প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Thursday, August 1, 2024

শিল্পীর আত্মপ্রকাশ | পারমিতা দে দাস

বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/১০ম/২৫শে শ্রাবণ, ১৪৩১

ধারাবাহিক গল্প

পারমিতা দে দাস

শিল্পীর আত্মপ্রকাশ

[২য় পর্ব]

"অনিকেতকে দেখেই আমি সব ভুলে যাই। ওর মুখে এত মায়া। উশকোখুশকো চুল। গাল ভর্তি দাড়ি। সাদা একটা পাঞ্জাবি পরেছে। কাঁধে একটা ঝোলা। আমি ওকে দেখেই মনকে শক্ত করে পিছন ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম। পিছন থেকে আমার নাম ধরে ডাকল 'রাই'!"


পূর্বানুবৃত্তি একজন প্রথিতযশা সাহিত্যিক। যার সংসার অপেক্ষা শিল্পের খিদে প্রবল। গোটা সপ্তাহ ধরে অনিমিখ টাইফয়েডে ভুগলো। সেদিন রাতে ওর ১০৪ ডিগ্রি জ্বর। চার বছরের ছোট ছেলেটা বেহুঁশ হয়ে পড়েছিল। সেদিন রাতে আমি একরাশ শঙ্কা নিয়ে তোমাকে ফোন করেছিলাম। তুমি ফোনের ওপার থেকে বললে, রথীন ডাক্তারকে ফোন করে নাও। ব্যস এটুকুই কথা বলে ফোনটা কেটে দিলে। আমি আর এভাবে থাকতে পারব না। মা-বাবার কাছে চলে যাচ্ছি। ডিভোর্স ফাইল করেছি। তারপর…

তবে আমি তো এত দুর্বল মনের মেয়ে নই যে এভাবে দিনের পর দিন কারোর উপেক্ষা নিয়ে জীবনটা নিঃসঙ্গতায় কাটিয়ে দেবো। মায়া তো মনের কোণে আচ্ছন্ন হয়ে থাকা কুয়াশা, রোদ উঠলে ঠিকই কেটে যাবে। আমার সন্তান তার বাবার কাছ থেকে প্রাপ্য স্নেহ, যত্ন, আদরটুকু পাবে না এই যন্ত্রণা আমি কোনোভাবেই মেনে নেব না। আমি শান্ত। মোমের মতোই নরম। ভালবাসা পেলে লতানো গাছের মতোই আঁকড়ে ধরি কিন্তু তার মানে এই নয় আমার কোনো প্রতিবাদের ভাষা থাকবে না! যারা গলা উঠিয়ে প্রতিবাদ করতে জানে, এক-একটা মুখোশকে টেনে ছিঁড়ে ফেলতে পারে। তাদের ঘর ভাঙতে পারলেও, শিরদাঁড়া ভাঙা যায় না। আমি তো আর হিমশৈল পাহাড় নই রক্তে মাংসে গড়া একজন মানুষ।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে খেয়ালই নেই কখন যে আমাদের গ্রামে ঢুকে পড়লাম। উলুবেড়িয়া থেকে কাটোয়া আসতে সময় লাগে চার ঘন্টা। অনিমিখ ঘুমিয়ে পড়েছে। ফারুখ চাচা সুন্দর ভাবে গাড়ি ড্রাইভ করছে। অনিকেতের বাড়ির এই একটা মানুষের সাথে আমার একটা আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। অনিমিখকে কোলে করে আদরে যত্নে এই  চাচাই আগলে রাখে। শুনেছি অনিকেতের যখন বাবা-মা মারা যায় অনিকেতকেও ফারুখ চাচাই দেখাশোনা করত। তিনি শুধু একজন পুরোনো বিশ্বস্ত ড্রাইভারই নন একজন প্রকৃত ভাল মানুষ। আমার বিপদে অপদে সুসময়ে কতটুকুই বা পাই অনিকেতকে সবটাই সুন্দরভাবে সামলে দেয় ফারুখ চাচা। অন্য ধর্মের মানুষ হলেও চাচা কখনোই আমাদের ধর্মকে অসম্মান করে না। বরং বাড়িতে লক্ষ্মী পুজো হলে আমি আর চাচাই এতদিন নারকেল নাড়ু, তিলের নাড়ু, ভোগ রান্না করেছি। চাচার বাড়িতে ইদের দিন আমাকে আর অনিমিখকে নিয়ে যেত গোটাদিন চাচা-চাচি ও তাদের দুই মেয়ের সাথে হই হই করে কাটত। কিছু খাঁটি মনের মানুষ আছে বলেই হয়তো সমুদ্র আকাশের সাথে মিশে নীল রং ধারণ করে।

গ্রামে আমাদের গাড়ি ঢুকলেই রাস্তায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা গাড়ির পিছনে ছোটে। গ্রামের চায়ের দোকানে বাঁশের মাচা বসে যেসব বয়স্করা আড্ডা দেয় তারাও তাকিয়ে দেখছে। মহিলারা একজোট হয়ে বাড়ির রকে বসে তাকিয়ে আছে আমাদের গাড়ির দিকে। আমি জানলা দিয়ে মুখ বের করতেই তাদের মধ্যে একজন চেনা কাকিমা বলে উঠল 'ভাল আছিস মা? কত্ত দিন পর দেখলাম তোকে।'

আমি গাড়ি থেকেই হাত দেখিয়ে বললাম ভাল আছি গো। চাচা গাড়ি থামাল কয়েকটা কথা বলেই তারপরই গাড়ি চলল আমার বাড়ির পথে। আসলে বিয়ের পর একা আসিনি কখনো। হাতে গুণে মাত্র তিনবার এসেছিলাম অনিকেতের সাথেই। অনিকেতের প্রসঙ্গ এলে কারোর সাথেই বেশিক্ষণ কথা বলতে ইচ্ছে করে না। কী বলব আর? বলার মতো তো কিছুই নেই! কেউ কি বুঝবে আমার ভেতরের দংশন! গ্রামের লোকেরা এসব বোঝে না। ওরা সংসার মানে স্বামী সন্তানকে নিয়ে বেঁধে থাকা বোঝে।

গ্রামের দুপাশে ভাট ফুলের গন্ধ, মাটির সোঁদা গন্ধ সব মিলিয়ে এক আশ্চর্য গন্ধে ভরে আছে পরিবেশ। যতই আধুনিক হই পারফিউমের গন্ধ মাখি গায়ে আসলে এই গন্ধ জন্ম থেকে মিশে আছে আমার শরীরে। গাড়িটা বাড়ির কাছে দাঁড়াতেই মা তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রণাম করছিল আমাদের গাড়ি দেখেই ছুটে আসে। অনিমিখ ঘুম ভাঙা চোখেই দিদুনকে জড়িয়ে ধরে। আমি নামলাম। চাচা গাড়ি থেকে সব মালপত্র নামিয়ে দিলো। মা আমাকে দেখে একটু অবাকই হলো। জিজ্ঞেস করল 'তোর চোখ মুখ এমন শুকনো দেখাচ্ছে কেন? শরীরটরীর খারাপ করল নাকি?' আমি বললাম না গো। আমি ঠিকই আছি।

আমাদের বাড়িটা মাটির দোতলা বাড়ি। বাবা উঠোনে বসে রেডিয়ো শুনছিল। এত দিন পর নাতি আর মেয়েকে দেখে চোখের কোণটা জলে ভরে উঠল। চাচাকে মা লুচি, ছোলার ডাল, কাশ্মীরি আলুর দম আর তার সাথে মিষ্টি দিয়ে পরিবেশন করল। চাচা খেয়েদেয়ে অনিমিখকে আদর করে আবার রওনা দিলো উলুবেড়িয়ার পথে। আমাকে বলে গেল 'আমায় কিন্তু মনে রাখিস মা, আমি মাঝে মাঝেই আসব তোদের দেখতে।' বুকের ভেতরটা মুচড়ে এলো। তবু মুখে হাসি রেখে চাচাকে প্রণাম করে বাড়ির দোরগোড়া থেকে বিদায় জানালাম।

আমরা রাতের খাওয়া সেরে একেবারে যে যার ঘরে চলে গেলাম। পরদিন ভোরে উঠে বিছানা ছেড়ে জানলা খুলে তাকিয়ে রইলাম সবুজ মাঠে। ভোরের সূর্য তার কমলা রং ঢেলে দিয়েছে গোটা আকাশ জুড়ে। ঝাঁক ঝাঁক পাখি উড়ে যাচ্ছে কিচিরমিচির শব্দ করে। গোয়ালা গোরুর দুধ দুইয়ে নিচ্ছে। চায়ের দোকানের ঝাঁপ খুলছে পঁয়ষট্টি বছর বয়সের নরেশ কাকা। চারপাশে এক অপরিমেয় শান্তি। এতদিন ওই চার দেওয়ালের ভেতর থাকতে থাকতে ভুলেই গেছি ঘরের বাইরে আমার চেনা একটা অন্য পৃথিবী আছে। হারমোনিয়ামটা পড়ে ছিল আমার ঘরের এক পাশে। রিডগুলোতে ধুলো জমেছে। আমার মনের মতো। আমি একটা ছেঁড়া কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করে একটা ভৈরবী রাগের রবীন্দ্রসংগীত ধরলাম।

“পাখি আমার নীড়ের পাখি অধীর হল কেন জানি—

আকাশ-কোণে যায় শোনা কি ভোরের আলোর কানাকানি॥
ডাক উঠেছে মেঘে মেঘে অলস পাখা উঠল জেগে—
লাগল তারে উদাসী ওই নীল গগনের পরশখানি॥
আমার নীড়ের পাখি এবার উধাও হল আকাশ-মাঝে
যায়নি কারো সন্ধানে সে, যায়নি যে সে কোনো কাজে।
গানের ভরা উঠল ভরে, চায় দিতে তাই উজাড় করে—
নীরব গানের সাগর-মাঝে আপন প্রাণের সকল”

বহুদিন পর এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব হচ্ছে। অনিমিখ ঘুম থেকে উঠে চুপ করে আমার গান শুনছে। ও এই প্রথম ওর মা-কে গান গাইতে দেখছে। তার মা যে রান্নাবান্না আর ঘরের কাজ ছাড়া অন্য কিছুও পারে সে কথা আজ জানতে পারল ছোট্ট অনিমিখ।

মা ব্রেকফাস্ট নিয়ে ওপরে এলো। মনে হলো মা-কে বলে দিই অনিকেতের কথা। বলে দিই আমি সব ছেড়ে তোমাদের কাছে চলে এসেছি সারাজীবনের জন্য। আর কোথাও কোনোদিন যাবো না। বলতে পারলাম না। কাল রাতেও বলতে পারিনি। আমি জানি ওরা ঠিকই জেনে যাবে একদিন। কিছু কথা কত ছোট! বলতে পারলেই হালকা লাগবে জানি তবুও তীরের ফলার মতো বুকে গিয়ে বিঁধে যায় শ্রোতার। আমরা যারা দুর্বল মনের কাউকে কোনো কষ্ট দিতে পারি না নিজেদের জন্য। তারা কথার পাহাড় বুকের ভেতর জমা রেখে বেঁচে থাকতে পারে একটা গোটা যুগ। গোটা জন্ম…

এভাবেই তিনদিন কেটে গেল। অনিমিখকে এখানেরই কোনো এক স্কুলে ভর্তি করাব সেই জন্য স্কুলগুলোতে খোঁজ নিতে শুরু করলাম। আমি রেডি হয়ে বেরোবো ঠিক সেই সময় দেখি অনিকেত এসে উপস্থিত হয়েছে আমাদের উঠোনে। অনিকেতকে দেখেই আমি সব ভুলে যাই। ওর মুখে এত মায়া। উশকোখুশকো চুল। গাল ভর্তি দাড়ি। সাদা একটা পাঞ্জাবি পরেছে। কাঁধে একটা ঝোলা। আমি ওকে দেখেই মনকে শক্ত করে পিছন ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম। পিছন থেকে আমার নাম ধরে ডাকল 'রাই'! মা রোদে বড়ি দিচ্ছিল অনিকেতকে দেখে হাত ধুয়ে তাকে বলল, 'এসো বাবা এসো বলে ঘরে নিয়ে গেল।' আমি আর বেরোতে পারলাম না আজ। ছেলেকে দেখে জড়িয়ে ধরে সে কী আহ্লাদ! ছেলেও গলে গেল বাবা বাবা করতে করতে। এই ছেলেটাও বোঝে না কে ওর কতটা আপন। ও একদিন আমার মতোই ঠকবে।

রাতে খেয়েদেয়ে উঠে অনিকেত যখন ঘরে এলো অনিমিখ ঘুমিয়ে পড়েছিল। হ্যারিকেনটা টিমটিম করে জ্বলছে। ঘরে এক চাপা নিস্তব্ধতা। আমি জানতাম অনিকেত আবার ক্ষমা চাইবে। আমার চিঠির উত্তর দিতে চাইবে। আমি চাই না ও আর কিছু বলুক। আমি কিছুই শুনব না আর।

ক্রমশ…

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)