বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য়
বর্ষ/৬ষ্ঠ/যশোধরা রায়চৌধুরী সংখ্যা/২১শে আষাঢ়, ১৪৩১
যশোধরা রায়চৌধুরী সংখ্যা | ধারাবাহিক গল্প
বলাই দাস
চোরা বালির স্রোত
[১ম পর্ব]
"হঠাৎ একদিন মায়ের বুকে ব্যাথা, তাড়াতাড়ি মেদিনীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করে দিল। বাহাত্তর ঘন্টা অবজারভেশনে থাকতে হবে, ডাক্তার বলে দিয়েছে; ঔষধ, সিলাইন চলছে।"
রোহিণী বাস স্ট্যান্ডে
দাঁড়িয়ে আছে বুধা সিং বাস ধরবে বলে, রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করে সে। গ্রাম থেকে
প্রতিদিন এভাবেই যাওয়া আসা করে। একটু পরে একটা ভদ্রলোক এসে বলল— অ্যা বাবু তুমি
কুথায় যাইবেক, হিথায় কুথায় আইসেছিলে, কুন বাস ধরবেক?
বুধা থমমত খেয়ে বলল—
এ্যাঁগে আমি বটে- ভালুকাডিহার লোক। সিথাই হামাদের ঘর। ধুমসাই— পাথরডাঙা বাসে…
- ও, আচ্ছা, আমিও তো ওইদিকেই— লুকুসিতাইতলা ঘর বটে হামাদের। চল এক সাথেই যাওয়া যাক না কেনে। তবে ইকটা কুথা আমার এই ব্যাগটা ইখানে রাখলুম, একটু লজর দিয়ো, আমি একটু গরম জল ছাঁইড়ে আসি। তলপেটের ভারটা কমাই দি—
- হ ঠিক আছে বাবু একটু জলদি জলদি— বাস আইসে যাইতে পারে।
- হ-হ, এই যাবো আর আইসবো।
লোকটি ওখান থেকে সরে যেতেই কয়েকজন পুলিশ দৌড়ে এসে ওকে বলল— এই ব্যাগ তোর, কী আছে? দেখা তো দেখি?
- ই ব্যাগ হামার লাইগো বাবু, একজন ভদ্দরলোক রাইখে পিসাব করতে যাইনছে।
- আচ্ছা, তোর না, ভদ্রলোকের— আসুক দেখি কেমন তরো ভদ্দরলোক বটে।
দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ, কোন ভদ্দরলোকের আর দেখা নাই।
- সিআইডি অফিসার বলল— হোয়াই লেট, অ্যারেস্ট হিম। হি ইজ মোস্ট ওয়ানটেড ম্যান, কালপ্রিট। সার্চ দ্য ব্যাগ
একজন কনস্টেবল বলল— ইয়েস স্যার। ব্যাগ চেক করতেই বেরিয়ে এলো কয়েকটি পিস্তল, কিছু মাওবাদী পোস্টার, আর সবচেয়ে মারাত্মক হলো বোম তৈরির মশলা, কিছু টাকা। সঙ্গে সঙ্গে হাতকড়া লাগিয়ে প্রিজনভ্যানে তুলল।
শনিবার সপ্তাহের শেষদিন, কাজের টাকা নিয়ে বাজার করে আসবে— রাত বাড়ছে ঘরে বউ ও ছেলে ভীষণ চিন্তায় আছে। এত রাত কোনদিন হয় না। একমুঠো চাল পর্যন্ত নাই যে ছেলেটাকে সিদ্ধ করে দিবে। ভাবতে ভাবতে মাথা যন্ত্রণা করছে, নয় বছরের ছেলে শচীন পড়তে বসেছিল, পড়া শেষে মায়ের কাছে খেতে চায় কিন্তু তার মুখে তুলে দেওয়ার মতো কিছুই ঘরে নেই। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে মা, কেঁদে কেঁদে ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে। মা দুলালী ঘরের বাইরে এসে পথের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল কিন্তু কোন ফল হলো না। সকালে উঠে পাড়ার মোড়লদের ঘরে গিয়ে সব বলল। শুনে তারা তো হতবাক! চতুর্দিকে খোঁজখবর নেওয়া হলো কোন হদিস পেল না। ঘরে তেমন কোনও কাঁসা-পিতলের বাসনপত্র নেই যে বিক্রি করে চাল, ডাল মশলাপাতি নিয়ে আসবে।
ফুলির মা বলল— হামার কথা শোন শহরে চল, সেখানে অনেক কাজ যেমন— লোকের ঘরে কাজ করা, আর সবচেয়ে ভাল কাজ হলো— কাগজ কুড়ানো, টিনভাঙা, কাচভাঙা, বস্তাছেঁড়া, প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে বিক্রি করলে ভাল টাকা আয় হবে। মা-বেটায় না খেয়ে মরবি না, টাকাও জমাতে পারবি।
- তুমি সত্যি বলছ দিদি, চোখের জল কাপড়ের আঁচলে মুছল।
মা-বেটায় বেড়িয়ে পড়ল এক অজানা ভবিষ্যতের পথে! যে কখনো গ্রামের বাইরে যায়নি, সে কিনা আজ শ্বশুরের পবিত্র ভিটেবাড়ি ছেড়ে সন্তানকে নিয়ে চলে এলো শহরে।
শচীন বলল— মা হামরা ইখন থেকে কাগজ কুড়ানি বলো, হামার ইস্কুল বন্ধ হইয়ে গেইল। বন্ধুরা সবাই পড়াশোনা করবেক আর আমি...
আর বলতে পারল না, চোখ ভরে জল গড়িয়ে পড়ল। ছোট্ট অবুঝ শিশু চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ত ভাল মাথা। মা দুলালী দেখে বলল— বাপ-রে, আগে বাঁচি তারপর পড়াশোনা, তবে হ্যাঁ যত কষ্ট হোক তোকে আমি পড়াইব। চল এখন— কাগজ ছেঁড়া, বস্তা ছেঁড়া, টিন ভাঙা, বোতল ভাঙা, প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে বস্তায় ভরে লোহার দোকানে বিক্রি কইরে খাবার ব্যবস্থা কইরতে হবে রে বাপ।
- কিন্তু মা, হামার যে বেজায় ভোখ পাইচে, চলতে পারছি লাই। কাইল রাত থিকে আজ এত বেলা হই গেল—
ছেলের শুকনো মুখ দেখে দুলালীর অন্তর কেঁদে উঠল। হা ঈশ্বর, কী করব আমি বলে দাও তুমি। এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে বলল— আয় দেখি ঐ যে সুনার দুকানটায়, হামার হাতের নোয়া দুটো বিক্রি কইরে—
আর বলতে পারল না চোখ ভরে জল এলো। অসহায় এয়োতির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল— তোমরা নতুন এসেছ, আগে তো কখনো এখানে দেখিনি। কিন্তু মা এত কী অভাব যে স্বামী বেঁচে থাকতে হাতের নোয়া বিক্রি করবে? না না এটা করা মহাপাপ, এতে ঘরসংসার, স্বামীর অমঙ্গল হয়। তোমরা কোথায় থাকো, মানে কাদের বাড়িতে এসেছে?
না- ইয়ে-মানে, আমতা আমতা করছে।
বুঝেছি মা, ঠিক আছে। এক কাজ করো, তোমার হাতের নোয়া আমি নেব না। বরং বিশটা টাকা দিচ্ছি নিয়ে যাও। এতে হবে তো? সময় করে ফেরত দিয়ে যেও।
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
ছেলেকে খাওয়ালো এবং নিজে অল্প কিছু খেয়ে ছেঁড়া কাগজ ইত্যাদি কুড়োতে লাগল। শচীন বাচ্চা ছেলে দৌড়ঝাঁপ করে, অলিতে-গলিতে ঢুকে অনেক কিছু কুড়িয়ে পেল। বিকেলে ওগুলো বিক্রি করে যা টাকা পেল তা নিয়ে বাজার করে সোজা বাড়ি এলো।
বাড়ি থেকে যাওয়া আসা করা খুবই মুশকিল তাই ওরা হাইওয়ের ওভার ব্রিজের তলায় একটু জায়গা করে কোনো রকমে থাকতে লাগল। ভাল কাগজ কুড়িয়ে পেলে শচীন পড়তে থাকে, দেখে মায়ের ভীষণ কষ্ট হয়। এই শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি করে দিল। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে সে যতটুকু পারে মাকে সাহায্য করে। রবিবার ছুটির দিন হলে বেশি কাজ করে। অন্যদিন খুব ভোরে উঠে সে একাই অনেক জিনিস কুড়িয়ে আনে তারপর পড়াশোনা, স্কুলে যাওয়া।
এভাবেই চলে যাচ্ছে দিন-মাস-বছর। সিডিউল ট্রাইব, তাই স্কুলের পড়াশোনার খরচ সব সরকার থেকে পায়। হাতের লেখা খুব সুন্দর, পড়াশোনায় উত্তম। মাধ্যমিক পরীক্ষায় ডিস্ট্রিক্ট ফাস্ট এবং উচ্চমাধ্যমিকেও বেশ উজ্জ্বল রেজাল্ট। ট্রাইবাল কোটায় মেদিনীপুর পৌরসভায় চাকরি পেল সে। মাকে আর কাগজ কুড়ানির কাজ করতে হয় না।
ঘর ভাড়া নিয়ে মেদিনীপুর শহরে থাকে। শচীন একদিন মাকে বলে— মা আইজ যদি বাবা থাইকতো কত খুশি হতো, বল মা অথচ এই খুশির সময়- সে দেখল মা কাঁদছে— আর কিছু না বলে চুপ করে থেকে পরে বলল— না না মা হামি কিন্তু ওভাবে বলিনি। তুমি দুঃখ পাও তা কি আমি চাই? বলো, আর বইলবোক না। অথচ মন যে মানেই না। বাবা কাজ থেকে আইলে কতকিছু কিনে আইনতো। পূজা বা মেলায় বাবার কাঁইধে চাইপে ঘুরে ঘুরে সব দিখতাম। একটুক্ষণ চুপচাপ। পরে বলল— আচ্ছা মা, হামরা তো কোন থানায় খোঁজ করিনি। একবার যদি থানায় খোঁজ নেওয়া যাইত। তা হইলে…
- দেখ বেটা আজ বারো বছর হইল যে লোকটার কোন খোঁজখবর নাই সেকি আর… বলে হুহু করে কাঁদতে লাগল।
- দেখ মা, বাবার এখন পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স হবে, যথেষ্ট শক্ত সমর্থ, মাগো তুহার মনে আছে বাবা মোটা ডাং দিই হুড়াবাঘটাইকে পিটে মরাই দিলো। তু যা ভাইবছো তা কিন্তু লয়, আমার মন বলছে বাবা বাঁইচে আছে, অসুবিধায় আছে। কোন অঘটনের কবলে পইড়েছে।
- তাহলে তুই দেখ বাপ চেষ্টা কইরে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
হঠাৎ একদিন মায়ের বুকে ব্যাথা, তাড়াতাড়ি মেদিনীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করে দিল। বাহাত্তর ঘন্টা অবজারভেশনে থাকতে হবে, ডাক্তার বলে দিয়েছে; ঔষধ, সিলাইন চলছে। শচীন মাকে দেখতে দুবেলা আসে, অনেকক্ষণ থেকে তারপর বাড়ি ফিরে যায়। নিজে হাতে রান্না করে।
- ও, আচ্ছা, আমিও তো ওইদিকেই— লুকুসিতাইতলা ঘর বটে হামাদের। চল এক সাথেই যাওয়া যাক না কেনে। তবে ইকটা কুথা আমার এই ব্যাগটা ইখানে রাখলুম, একটু লজর দিয়ো, আমি একটু গরম জল ছাঁইড়ে আসি। তলপেটের ভারটা কমাই দি—
- হ ঠিক আছে বাবু একটু জলদি জলদি— বাস আইসে যাইতে পারে।
- হ-হ, এই যাবো আর আইসবো।
লোকটি ওখান থেকে সরে যেতেই কয়েকজন পুলিশ দৌড়ে এসে ওকে বলল— এই ব্যাগ তোর, কী আছে? দেখা তো দেখি?
- ই ব্যাগ হামার লাইগো বাবু, একজন ভদ্দরলোক রাইখে পিসাব করতে যাইনছে।
- আচ্ছা, তোর না, ভদ্রলোকের— আসুক দেখি কেমন তরো ভদ্দরলোক বটে।
দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ, কোন ভদ্দরলোকের আর দেখা নাই।
- সিআইডি অফিসার বলল— হোয়াই লেট, অ্যারেস্ট হিম। হি ইজ মোস্ট ওয়ানটেড ম্যান, কালপ্রিট। সার্চ দ্য ব্যাগ
একজন কনস্টেবল বলল— ইয়েস স্যার। ব্যাগ চেক করতেই বেরিয়ে এলো কয়েকটি পিস্তল, কিছু মাওবাদী পোস্টার, আর সবচেয়ে মারাত্মক হলো বোম তৈরির মশলা, কিছু টাকা। সঙ্গে সঙ্গে হাতকড়া লাগিয়ে প্রিজনভ্যানে তুলল।
শনিবার সপ্তাহের শেষদিন, কাজের টাকা নিয়ে বাজার করে আসবে— রাত বাড়ছে ঘরে বউ ও ছেলে ভীষণ চিন্তায় আছে। এত রাত কোনদিন হয় না। একমুঠো চাল পর্যন্ত নাই যে ছেলেটাকে সিদ্ধ করে দিবে। ভাবতে ভাবতে মাথা যন্ত্রণা করছে, নয় বছরের ছেলে শচীন পড়তে বসেছিল, পড়া শেষে মায়ের কাছে খেতে চায় কিন্তু তার মুখে তুলে দেওয়ার মতো কিছুই ঘরে নেই। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে মা, কেঁদে কেঁদে ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে। মা দুলালী ঘরের বাইরে এসে পথের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল কিন্তু কোন ফল হলো না। সকালে উঠে পাড়ার মোড়লদের ঘরে গিয়ে সব বলল। শুনে তারা তো হতবাক! চতুর্দিকে খোঁজখবর নেওয়া হলো কোন হদিস পেল না। ঘরে তেমন কোনও কাঁসা-পিতলের বাসনপত্র নেই যে বিক্রি করে চাল, ডাল মশলাপাতি নিয়ে আসবে।
ফুলির মা বলল— হামার কথা শোন শহরে চল, সেখানে অনেক কাজ যেমন— লোকের ঘরে কাজ করা, আর সবচেয়ে ভাল কাজ হলো— কাগজ কুড়ানো, টিনভাঙা, কাচভাঙা, বস্তাছেঁড়া, প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে বিক্রি করলে ভাল টাকা আয় হবে। মা-বেটায় না খেয়ে মরবি না, টাকাও জমাতে পারবি।
- তুমি সত্যি বলছ দিদি, চোখের জল কাপড়ের আঁচলে মুছল।
মা-বেটায় বেড়িয়ে পড়ল এক অজানা ভবিষ্যতের পথে! যে কখনো গ্রামের বাইরে যায়নি, সে কিনা আজ শ্বশুরের পবিত্র ভিটেবাড়ি ছেড়ে সন্তানকে নিয়ে চলে এলো শহরে।
শচীন বলল— মা হামরা ইখন থেকে কাগজ কুড়ানি বলো, হামার ইস্কুল বন্ধ হইয়ে গেইল। বন্ধুরা সবাই পড়াশোনা করবেক আর আমি...
আর বলতে পারল না, চোখ ভরে জল গড়িয়ে পড়ল। ছোট্ট অবুঝ শিশু চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ত ভাল মাথা। মা দুলালী দেখে বলল— বাপ-রে, আগে বাঁচি তারপর পড়াশোনা, তবে হ্যাঁ যত কষ্ট হোক তোকে আমি পড়াইব। চল এখন— কাগজ ছেঁড়া, বস্তা ছেঁড়া, টিন ভাঙা, বোতল ভাঙা, প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে বস্তায় ভরে লোহার দোকানে বিক্রি কইরে খাবার ব্যবস্থা কইরতে হবে রে বাপ।
- কিন্তু মা, হামার যে বেজায় ভোখ পাইচে, চলতে পারছি লাই। কাইল রাত থিকে আজ এত বেলা হই গেল—
ছেলের শুকনো মুখ দেখে দুলালীর অন্তর কেঁদে উঠল। হা ঈশ্বর, কী করব আমি বলে দাও তুমি। এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে বলল— আয় দেখি ঐ যে সুনার দুকানটায়, হামার হাতের নোয়া দুটো বিক্রি কইরে—
আর বলতে পারল না চোখ ভরে জল এলো। অসহায় এয়োতির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল— তোমরা নতুন এসেছ, আগে তো কখনো এখানে দেখিনি। কিন্তু মা এত কী অভাব যে স্বামী বেঁচে থাকতে হাতের নোয়া বিক্রি করবে? না না এটা করা মহাপাপ, এতে ঘরসংসার, স্বামীর অমঙ্গল হয়। তোমরা কোথায় থাকো, মানে কাদের বাড়িতে এসেছে?
না- ইয়ে-মানে, আমতা আমতা করছে।
বুঝেছি মা, ঠিক আছে। এক কাজ করো, তোমার হাতের নোয়া আমি নেব না। বরং বিশটা টাকা দিচ্ছি নিয়ে যাও। এতে হবে তো? সময় করে ফেরত দিয়ে যেও।
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
ছেলেকে খাওয়ালো এবং নিজে অল্প কিছু খেয়ে ছেঁড়া কাগজ ইত্যাদি কুড়োতে লাগল। শচীন বাচ্চা ছেলে দৌড়ঝাঁপ করে, অলিতে-গলিতে ঢুকে অনেক কিছু কুড়িয়ে পেল। বিকেলে ওগুলো বিক্রি করে যা টাকা পেল তা নিয়ে বাজার করে সোজা বাড়ি এলো।
বাড়ি থেকে যাওয়া আসা করা খুবই মুশকিল তাই ওরা হাইওয়ের ওভার ব্রিজের তলায় একটু জায়গা করে কোনো রকমে থাকতে লাগল। ভাল কাগজ কুড়িয়ে পেলে শচীন পড়তে থাকে, দেখে মায়ের ভীষণ কষ্ট হয়। এই শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি করে দিল। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে সে যতটুকু পারে মাকে সাহায্য করে। রবিবার ছুটির দিন হলে বেশি কাজ করে। অন্যদিন খুব ভোরে উঠে সে একাই অনেক জিনিস কুড়িয়ে আনে তারপর পড়াশোনা, স্কুলে যাওয়া।
এভাবেই চলে যাচ্ছে দিন-মাস-বছর। সিডিউল ট্রাইব, তাই স্কুলের পড়াশোনার খরচ সব সরকার থেকে পায়। হাতের লেখা খুব সুন্দর, পড়াশোনায় উত্তম। মাধ্যমিক পরীক্ষায় ডিস্ট্রিক্ট ফাস্ট এবং উচ্চমাধ্যমিকেও বেশ উজ্জ্বল রেজাল্ট। ট্রাইবাল কোটায় মেদিনীপুর পৌরসভায় চাকরি পেল সে। মাকে আর কাগজ কুড়ানির কাজ করতে হয় না।
ঘর ভাড়া নিয়ে মেদিনীপুর শহরে থাকে। শচীন একদিন মাকে বলে— মা আইজ যদি বাবা থাইকতো কত খুশি হতো, বল মা অথচ এই খুশির সময়- সে দেখল মা কাঁদছে— আর কিছু না বলে চুপ করে থেকে পরে বলল— না না মা হামি কিন্তু ওভাবে বলিনি। তুমি দুঃখ পাও তা কি আমি চাই? বলো, আর বইলবোক না। অথচ মন যে মানেই না। বাবা কাজ থেকে আইলে কতকিছু কিনে আইনতো। পূজা বা মেলায় বাবার কাঁইধে চাইপে ঘুরে ঘুরে সব দিখতাম। একটুক্ষণ চুপচাপ। পরে বলল— আচ্ছা মা, হামরা তো কোন থানায় খোঁজ করিনি। একবার যদি থানায় খোঁজ নেওয়া যাইত। তা হইলে…
- দেখ বেটা আজ বারো বছর হইল যে লোকটার কোন খোঁজখবর নাই সেকি আর… বলে হুহু করে কাঁদতে লাগল।
- দেখ মা, বাবার এখন পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স হবে, যথেষ্ট শক্ত সমর্থ, মাগো তুহার মনে আছে বাবা মোটা ডাং দিই হুড়াবাঘটাইকে পিটে মরাই দিলো। তু যা ভাইবছো তা কিন্তু লয়, আমার মন বলছে বাবা বাঁইচে আছে, অসুবিধায় আছে। কোন অঘটনের কবলে পইড়েছে।
- তাহলে তুই দেখ বাপ চেষ্টা কইরে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
হঠাৎ একদিন মায়ের বুকে ব্যাথা, তাড়াতাড়ি মেদিনীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করে দিল। বাহাত্তর ঘন্টা অবজারভেশনে থাকতে হবে, ডাক্তার বলে দিয়েছে; ঔষধ, সিলাইন চলছে। শচীন মাকে দেখতে দুবেলা আসে, অনেকক্ষণ থেকে তারপর বাড়ি ফিরে যায়। নিজে হাতে রান্না করে।
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment