বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/প্রবন্ধ/২য় বর্ষ/৬ষ্ঠ/যশোধরা রায়চৌধুরী সংখ্যা/২১শে আষাঢ়, ১৪৩১
যশোধরা রায়চৌধুরী সংখ্যা | প্রবন্ধ
তন্ময় কবিরাজ
বুরুন্ডির পাতায় কেটির লড়াই
"কেটিও তাঁর লেখায় সেই সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন। কবিতা বাস্তবের ছবিতে রূপান্তরিত হয়েছে। তাঁর "আশা" কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, "ছাই হয়ে যাওয়া যুদ্ধক্ষেত্রে প্রজাপতি উড়ে যায়।" ধ্বংসের শেষপ্রান্তে শান্তির সম্ভাবনা। সব শেষ এবার নতুন করে শুরু। কেটি যেন ইরানের নার্গিস।"
জন্মান্তরবাদ কতটা বাস্তব সে তো বিতর্কের বিষয়। তবে
প্রতিবাদের আগুন যে নিভে যায় না সেটা সত্যি। রাষ্ট্রশাসন যতই নির্মম হোক, যতই সে
নাগরিকদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করুক, প্রতিবাদের মশাল হাতে কেউ না কেউ দাঁড়িয়ে
থাকবেই, যাকে ঘিরে বিশ্বাস জন্ম নেবে, আর সেই বিশ্বাসে নির্ভর করে একজোট হবে
অসহায়
মানুষজন। ইতিহাসের এটাই নির্যাস। ইতিহাস যখন পুরুষতন্ত্রের দাপট দেখাচ্ছে, তখন
মেয়েরা প্রতিবাদ করছে। পুরুষের সমকক্ষ দাবি করে ছিনিয়ে নিচ্ছে নিজেদের অধিকার।
দ্বিতীয় লিঙ্গের তকমা ঝেড়ে ফেলে সমাজের মূল চালিকা শক্তির দাবিদার তারা। রাস্তার
গণআন্দোলনে মেয়েরা যেমন সোচ্চার হয়েছে, তেমনই সাহিত্যের অলিন্দে প্রতিবাদ করেছে
বারবার। আশাপূর্ণা দেবী, মহাশ্বেতা দেবী থেকে শুরু করে তসলিমা নাসরিন, মালালা
ইউসুফজাই।
ভিক্টোরিয়া যুগের লেখিকারা প্রতিবাদ অপেক্ষা নারী মনের খবর রেখেছেন বেশি, অনেকটা
রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের নারীদের মতো। তবে বুরুন্ডির লেখিকা কেটি নিভ্যাবন্দির
জীবনটা অন্যরকম। তাঁর জীবনে মিশে গেছে বাস্তব, যা প্রতিফলিত হয়েছে সাহিত্যে। তিনি
দেখেছেন, গণতন্ত্রের পরাজয়, সংবিধানের চরম সংকট, পাশাপাশি নারী স্বাধীনতার লড়াই।
তিনি তথাকথিত পুরুষশাসিত সমাজের প্রথাগত ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। কেটি
নিভ্যাবন্দির জন্ম বেলজিয়ামে, বুরুন্ডিতে বেড়ে ওঠা আর প্রতিবাদ করার অপরাধে
নির্বাসন, কানাডায় আশ্রয় গ্রহণ করা। পোয়েট্রি পার্নাসাসে তিনি প্রতিনিধিত্ব
করেন। তাঁর সাহিত্য সম্ভারে রয়েছে "ওয়ার্ডস উইথআউট বর্ডার্স",
"ইউ হ্যাভ ক্রোস মেনি রিভার্স: নিউ পোয়েট্রি"-র মতো সব অপূর্ব সৃষ্টি।
শেষ চার দশকে বুরুন্ডিতে সমস্যা বাড়তে থাকে। ২০০০ সালের প্রথম দিকে অবস্থা কিছুটা
স্থিতিশীল হলেও ২০১৫ সালের পর থেকেই অবস্থা আরও জটিল আকার ধারণ করে। বিক্ষোভ দেখা
যায়। কেটি মহিলা দলের হয়ে নেতৃত্ব দেন। তিনি বালিকা আন্দোলনের সদস্যা ছিলেন। আন্দোলনের
পক্ষে বারবার সোচ্চার হয়েছে কেটি নিভ্যাবন্দি। কানাডার হাউস অফ কমন্সে তিনি
সাক্ষী দেন। জেনেভার শীর্ষ সম্মেলনে তিনি বক্তব্য রাখেন। নির্বাসনের যন্ত্রণা তিনি
জানেন। তিনি লেখেন, "আমি শুধু একা এই প্যাটার্নের শিকার হচ্ছি না। আরোও
অনেকেই আছে।" পরিবর্তনের জন্য ত্যাগ ছিল কেটি নিভ্যাবন্দির। তবে তিনিও মানুষ।
মাঝে মাঝে হারিয়ে যান শৈশবের স্মৃতিতে, যা আজও অমলিন। তিনি বলেছিলেন, "ছোটবেলার
বুরুন্ডির যেন সোনার পাথরবাটি।" দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, তার রূপ রস গন্ধ
কেটিকে নস্টালজিক করে তোলে। ছেলেবেলার কাঁচা আমের স্বাদ তিনি এত বছর পরেও ভুলতে পারেননি।
ইতিহাস, শৈশবের মুহূর্ত ধরা পড়েছে তাঁর "ইজিমা" কবিতায়। কেটি চিঠি
লিখতেন ভালবাসতেন। কেটি লিখেছিলেন, "ভালবেসে / ফুলের দেখা পেলাম / মুক্ত -
সামনে বিস্তীর্ণ পৃথিবী / সূর্যমুখীর সুখে ধরা পড়ছে আকাশ।" মন খারাপ হলেই
চলে যেতেন প্রকৃতির কাছে। প্রকৃতিকে তিনি লুসির মতো ভালবাসতেন। তিনি ভালবাসা দিয়ে
জয় করতে চেয়েছিলেন সব কিছু। কেটি মনে করতেন, ভালবাসা সুখের যন্ত্রণা নয়, বরং
সমস্যার সমাধান। তিনি তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন, "all dying is not sad." করুণ
জীবনের বিপরীতে সুখের আকুতি পূর্ণতা বয়ে আনে। আসলে অস্থির সময়ে দাঁড়িয়ে কেটি জীবনকে
উপলব্ধি করেছিলেন। ছোটবেলায় উপন্যাসিক হতে চেয়েছিলেন। কবিতা লিখেছেন ইংরেজি ও
ফরাসি ভাষায়। কেটি নিজেই বলেছেন, "ছোটবেলা থেকেই অশান্তি দেখেছি তাই নিজেকে
আর সংযত রাখতে পারিনি।" কেটি প্রতিক্রিয়াশীল। তাঁর কবিতায় শব্দ, ছন্দ
অপেক্ষায় প্রকট হয়েছে আবেগ, যা কাঁটাতার ভেঙে নারী মনে ঝড় তোলে। কেটি বিশ্বাস
করতেন, "প্রতিবাদ করতে হলে তাগিদ থাকতে হবে।" বাধা আসবে, রাষ্ট্র আরোও
কঠোর হবে কিন্তু প্রতিবাদের ধরন যদি সঠিক হয় তাহলে সফলতা একদিন আসবেই। তিনি
লিখেছিলেন, "I believe we all hear a calling inside of us..." কেটি
রোনাল্ড রুগেরোকে নিয়ে চালু করেন সমন্দারি রাইটিং ওয়ার্কশপ। বর্তমান প্রযুক্তিকে
তিনি যথাযথভাবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে মধ্যে দিয়ে সাহিত্যের
প্রসারিত হোক। তিনি তাই লিখেছিলেন, "social media has become the equivalent
of the traditional fire: a space where stories and ideas can be shared, debated."
বুরুন্ডি সাহিত্যকে নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। দেশের ভাষার মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন
গ্রীক লাতিন ভাষার মিল। কবিতা সম্পর্কে কেটি উদাসীন ছিলেন না। কবিতাকে তিনি বাঁচার
সহায়ক বলে মনে করতেন। তাঁর প্রতিবাদের কন্ঠস্বর কবিতা। তিনি বলতেন, "poetry
is the language of my heart." তিনি কবি ফিলিপ সিডনির মতো অনুকরণে বিশ্বাস
করতেন না। বাস্তবকে তুলে ধরতেন, যেখানে মিশে গেছে নিজের অভিজ্ঞতা। কবিতা তাঁর কাছে
নিজের প্রকাশ। তিনি মনে করতেন, কবি নিজের কবিতায় ধরা দেন। তবে কবিতা সমাজ থেকে
দূরে সরে থাক তিনি তা সমর্থন করতেন না। বরং কবিতাকে আরও বেশি করে সমাজ কেন্দ্রিক
হওয়া দরকার বলেই তিনি মনে করতেন। তাঁর কথায়, "art is the mirror",
যেখানে সমাজের প্রতিফলন ঘটবে। "my poetry has always been infused by what is
happening in my country". কবিতার ভেতরে বোধ থাকবে যা ঘুমন্ত বিবেককে জাগাবে।
কেটি আলিশ ওয়াকারের দ্বারা ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হন। ওয়াকার লিখেছিলেন, "whenever
you are creating Beauty around you, you are resting your soul". কেটিও তাঁর
লেখায় সেই সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন। কবিতা বাস্তবের ছবিতে রূপান্তরিত হয়েছে। তাঁর
"আশা" কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, "ছাই হয়ে যাওয়া যুদ্ধক্ষেত্রে
প্রজাপতি উড়ে যায়।" ধ্বংসের শেষপ্রান্তে শান্তির সম্ভাবনা। সব শেষ এবার
নতুন করে শুরু। কেটি যেন ইরানের নার্গিস। কেটি তাই লিখেছিলেন, "মৃত সমুদ্র
করে স্নান।" সমাজ আন্দোলন তাঁকে শিক্ষা দিয়েছে, মানুষের একতাবদ্ধ হওয়া
দরকার। কবি অশান্তির মধ্যে দাঁড়িয়েও মুক্তির স্বপ্ন দেখেন। কেটি নিভাবন্দি বলেন,
"ঘুমন্ত ফুলের পাশে শ্বাস / আর বাঁচার আশ্বাস।"
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment