বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/১০ম/২৫ই
শ্রাবণ, ১৪৩১
ধারাবাহিক গল্প
নাসির ওয়াদেন
ধলো দরগার কালো মাটি
[২য় পর্ব]
"বাঙরের দিক থেকে ভিতরে ঢুকেই নইমুদ্দি বসে সোনাভানের পাশে। সোনাভান তার কাকাতো বোন, চোদ্দো পেরিয়ে পনেরোতে পড়েছে। বেশ ডাগর-ডোগর, রং-চং বেশ ভালই। মুখের ডান পাশে ছোট্ট একটা তিল, তাকে আরো সুন্দর দেখাচ্ছে। সদ্যযৌবনা সোনাভানের রূপ-যৌবন নইমুদ্দিকে কিছুটা হলেও ঢলে পড়তে দেখেছে আসমানী।"
পূর্বানুবৃত্তি ইজাজ মিয়ার বাবা দৌলত মিয়া নবাবি
আমলে বেশ কিছু জমি-জমার মালিক ছিল। গরিব প্রজারা ঠিকমতো খাজনা দিতে পারছে না। গায়েগতরে
খেটে ঝোপঝাড় সাফসুতরো করে তাদের বাবা-ঠাকুরদারা যে সকল জমি তৈরি করে চাষাবাদ করত,
সেই জমিই জমিদারেরা দখল করে নিয়েছে। ফজরের আজান শোনা গেল মসজিদের মাইক থেকে।
আজানের ধ্বনি শুনে শাকিবের মন ভরে ওঠে। সে মূর্খ মানুষ। আজানের ধ্বনি তার মধুর
লাগে কিন্তু তার মানে সে জানে না, বুঝতেও চায় না, সেসব বুঝেও লাভ নেই। নইমুদ্দির
বিয়ে হয়েছে বছর তিনেক হলো। নাতি-নাতনির মুখ দেখার খুব ইচ্ছে মেহেরজানের। তারপর…
গাড়ির চাকা মাটির উপর গড়াতে
থাকায় চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে ধুলো। গামছায় মুখ ঢেকে নেয় গাড়োয়ান। বলে, 'মিয়া
সাহেব ভিতরে ঢুকে যান। দেখছেন তো, ক্যামুন ধুল্যা উড়ছে।'
— হ্যাঁ হ্যাঁ। বলে চটপট টপ্পরের মুখে বাঁধা কাপড়
সরিয়ে ঢুকে পড়ে মিয়া। ভেতরে শাশুড়ি, বউ আর তাদের পাশে রেশমি আর সোনাভান। বাঙরের
দিকে বসে আছে নইমুদ্দি।
নইমুদ্দি উঠতি জোয়ান। বিশ পেরিয়ে গেছে বিয়ের আগেই। আঠারোর
আসমানী, টুসটুসে যৌবনবতী। কিন্তু কিছুতেই তাদের নতুন বংশধর আসছে না। তবে কী
আসমানীর কোন দোষ আছে?বাঙরের দিক থেকে ভিতরে ঢুকেই নইমুদ্দি বসে সোনাভানের পাশে। সোনাভান তার কাকাতো বোন, চোদ্দো পেরিয়ে পনেরোতে পড়েছে। বেশ ডাগর-ডোগর, রং-চং বেশ ভালই। মুখের ডান পাশে ছোট্ট একটা তিল, তাকে আরো সুন্দর দেখাচ্ছে। সদ্যযৌবনা সোনাভানের রূপ-যৌবন নইমুদ্দিকে কিছুটা হলেও ঢলে পড়তে দেখেছে আসমানী।
— যদি সে বন্ধ্যা হয়, তবে কী নইমুদ্দি তাকে ছেড়ে সোনাভানের দিকে ঢলে যাবে? এক বুক হতাশা নিয়ে শাশুড়ির পাশে বসে তাকে আঁকড়ে ধরে। শাশুড়ি মেহেরজানবিবিও ভাইঝিকে বউ করে এ বাড়িতে এনেছিল। যাতে দু-ভাইবোনের সম্পর্ক টিকে থাকে। আবার সম্পত্তির অংশীদারও হতে পারবে নইমুদ্দি। কিন্তু আল্লা বাম হলে, সব যে নষ্ট হয়ে যায়। এ ভাবনাও বিবিজানকে কুড়ে কুড়ে খায়। কত হাকিম, কবিরাজ করেও যখন নাতি-নাতনির মুখ দেখতে পেল না, তখন শেষ চেষ্টা করতেই এই ধলো দরগার পথে পা বাড়ানো।
বেলা দ্বিপ্রহর। মাথার উপর সূর্য উঠেছে। মানুষের ছায়া মানুষের মধ্যে মিশে যাচ্ছে, ছায়াহীন মানুষ, গাছ, পাখি, গাড়ি। চারদিকে জনসমাগম। হইচই হুল্লোড়। বিশাল মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে হরেক কিসিমের মানুষ এসেছে আপন আপন মানত দিতে, মনের কামনা বাসনা পূরণ করতে। কেউ খাসি কাটছে তো, কেউ মোরগ জবাই করে কাটাকুটি করছে। কেউ কেউ আবার সাদা মোরগ মাজারের ভেতরে ছেড়ে দিচ্ছে, যার যেমন মানত তার তেমন ক্রিয়াকলাপ।
— হ্, হ্, শব্দ করে গাড়ির বলদদুটোকে থামিয়ে দেয় গাড়োয়ান। গাড়ি থেকে নেমে জোয়ালের দুপাশের শলিদুটো তুলে গোরুর ছাদ খুলে দেয়। তারপর আস্তে আস্তে মুখজিটা ধরে গাড়িটাকে আস্তে নামায়। গোরুদুটোকে একটু দূরে ছোট্ট গাছের গোড়ায় বেঁধে আসে, যাওয়ার আগে হাঁক দিয়ে বলে, 'কই গো মা জননী! আপনারা নেমি এ্যসেন।’
— এসি গ্যেলছি। হামি বলদ দুটোকে খড় দিয়ে অ্যাসছি। বলেই বগলে কয়েকটা খড়ের আঁটি নিয়ে সেদিকে চলে যায়। গোরুদুটোকে আঁটি খুলে তাদের খেতে দেয়।
এক এক করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে সকলেই। আট বছরের বোন রেশমির হাত ধরে নেমে আসে নইমুদ্দি। চারিদিকে লোক সমাগম দেখে নইমুদ্দি বলে, রেশমি হামার হাত ছাড়বি না। না হলে ভিড়ে হারিয়ে যাবি, তখন চাচিমাকে কী জবাব দিব?
— না দাদা! আমি তোমার হাত ছাড়ছি না, তোমার হাত ধরেই থাকব।
— হুঁ ঠিক আছে। এভাবেই ধরে থাকবি। সোনা, তুইও কিন্তু কাছে কাছে থাকবি।
— আর বুলতে। আমি তো তোমার হাত ধরেই যাব। বলে অন্য হাতটাকে ধরে ফেলে সোনাভান।
আড়চোখে দেখে আসমানী। তাকে খুব বিষণ্ণ মনে হয়। ভাল চোখে দেখে না তাদের কার্যকলাপ, বরং মনে মনে অখুশিই হয়।
— কই গো বৌমা। তাড়াতাড়ি নেমে এসো।
— এই জি, যাচ্ছি ফুফুমা। বলে সাড়া দেয় টপ্পরের ভেতর থেকে। এক এক করে সবাই নীচে নেমে এসে মাটিতে দাঁড়ায়।
গিন্নিমা বলে, চলো মা, কাপড়চোপড় গুছিয়ে নাও সাগরদিঘিতে গোছল করে এসো। বুড়ো বটগাছের ডালে ঘোড়া বাঁধতে হবে।
ওদিকে মিয়া, খাদেম সাহেবকে বলে দিয়েছেন তাদের আসার উদ্দেশ্য। খাদেম সাহেব তড়িৎ গতিতে জানিয়ে দিলেন, ঠিক আছে মিয়া সাহেব। আপনি কোন কিছু চিন্তা করবেন না। নজরানা ওই বাক্সে দিয়ে দিবেন। আমি এদিকের সব ব্যবস্থা পাকা করে দিচ্ছি। বৌমাকে গোছল করে আসতে বলবেন। ভেজা চুল আর ভেজা শাড়ি পড়ে ঘোড়া বাঁধতে হয়। ঘোড়া আর সুতোর ব্যবস্থা করা আছে। কেবল ওর মূল্যটা দিলেই চলবে। আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।
— আর কি কিছু করতে হবে খাদেম সাহেব? জিজ্ঞাসা করেন মিয়া সাহেব।
— কী আর করবেন? যদি মনে করেন তো, কিছু শিরনি চড়িয়ে, ধূপকাঠি জ্বালিয়ে একটা মুনাজাত করে আপনার মনের বাসনা পিরবাবার কাছে স্মরণ করতে পারেন। নিশ্চয়ই পিরের বরকতে আল্লার ইচ্ছেয় আপনার মনস্কামনা পূরণ হবে।
— আর কিছু?
— না, না। এখন আর কিছু করতে হবে না। আল্লার ইচ্ছেয় আপনাদের বংশে বাতি জ্বালাতে বংশধর এলে, আপনি সেই নবজাতককে নিয়ে এসে এই দাতার দরবারে যা খুশি দান করে যাবেন। বলেই খাদেম সাহেব অন্য দিকে চলে গেলেন।
মিয়া সাহেব দাতার দরবারে দুহাত তুলে মনে মনে একটা বংশধর কামনা করে মোনাজাত শেষ করলেন।
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment