প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Thursday, August 1, 2024

ধলো দরগার কালো মাটি | নাসির ওয়াদেন

বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/১১ত/৩২শে শ্রাবণ, ১৪৩১

ধারাবাহিক গল্প

নাসির ওয়াদেন
ধলো দরগার কালো মাটি

[৩য় পর্ব]


"সাদাসিধে মানুষটি যখন পাশের গাঁয়ে গিয়ে বন্ধু হক্কু শ্যাখকে বলে, শুন্যাছ হুক্কু ভ্যাই, হামাদের গাঁয়ের ইজাজ মুড়োলের ব্যাটা নইমুদ্দি তার চাচাতো বহিনকে নিয়ে গাঁ ছেড়ি পালালছে। কথাটা শুনেই হুক্কু বলে, কী বুলছ ভাই? এত্ত দূর! শুন্যাছিলাম ছুঁড়াটোর শাদি হুয়াছিলো ওরই মামাতো বোহিনের সাথে।"

পূর্বানুবৃত্তি নইমুদ্দি উঠতি জোয়ান। বিশ পেরিয়ে গেছে বিয়ের আগেই। আঠারোর আসমানী, টুসটুসে যৌবনবতী। কিন্তু কিছুতেই তাদের নতুন বংশধর আসছে না। তবে কী আসমানীর কোন দোষ আছে? এদিকে ভিতরে ঢুকেই নইমুদ্দি বসে সোনাভানের পাশে। সোনাভান তার কাকাতো বোন, চোদ্দো পেরিয়ে পনেরোতে পড়েছে। বেশ ডাগর-ডোগর, রং-চং বেশ ভালই। মুখের ডান পাশে ছোট্ট একটা তিল, তাকে আরো সুন্দর দেখাচ্ছে। সদ্যযৌবনা সোনাভানের রূপ-যৌবন নইমুদ্দিকে কিছুটা হলেও ঢলে পড়তে দেখেছে আসমানী। তারপর…
তিন

ধলো দরগার পিরানে পির শাহ শাহাবুদ্দিনের সমাধিস্থলে ধূপবাতি আর আতর, গোলাপজলের ফোয়ারায় মম করছে। হাজার হাজার মানুষ পরম শ্রদ্ধা করে সেই দাতার কাছে মনের  কামনা জ্ঞাপন করছে। মিয়াজি তার পিতামহের মুখে শুনেছে যে, তখন দেশে নবাবদের শাসন চলছে, মুকসুদাবাদের নবাব মুর্শিদকুলি খানের সময়ে বাংলা বিহারের জঙ্গলবেষ্টিত সুলতানাবাদ পরগণায় রাজা উদয় সিং নবাবের অনুমতি নিয়ে রাজত্ব করে নিয়ম মতো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করে নিজ লভ্যাংশ রেখে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নবাবের দরবারে প্রেরণ করতেন। সে বছর রাজ্যের বেশিরভাগ স্থানে বৃষ্টির অকালে কোন ফসল উৎপাদিত হয়নি। ফলে গরিব প্রজারা নিজ নিজ প্রতিশ্রুতি মতো জমির খাজনা দিতে ব্যর্থ হয়।

একদিকে প্রজাদের দুরবস্থা, অন্যদিকে নবাবের খাজনা আদায়ের তাগিদ উদয়নারায়ণ সিংকে বিচলিত করে। খাজনা দিতে অস্বীকার করলে নবাবের চোখে খারাপ হন। নবাব মুর্শিদকুলি খান তার প্রধান সৈন্যাধ্যক্ষ কালিয়া জমিদারের পরামর্শ মহম্মদ জান ও রঘুবীরকে রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠান। এদিকে প্রজাদের পক্ষে রাজা, নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
নবাবের সৈন্যবাহিনী জঙ্গিপুর থেকে পশ্চিম অভিমুখে রওনা হয়ে বাদশাহী সড়ক ধরে উদয় সিংয়ের রাজধানী আক্রমণ করলে উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বাধে। রাজা, তার সৈন্যগণকে জগন্নাথপুর গড় থেকে যুদ্ধ করতে ঘোষণা করলে, ওদিকে উদয় সিংহের সেনাপতি গোলাম মহম্মদ বীরবিক্রমে যুদ্ধ ক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
বীরবিক্রমে যুদ্ধ চালিয়ে প্রভুভক্ত গোলাম রাজা উদয় সিংহের পক্ষে এগিয়ে এলে রঘুবীরের তীরের আঘাতে গোলাম নিহত হয়। রাজা পরাজয় নিশ্চিত জেনে বিরক্ষেতি থেকে দেবীনগর দুর্গে পলায়ন করেন।
— কী মিয়াজী? আপনার লোকজন এসে পড়েছে কি? বলে তাড়া দেন খাদেম।
খাদেমের
আহ্বানে মিয়াজী সম্বিত ফিরে পায়। এতক্ষণ যুদ্ধের কথা তার  মনের পর্দায় ভেসে উঠেছিল। তাড়াতাড়ি বিবিজানের দিকে তাকিয়ে হাঁক ছাড়ে, বৌমার গোসল করা হলো? এবার যে ঘোড়া বাঁধতে হবে?
মেহেরজান ততক্ষণে আসমানীকে গোছল করিয়ে ভিজে শাড়ি ও ভিজে এলোচুলে মাজারের বড় গাছটার নীচে নিয়ে আসে। কাছে এসে দাঁড়ালে খাদেম সাহেব একটা সুতোয় বাধা মাটির ঘোড়া আসমানীর হাতে তুলে দেয়। বলে, মা, এবার এটাকে তুমি এই গাছের ডালে শক্ত করি বেঁধে দাও। আর দাতার মাজারে গিয়ে একটুকরো কালো মাটি বিসমিল্লা বলি হাতে তুলি মুখে দিতে হোবে। ইনশাল্লা। সামনের বছর এসি দেখবা, তুমার ঘোড়া সুতো ছিঁড়ি মাটিতে পড়্যাছে, তাহুলেই দাতার দুয়ায়, উপরওয়ালার ইচ্ছায় তুমার কোলে টুকটুকা সন্তান আস্যাছে।
গাছের ডালে কয়েকশো ঘোড়া বাঁধানো সুতোয় ঝুলছে, মনে মনে শাকিব ভাবে, হায়-রে দুনিয়া! দুনিয়ার এত লোকের বাচ্চা ন্যাই। যাদের এক বছরের মধ্যে বাচ্চা হয় না, পরের বছর তাদেরকে আবার এসে ঘোড়া বাঁধতে হয়। এভাবেই বাচ্চা না হওয়া অবধি মানত করে যেতেই হবে।
রাজা উদয় সিংয়ের কথা মনে পড়ে মিয়াজীর। প্রধান সেনাপতির মৃত্যুর সংবাদ তাকে বিচলিত করে। বিভিন্ন পথে নবাবের সৈন্য বিরক্ষেতি আক্রমণ করে লুটপাট চালায়। নারী পুরুষ যে যেদিকে পারে পালিয়ে  প্রাণে বাঁচে।
রাজা উদয়নারায়ণ সিং সপরিবারে বিরক্ষেতির প্রাসাদ ছেড়ে দেবীনগরে
পলায়ন করে। সেখানে সপরিবারে বিষপান করে হংসসরোবরে আত্মবিসর্জন করে। সলিলসমাধিতে মৃত্যু হলে মুরশিদকুলি খাঁ নবাবসেনা রঘুবীরের হাতে এই অঞ্চল শাসনের দায়িত্ব দিয়ে দেয়।
প্রধান সেনাপতির মৃতদেহ দাফন কাফন করা হয় এই ধলো দরগার কালো মাটিতে। প্রতিবছর এই মাজারে  হাজার হাজার মানুষ এসে শিন্নি দেয়, চাদর চড়ায়, মানত করে। তিনদিনের উৎসবে লোকে লোকারণ্য থাকে।

চার

ডিম কেনাবেচা করে ইমরান খাঁ। সাদাসিধে মানুষটি যখন পাশের গাঁয়ে গিয়ে বন্ধু হক্কু শ্যাখকে বলে, শুন্যাছ হুক্কু ভ্যাই, হামাদের গাঁয়ের ইজাজ মুড়োলের ব্যাটা নইমুদ্দি তার চাচাতো বহিনকে নিয়ে গাঁ ছেড়ি পালালছে। কথাটা শুনেই হুক্কু বলে, কী বুলছ ভাই? এত্ত দূর! শুন্যাছিলাম ছুঁড়াটোর শাদি হুয়াছিলো ওরই মামাতো বোহিনের সাথে। ছুঁড়ি নাকি বাঁজা। ছেল্যাপিলা হয়নি।
— ঠিকই বুলাছো হুক্কুভাই। বলে ইমরান উৎসাহ বোধ করে। বলে, তুমিই বলো অমুন জোয়ান ছ্যালার কতদিন বিহা হলো, একটোও ছেলাপিলা হলো না, কী করবে বুলো?
— শুন্যাছি, মেয়েটোর নাকি বয়ুস হয়নি।
— বয়ুস না হোলেও মেয়্যাছেলের বয়স, গা-গতরে যৌবুন ফুটি উঠ্যাছে। অমুন পরির মতুন ম্যায়া দেখলে কাহার মুন ঠিক থাকে তুমি বলো?
হক্কু কথা শুনে টিপ্পনী কাটে। হামরা ভ্যাই গরিবসরিব মানুষ। ইসব বড়নোকের ব্যাপার স্যাপার। ওদের কথা গাহা  হামাদের সাজে না। আর অমুন ডাগর ছেলেটোর কথাটা বুলো, দুইটা বিহা করতেই পারে।
মেহেরজানবিবির সকাল থেকেই মনখারাপ। আর গুম মেরে দাওয়ার এক কোণায় বসে আছে আসমানী। মিয়াজীর লজ্জায় চোখ মুখ লাল টুকটুকে, যেন রামধনুর আলো চোখেমুখে ফুটে উঠেছে। গিন্নিকে ডেকে বলে, বিবিজান, তুমি তো মা! ব্যাটার মতিগতি বুঝতে পারনি।
— ব্যাটাছেল্যার মুন কী করি বুঝব বলো? সবসময় তোমার মুন কি বুঝতে পারি?
মিয়াজী চুপ করে যায়।
বৌমা একটু সাবধানে থাকলে হয়তো আটকা যেত। আচ্ছা বৌমা, তুমি কি কিছু আঁচটাচ করতে পেরাছিলে?
চুপ করে বসে আসমানী। তার দুচোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে আসছে। নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছে। এতদিন ঘরসংসার করেও একটা সন্তানের জন্ম দিতে পারল না। শাশুড়ির কথার কোন উত্তর দেয় না আসমানী। শ্বশুর ইজাজ মিয়া বারান্দার একপাশ থেকে অন্য পাশে হেঁটে পায়চারি করছে। মনে মনে ভাবছে, এখন কী করা যায়?
নিজের সন্তান কোথায় গেল? প্রথম প্রথম রাগ হলেও এখন সন্তানের জন্য মনটা তার ব্যাকুল হয়ে উঠছে।
সকাল থেকেই উপোস, কোন কিছুই খেতে ইচ্ছে করে না আসমানীর। বুক দোলে দোলে উঠছে। বারান্দার এক কোণে গিয়ে খ্যাক্ খ্যাক্ করে বমি করতে লাগে। তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে তাকে ধরে ফেলে মেহেরজান। বলে, আহা-রে, মেয়েটি সকাল থেকে কিছু খায়নি। উপোস থেকে থেকেই বমি করছে। গ্যাস অম্বল চাড়া দিয়্যাছে। এখনই হোগল ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
মিয়াজী হাঁক ছাড়ে, ও শাকিব, শাকিব রে! জলদি আয়। গাড়ি খান বাঁধ, বৌমাকে ডাক্তারখানা নিয়ে যেতে হবে, মাইল খানেক দূরে বিক্রমপুরের বাজারে হোগলডাক্তারের ডাক্তারখানা।
শাকিব তাড়াতাড়ি ছুটে আসে। হর দিন সকালে পড়শি নিধুবালা দাসী আসে গিন্নি মার কাছে। কিছু খাবারদাবার নিয়ে যায়। সেগুলোই বাড়িতে গিয়ে সময় মতো খায়।
— এ কী! কী হলো? তোমার বৌমা অসুস্থ নাকি? বলে সহানুভূতির গলায় কথা বলে নিধুবালা।
— আর বোলো না নিধু। সকাল থেকেই বউটা উপোস, এখন বমি করছে। এখনই ওর চিকিৎসা করা দরকার। ডাক্তারখানায় নিয়ে যেতে হবে।
বৌমার দিকে তাকিয়ে নিধুবালা তার কাছে যায় এবং ফিশফিশ করে বলে, ‘বৌমা! তুমি কি তেঁতুল খেয়েছিলে?’
অবাক হয়ে আসমানী নিধুবালার দিকে মুখ তুলে তাকায়, মনে মনে ভাবে, নিধু মাসি জানতে পারল কী করে? কোন উত্তর না দিয়ে শুধু মাথা নেড়ে হ্যাঁ-সূচক ইঙ্গিত করে।
— ব্যস, নিধুবালার চোখে আনন্দ ঝিলিক বয়ে উঠে। তাড়াতাড়ি গিন্নি মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, একটু বেশি খাবার লাগবে গিন্নি মা।
— ক্যানে! তুমার যা বরাদ্দ তাই পাবে।
গিন্নি মার দিকে মুখ তুলে নিধু বলে, তা বুললে তো চলবে না। তুমি যে নাতি-নাতনির দিদা হতে চলেছ।
গিন্নি অবাক হয়ে বলে, ‘মানে?’
নিধুবালা বলে সত্যিই গো, তোমার বৌমা পোয়াতি।

 

সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)