট করব।’’
গজগজ করতে করতে মিলন অন্যদিকে চলে যায়। কুমোরটুলিতে মিলনের আরও একটা স্টুডিয়ো। সেখানে সব থিমের প্রতিমা তৈরি হয়। এই স্টুডিয়োটা আগে নিখিলেশ পালের ছিল। নিখিলেশ পাল কমলেশের বাবা। বাবার কথা মনে পড়াতে কমলেশ আনমনা হয়ে পড়ে। তার বাবা যখন বেঁচে ছিলেন এই স্টুডিয়ো ছিল প্লাস্টিক ছাউনি দেওয়া বাঁশের চালা। তখন এমন পাকাপোক্ত ছাউনি ছিল না। এই চালায় কত কর্মচারী কাজ করত। কতজনকে তার বাবা ধরে ধরে মূর্তি গড়া শিখিয়েছে। সে নিজেও তার বাঁহাতটি নিয়ে বাবার কাছে কাজ শিখেছে। জন্ম থেকেই তার ডানহাতটি ছিল না। সে-কারণে বাবা কোনোদিন তাকে ভারী কাজ দেয়নি। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে বাড়ি ফিরে তার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলত,
“খোকা দুঃখ করিস না। একটা হাত নেই তো কী হয়েছে, চোখ তো আছে। তোকে ওই এক হাতেই মায়ের
চোখ আঁকা শিখিয়ে দেব। সারাজীবন মূর্তির চোখ এঁকেই তোর সংসার চলে যাবে। চোখ আঁকা কী মুখের কথা! এই চোখ দিয়েই তো জগতজননী গোটা সংসারকে আগলে রেখেছেন।”
অকস্মাৎ তাদের তিনজনের সুখের সংসারে বজ্রপাত নেমে এল। গতবছর দুর্গাপ্রতিমার অনেক অর্ডার পেয়েছিল। আনন্দে সেবার নৌকা ভাড়া করে উলুবেড়িয়া থেকে মাটি আনতে গিয়ে ফেরার পথে নৌকাতেই তার বাবা মারা যায়। সংসার অচল হয়ে পড়ে। এই মিলন হালদার তাদের থেকে এই চালা ও প্রতিমা তৈরির সাজসরঞ্জাম কিনে দেয়। মিলনের মধ্যে কোনোরকম শিল্পীসত্তার ছিটেফোঁটা নেই। একসময় পাড়ার মস্তান ছিল। কীভাবে যেন তার হাতে প্রচুর টাকা আসে। কুমোরটুলিতে দুটো স্টুডিয়ো এখন। দয়াপরবশ তাকে কাজটা দেয়। এখানে তার মতো প্রতিমার এত জীবন্ত চোখ আঁকতে আর কেউ পারে না। কিন্তু আজ তার সঙ্গে এমন হচ্ছে কেন! কেন আঁকতে পারছে না! তবে কী তার সাধনায় বিঘ্ন ঘটল! প্রতিবারের মতো সে এবারও গণেশজির চোখ আঁকতে যায় কিন্তু পারে না। বাবার শেখানো মন্ত্র ‘ওঁ গং গণপতয়ে নমঃ’ পাঠ করে। তারপর তুলি নিয়ে চোখ আঁকতে গিয়েই বিপত্তি। তার মনে হলো এক বুনো হাতি তার দিকে তেড়ে আসছে। এই বুঝি তার বৃহৎ শুঁড়ে তুলে তাকে আছাড় মারবে! হাতের তুলি ফেলে ভয়ার্ত চোখে কমলেশ উঠে দাঁড়ায়। পাশে বসে হীরু ঠাকুরের চুল বুনছিল। কমলেশকে ওভাবে উঠে দাঁড়াতে দেখে হীরু বলে ওঠে,
“কী হল কমলদা! ওভাবে উঠে পড়লে যে! তুমি তো এখনও চোখ আঁকা শুরুই করলে না! এত কাজ কখন শেষ করবে?’’
কমলেশ শঙ্কিতস্বরে বলে ওঠে,
“কীভাবে আঁকি বল তো? গণেশের চোখ আঁকতে যাব-কী মনে হল একটা পাগলা হাতি তেড়ে আসছে!”
“হা-হা-হা-, কমলদা, তোমার না মাথাটা গিয়েছে। চুপ করো, অন্যেরা শুনলে কথাটা মিলনদার কানে পৌঁছতে
সময় লাগবে না। আর সুরথদা শুনলে তোমার কাজটা স্রেফ খেয়ে ফেলবে। মিলনদা সুরথদার কথায় ওঠে-বসে। সুরথদা তোমাকে এখান থেকে তাড়াতে পারলে বাঁচে। পারছে না কেবল দীনু কাকার জন্য। দীনু কাকা তোমাকে বড্ড ভালবাসে।”
“দে, একটা বিড়ি দে, বাইরে গিয়ে ফুঁকে আসি।’’
“এখন বিড়ি খাবে! তুমি তো মূর্তির চোখ আঁকার সময় কোনদিন খাও না!”
কমলেশ হঠাৎ মেজাজ হারিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,
“এর আগে কোনদিন এমন হয়েছে! গণেশের চোখ আঁকতে গিয়ে পাগলা হাতি আমাকে তাড়া করেছে?”
হীরু তাড়াতাড়ি একটা বিড়ি দেয়। কমলেশ বিড়িটা নিয়ে বাইরে চলে যায়। সেইসময় মিলন ফিরে আসে। হীরুর দিকে তাকিয়ে গলা চড়ায়,
“হীরু, কমলকে বাইরে দেখলাম যে! কাজে ফাঁকি দিচ্ছে?”
পরক্ষণেই গণেশ মূর্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝিয়ে ওঠে,
“একি! একটারও চোখ আঁকেনি!”
মিলনের হাঁকডাকে অন্যান্য কর্মচারীরা এসে জড়ো হয়। সুরথ বলে ওঠে,
“কতবার তোকে বলছি মিলন ওকে বাদ দে। খোঁড়া ল্যাংড়াদের দিয়ে হবে না। আরে শিল্পীর কী অভাব।”
হীরুর দিকে তাকিয়ে সুরথ চতুর চোখে বলে,
“এই হীরু, তোর উপর একটু আগে বাবু মেজাজ দেখাচ্ছিল না? কী হয়েছিল?’’
“না, মানে, ও কিছু না।”
মিলন ধমকায়,
“এই তোতলাবি না। কী বলছিল কমল?”
“কমল দা একটা বিড়ি চাইছিল। কাজের সময় তো কমলদা নেশা করে না, সে বিষয়ে বলাতে কমলদা চটে গিয়েছিল।”
সুরথ বলে ওঠে,
“বাবুর কী চোখ আঁকতেও কষ্ট! নাকি সব ছেড়েছুড়ে বিরাগী হবে! আমাদের মতো তো গাধার খাটুনি খাটতে
হয় না। মাটি তৈরি, কাঠামো বানানো। করিস তো বাপু ওই মায়ের মুখ গড়া আর মূর্তিগুলোর চোখ আঁকা।”
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment