প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Thursday, August 1, 2024

দূরের তারা | পারমিতা চ্যাটার্জি

বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/১০ম/২৫শে শ্রাবণ, ১৪৩১

ধারাবাহিক গল্প

পারমিতা চ্যাটার্জি

দূরের তারা

[২য় পর্ব]


"স্বর্ণের গলাটা ক্রমশ ভারি হয়ে আসছে কথা বলতে বলতে অমল তা বুঝতে পারল, শেষবারের মতন কাছে এসে হাতদুটো জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি তোমার সব কথা রাখব, তুমি একটা কথা আমার রেখো, অনুরোধও বলতে পার’ ‘কী কথা?’ স্বর্ণও দেখল, অমলের চোখ দুটো জলে ভরে এসেছে,"


পূর্বানুবৃত্তি স্বর্ণলতা দেবী এক বিখ্যাত সাহিত্যিক। বহু বিখ্যাত গল্প উপন্যাসের প্রণেতা তিনি। তার বই নিয়ে অনেক সিনেমা নাটকও হয়েছে। স্বর্ণ যখন দশম শ্রেণিতে পড়ে তখন তাকে অঙ্ক করাতে আসত তাদের পাশের বাড়ির একটি ছেলে অমল, অমল ডাক্তারি পড়ছে, তার সাথে টিউশনও করে। পাশের একদম লাগোয়া বাড়িতে তারা থাকত। দুবাড়ির মধ্যে যাতায়াত খুব ভালই ছিল, একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। অমলের সাথে স্বর্ণের একটু মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, দুজনে দুজনকে গভীরভাবে ভালবেসে ফেলেছিল। অমলের জেঠিমা তার জেদে খুব তাড়াহুড়ো করে অমল ডাক্তার হওয়ার আগেই মোটামুটি সুশ্রী চেহারার একটি মেয়ে অনুপমার সাথে বিয়ে দিয়ে দেন। তারপর…

অমল ভাবছিল বসে বসে স্বর্ণ ওর কথা রেখেছে ঠিকই, সে-ই রাখতে পারেনি। অনেকটা ছোট ছিল সে সময়ে, তাড়াহুড়ো করে বাড়ি বিক্রি করে এই সম্বন্ধটা দেখে বিয়ে দিয়েছিল, বাবা আর বড়মা মিলে, তখন সে ডাক্তারি পড়ছে সবে। মাকে জড়িয়ে ধরে আকুল হয়ে কেঁদে ফেলেছিল, মায়ের চোখেও জলের ধারা কিন্তু ওদের মুখের ওপর কথা বলার ক্ষমতা ছিল 
না। জেঠিমার ওপর খুব রাগ হল। এভাবে মতের বিরুদ্ধে বিয়ে দিয়ে কী লাভ হল! ভাবে একবার জিজ্ঞেস করবে, তোমার জেদের জন্য তুমি তিনটে জীবন নষ্ট করলে, সেকথা কি কোনদিন বুঝেছিলে? কিন্তু জেঠিমা তো মুক্তি নিয়ে চলে গেছেন কিন্তু সে! সে তো তার মেয়ে-বউয়ের দায়ভার এড়িয়ে যেতে পারে না। মেয়েটা তার প্রাণ, নাম রেখেছে মিষ্টি, সবাই তাকে মিষ্টি বলেই ডাকে কিন্তু ভাল নাম দিয়েছে বনলতা, মা বুঝেছিলেন এ নাম কেন? এক-একসময় মনে হয় বিয়েটা না হয়ে ভাল হয়েছে সংসারের প্রতিদিনের ঘাতপ্রতিঘাতে হয়তো স্বর্ণের সাথেও তার প্রেমটা হারিয়ে যেত, যে প্রেম তার মনে অন্তত এখনও জ্বলজ্বলে হয়ে আছে কোথাও একটুও মালিন্য আসেনি।

স্বর্ণর মনেও কী কষ্ট নেই, মাকে নিয়ে এসেছিল সেই মা-ও তো তার চলে গেল। একলা কাচ ঘেরা ছোট্ট দোতলার বারান্দায় যখন বসে থেকে নিজের মনের সাথেই কথা বলে, অমলদা তোমার তো একটা ফুটফুটে মেয়ে আছে, আর আমি কী নিয়ে বাঁচি বলো তো? দাদারা এখনও তাকে খুব ভালবাসে, এই তো সেদিনই এসে বলছিল, ‘স্বর্ণ বিয়ে করলি না বোন কিছুতেই, এরকম একা একা থাকিস আমাদের বড্ড চিন্তা হয় তোকে নিয়ে রে!’ ‘এই তো কেটে গেল দাদা অনেকগুলো দিন। বাকি দিনগুলোও কেটে যাবে, চিন্তা কোরো-না তো এত। ভাইপো-ভাইঝির বিয়ের সময় হয়ে গেল এখন নাকি আমি বিয়ে করব! তুমিও যেমন!’ ‘তাতে কী হয়েছে? এখন তো কত বড় বয়সেও লোকে বিয়ে করে আর আমার বোন তো এখনও অষ্টাদশী’ হিহি করে হেসে গড়িয়ে পড়ে স্বর্ণ।

হার্টের একটা ক্রিটিক্যাল অপারেশন করে ডঃ অমল ব্যানার্জী প্রাইজ পেলেন। এরকম অপারেশন ভারতে এই প্রথম। ডক্টর ক্লাব থেকে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল।

অমল স্ত্রীকে তাড়াতাড়ি করতে বলছেন, কিন্তু দেখলেন সে সাজগোজ কিছু করেনি কিন্তু মেয়েকে তৈরি করে দিয়েছে। মেয়ে অবশ্য সাজের ব্যাপারে খুবই পাকাপোক্ত। পড়াশোনায় খুবই ভাল। বেথুন স্কুলের ফাস্ট গার্ল। স্ত্রীকে বললেন, ‘এ কী অনু! তুমি যাবে না?’ অনু মুখে কিছু বলল না, শুধু মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল যে সে যাবে না! অমল বুঝতে পারল যে সে যাবে না, হঠাৎ আবেগপ্রবণ হয়ে যা কোনদিন করেনি, কাছে এসে দুহাত দিয়ে অনুর মুখটা তুলে ধরে বললেন, ‘কী হয়েছে অনু? চোখে জল কেন?’ অনু কান্নায় ভেঙে পড়ল, অমল তাকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে বলবে-না আমাকে?’ অনু বলল, ‘কী করে যাব? সেখানে যাবার যোগ্যতা কি আছে? কোথায় তুমি আর কোথায় আমি?’ অমল নীরবে স্ত্রীর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘তুমি তোমার মতন’, আদর করে থুতনি ধরে মুখটা তুলে ধরে বললেন, ‘এমন সুন্দর মুখ ক’জনের আছে? তুমি তো ভাল গান গাও, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবে, গানই আমার নেশা, আমি গানটা খুব ভালবেসে করি। লম্বা বিনুনি করে নাও আর সুন্দর একটা শাড়ি পরে বড় করে একটা টিপ পরে ফেলো, এর চেয়ে বেশি দরকার নেই, তুমি তো এমনিতেই সুন্দর।’ অমলের মনে হল, সত্যি সে অনুর প্রতি অবিচার করেছে, ভাল ভাল শাড়ি-গয়না কিনে দিলেই যে সব মেয়ে ভাল থাকতে পারে না আজ অনুর কান্নাই বলে দিল। স্বামীর ভালবাসা কে না চায়! তা তো তিনি সত্যি দিতে পারেননি। আজ বোধহয় প্রথম উজ্জ্বল আলোয় অনুর মুখটা যখন তুলে ধরলেন তখন মনে হল, সত্যি তো অনু এত সুন্দর দেখতে তা তো কোনদিন ভাল করে অনুভবই করেননি।

এদিকে স্বর্ণ কদিন কলেজ ছুটি নিয়েছে, তার শরীরটাও বেশ খারাপ কদিন ধরে। বুকে একটা বেশ ব্যথা হচ্ছে, একটু হাঁটলেই হাঁপিয়ে পড়ছে। বিকেলে ওর এক ছাত্রী এসে দেখে বলল, ‘দিদি চলুন আপনাকে কোন হার্ট স্পেশালিস্টের কাছে নিয়ে যাই, বুকে ব্যথা, হাঁপিয়ে পড়া দুটোই কিন্তু হার্টের লক্ষ্মণ,’ চিরাচরিত স্বভাব স্বর্ণের হোহো করে হেসে উঠে বলল, ‘উফ্ মশা মারতে কামান দাগা।’

কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাড়ার যে ডাক্তারকে দেখান, তিনি বললেন ‘ম্যাডাম কার্ডিওলজিস্ট দেখাতে হবে এবং তা খুব তাড়াতাড়ি। কাকে ফোন করে বললেন যে স্যার আমার এক পেশেন্টকে পাঠাচ্ছি, মনে হচ্ছে হার্টের গণ্ডগোল’ ওপাশ থেকে কে কী বলল, বোঝা গেল না, এপাশ থেকে ডাক্তার বললেন ‘স্বর্ণলতা দত্ত বিখ্যাত লেখিকা, কালই সকাল দশটার সময়? ঠিক আছে স্যার তাই হবে।’

সকালে চেম্বারে পৌঁছে দেখলেন ডাঃ অমলকান্তি ব্যানার্জি। পাড়ার ডাক্তারটি তাঁকে নিজের গাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কী হয়েছিল আর কিছু মনে নেই সেখানেই অজ্ঞান হয়ে যান, দেখা যায় ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক, ডাঃ ব্যানার্জি খুব তাড়াতাড়ি ওটি রেডি করতে বলে পেশেন্টকেও রেডি করে দিতে বললেন খুব তাড়াতাড়ি, ‘এখনই অপারেশন করতে হবে।’

হ্যাঁ তাঁকে বাইপাস করতে হয়েছে, অসহ্য যন্ত্রণা, গা বমি বমি করছে সমানে, পেশেন্ট রেস্টলেস হয়ে যাচ্ছেন, ডাক্তার ছুটতে ছুটতে এলেন নার্সকে বকে বললেন, ‘এত কষ্ট পাচ্ছেন দেখছেন, আগে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে দেবেন তো!’ সিস্টারকে বলে সবাইকে ঘর থেকে বার করে দিয়ে আলো কমিয়ে নিজে টুল টেনে পাশে বসলেন।

কদিন পরে পরম স্নেহে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘ঘুমিয়ে পড়ো লতা’ ‘লতা— কতদিন পর ডাকটা শুনলাম।’ অমলের বুক ফেটে কান্না আসতে লাগল, ভালবাসার ভারে বুকটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে, স্বর্ণ ছেলেমানুষের মতন অমলের হাতটা জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘সারাটা জীবন আমার একা একাই কেটে গেল’, তারপর আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ল। পরের দিন অমল এসে দেখল, একদিনেই ছটফটে মেয়েটা বিছানার ওপর উঠে বসেছে, দুপাশে দুটো লম্বা বিনুনি ঝুলিয়ে, কাছে এসে নাড়ি দেখার ছল করে হাতটা নিজের হাতে তুলে নিলেন, আদরের চাপ দিলেন হাতে, স্বর্ণ অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ছিল, অমল ওর মুখটা ঘুরিয়ে নিজের দিকে নিয়ে বলল, ‘এত গল্প তো লিখলে, আমাদের গল্পটা লিখবে না?’ ‘না কখনও না’ ‘কেন অভিমান?’ ‘না, আমি জানি তো একমাসের মধ্যেই সব হয়ে গিয়েছিল, তোমার কিছু করার ছিল না তবে সেই জুঁই ফুলের গন্ধে ভরা বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যাটা চিরকাল আমার হয়েই থাক না, আমার একান্ত নিজস্ব একটা সন্ধ্যা।’ অমল ভুলে গেল এটা নার্সিংহোম। সে ওর দু গালে হাত দিয়ে মুখটা তুলে ধরে সেদিনের মতন ভরিয়ে দিল অনেক আদরের স্পর্শে সেই আদরের স্পর্শে কেঁপে উঠল স্বর্ণ। অমল বলল, ‘আর আজকে এই সময়টা আমার শুধু আমার একান্ত নিজস্ব। শুধু মাঝে মাঝে একটু ফোন করতে পারি?’ ‘না, একদম না’ ‘না কেন? শুধু একটু ফোনই তো করব, আর তো কিছু না’ ‘যে প্রেম আমরা মাটির তলায় চাপা দিয়ে দিয়েছি, কী দরকার তাকে আবার খুঁচিয়ে তোলার! আমাদের দুজনের মনেই যে অপূর্ণ প্রেমের প্রচণ্ড খিদে, আমি চাই না আমার জন্য তোমার ফুলের মতন মেয়ে আর সুন্দর বউটার চোখের জল পড়ুক তাই আর কাছেও আসব না, কথাও বলব না। শুধু একটা কথাই বলি তোমাকে, বউকে অসম্মান অবহেলা কোরো-না। মেয়েরা ভালবাসার অসম্মান সহ্য করতে পারে না’ ‘আর তুমি?’ ‘আমি থাকব তোমার মনের অন্তরালে, যেমন ছিলাম। আমাকে তো অপমান করোনি, ওখানে তুমি পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছিলে।’ ‘শুধু কথা দাও এরকম কোন অসুবিধা যদি হয় তো, আমাকে ডাকবে?’ ‘আরে বাবা আমার কিছু হবে না। তুমি ছাড়াও শহরে আরও হার্ট স্পেশালিস্ট আছে তো?’ ‘তার মানে জীবনের পরম বিপদের দিনেও আমাকে ডাকবে না? তোমার কিন্তু মাসে একবার করে চেকআপ দরকার’ ‘আমি ঠিক করিয়ে নেব, তুমি আমাকে নিয়ে আর ভেবো না, বললাম না সংসারে মন দাও, যা তোমার স্ত্রীর প্রাপ্য তাকে তা দিয়ো, এইটুকু অনুরোধ আমার রেখো। ঈশ্বর তো আছেন তাই তো জীবনের মধ্য লগনে এসেও অনেক কিছু সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি, আসি তাহলে?’ স্বর্ণের গলাটা ক্রমশ ভারি হয়ে আসছে কথা বলতে বলতে অমল তা বুঝতে পারল, শেষবারের মতন কাছে এসে হাতদুটো জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি তোমার সব কথা রাখব, তুমি একটা কথা আমার রেখো, অনুরোধও বলতে পার’ ‘কী কথা?’ স্বর্ণও দেখল, অমলের চোখ দুটো জলে ভরে এসেছে, ভারাক্রান্ত গলায় অমল বলল, ‘আমাকে না জানিয়ে চলে যেয়ো-না প্লিজ এইটুকু কথা রেখো।’ কথাটা বলেই অমল হনহন করে হেঁটে চলে গেল, স্বর্ণর গাড়িও বাড়ির দিকে রওনা হল। মনে পড়ল, রবিঠাকুরের সেই গান, "তুই ফেলে এসেছিস যারে, মন মন রে আমার…”

 

সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)