বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ছোটগল্প/২য় বর্ষ/৯ম/অমিতাভ গুপ্ত সংখ্যা/১৮ই
শ্রাবণ, ১৪৩১
অমিতাভ গুপ্ত সংখ্যা | ছোটগল্প
মনোজ চ্যাটার্জী
সাহিত্য মাফিয়া
"প্রভাসবাবুরা অতীব ভদ্রলোকের ছদ্মবেশে তোমার মতো সরল, ইনোসেন্ট যুবকদের নিজের খ্যাতি ও মর্যাদাবৃদ্ধিতে ইউটিলাইজ করেন, এরা সর্বদা চাটুকার পরিবেষ্টিত হয়ে গ্রুপবাজি ও লবিবাজিকে এমন এক মোহনীয় মোড়কে আবৃত করে রাখেন, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমান লোকেও বুঝতে পারে না।"
যে বয়সে সবাই সফল কেরিয়ারের
জন্য আত্মশক্তির শেষবিন্দু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যায়, অদ্ভুতভাবে সেই সময় অলোক একটা
সফল কবিতা লেখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিল। পড়াশোনায় সে যে খারাপ ছিল তা নয়,
হায়ার ফার্স্ট ডিভিশন নিয়ে মাধ্যমিক পাসের পর সায়েন্স নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পড়ছিল,
স্কুলের স্যাররা তার মেধার খুব প্রশংসা করতেন।
কিন্তু হঠাৎ তার মাথায় কী যে
সাহিত্যের ভূত ঢুকে গেল, পড়াশোনা প্রায় লাটে ওঠার জোগাড়। উচ্চমাধ্যমিকের মোটা মোটা
বিজ্ঞানের বইগুলো টেবিলের কোণায় অবহেলায় পড়ে থাকতে লাগল, হাতের কাছে জমতে লাগল 'নাম রেখেছি কোমলগান্ধার',
'ধূসর পাণ্ডুলিপি', রূপসী বাংলা', 'যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল', আরও কত কী।
বর্ধমান শহরের মাইল
দশের মধ্যেই আমারুণ গ্রাম, বর্ধমান-কাটোয়া রোডের গায়েই একেবারে। আধঘণ্টার মধ্যেই
গ্রাম থেকে শহরে আসা যায়, আবার রাত্রি দশটা পর্যন্ত শহর থেকে গ্রামে ফিরতেও কোনো
অসুবিধা নেই, প্রত্যেক পনেরো মিনিটে বর্ধমান-কাটোয়া বাস হইহই করে আমারুণের পাশ
দিয়ে চলে যাচ্ছে। এহেন একটা গ্রামে বাসে করেও অলোক যে এইভাবে নিজের পায়ে নিজে
কুড়ুল মারবে, তা তার মা-বাবা তো দূরের কথা, গ্রামের লোকেরাও একবারও ভাবতে পারেনি।
সে যাই হোক, অলোকের
মা-বাবা বা পাড়াপড়শি নিয়ে এই গল্প নয়, এ গল্প একান্তভাবে এক ব্যতিক্রমী যুবকের
গল্প, যে ছাঁচের পুতুল হতে চায়নি কোনদিন। তাই অলোকের কথায় ফিরে আসি। প্রথমদিকে
মূলত আবেগসর্বস্ব কবিতা ও গল্প লিখলেও, সময়ের সাথে সাথে তার মেধা ও পড়াশোনাকে
অবলম্বন করে সে আস্তে আস্তে লেখায় বেশ হাত পাকিয়ে ফেলছিল। তারপর যা হয়, নিজের লেখা
কবিতা ছাপার অক্ষরে দেখার বাসনায়, বর্ধমান শহরে গিয়ে এক লিট্ল ম্যাগ সংগঠনে যোগ
দেয়। নূন্যতম সদস্যচাঁদা দিয়ে 'দুর্নিবার' পত্রিকার প্রসারে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে
ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার লেখা গোটাদশেক কবিতা ছাপার জন্য মনোনয়নের নিমিত্তে জমা দেয়। পত্রিকার
সম্পাদক হলেন প্রভাস বন্দোপাধ্যায়, যে কেউ দেখলেই বুঝতে পারবেন একেবারে নিরীহ
নিপাট ভদ্রলোক। প্রথম দর্শনেই আপন করে নেন অলোককে, তিনি তো এরকমই নির্মল, উজ্জ্বল
ছেলেই খুঁজছিলেন, এরাই তো সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ।
দুই-তিন মাস পরে অনেক
আর্থিক সমস্যার বাধা অতিক্রম করে একসময় 'দুর্নিবার' রবীন্দ্রসংখ্যা প্রকাশ হয়।
অলোক খবরটা পেতেই তার সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যায়। তার স্বপ্নের সিঁড়ির
প্রথম ধাপে আজ অবশেষে সে পা রাখতে পারল। প্রভাসবাবু তাকে পত্রিকা প্রকাশের কথা
ফোনে জানাতেই, সে কিছুক্ষণের জন্য নির্বাক হয়ে যায়।
- হ্যালো, হ্যালো, কী হলো, তুমি শুনতে পাচ্ছ?
তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে অলোক উত্তর দেয়, - আমার খুব ভাল লাগছে প্রভাসদা, এই প্রথম আমি এই ধরনের আনন্দ পেলাম। একটা কথা জিজ্ঞেস করব দাদা?
- হ্যাঁ হ্যাঁ বলো, এত সংকোচের কী আছে?
- আমার কোনও কবিতা কী ছাপা হয়েছে পত্রিকায়?
- হ্যাঁ, তোমার একটা কবিতা ছাপা হয়েছে, কাল সকালের দিকে আমার বাড়িতে এসো, তোমার কপি নিয়ে যেয়ো, এসো কিন্তু, অনেক কথা আছে।
- অবশ্যই আসব দাদা, আপনার কথা কি অমান্য করতে পারি?
সারারাত উত্তেজনায়
অলোকের ঘুম আসে না। বর্ধমান শহরের নামকরা লিট্ল ম্যাগাজিনে তার কবিতা ছাপা
হয়েছে, ভাবলেই এক অদ্ভুত আনন্দ মনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। পরের দিন বেলা সাড়ে দশটায়
সে পৌঁছে যায় প্রভাসদার বাড়ি, পত্রিকার কার্যালয়ে।
- আরে এসো এসো, তোমার কথাই ভাবছিলাম, এই দেখো আমাদের এবছরের রবীন্দ্র সংখ্যা অলোক কাঁপা কাঁপা হাতে পত্রিকাটি ধরে দ্রুত পাতা ওল্টাতে থাকে।
- আরে আস্তে আস্তে, অবশ্য তোমার বয়সে আমারও এমন উদ্দীপনা হোতো, পেয়েছ তোমার কবিতা?
তার কবিতা চোখে পড়তেই, হঠাৎ তার উৎসাহের গ্যাসবেলুনটা কে যেন সূক্ষ্ম সুচ ফুটিয়ে দেয়। যে কবিতাটা তার নিজেরই কখনো মনে হয়নি, ছাপা হবে বলে, সেটা এমন একপাতার এককোণে ছাপা হয়েছে যে চট করে কারোর চোখেই পড়বে না। যাইহোক, দ্রুত সে নিজেকে সামলে নেয়।
- আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে প্রভাসদা, তা আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না।
- ঠিক আছে, ঠিক আছে, এই উৎসাহ ধরে রাখতে হবে কিন্তু, ক্রিকেট তো অনেকেই খেলে, কজন আর শচীন তেন্ডুলকর হয়, এটা ভুলে যেয়ো না। আর শোনো, এই দশটা কপি তোমাকে দিলাম, তোমার চেনাশোনা, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আত্মীয়স্বজন এদের মধ্যে চেষ্টা করে বিক্রয় করতে হবে কিন্তু, এর উপরই কিন্তু পরবর্তী সংখ্যার প্রকাশনা অনেকখানি নির্ভর করবে।
একটা পলিথিন প্যাকেটে
এগারোটা পত্রিকা হাতে করে অলোক গ্রামে ফিরে আসে। ইতিমধ্যে তার সমস্ত উৎসাহ,
উদ্দীপনার গ্যাসবেলুনটার গ্যাস নির্গত হয়ে প্রায় মাটিতে নেমে এসেছে। তার অনেক
পরিশ্রম ও প্রচেষ্টার প্রিয় কবিতাগুলি সব নাকচ হয়ে গিয়ে, শেষকালে কিনা ওই সাত
লাইনের বালখিল্যতাপূর্ণ কবিতাটি নির্বাচিত হল। অনেক চেষ্টার পর
নিজেকে সামলায় সে। যা হয়েছে, হয়েছে এখন এই দশটি পত্রিকা তাকে বিক্রয়ের জন্য চেষ্টা
করতে হবে।
প্রথমেই সে তার মাধ্যমিক
বিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষক অতীনবাবুর বাসায় গিয়ে উপস্থিত হয়। অতীনবাবু তাকে বরাবর
খুব স্নেহ করতেন আর তিনি চিরকালই সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক। অলোক নিশ্চিত ছিল, অতীনবাবু
তাকে ফেরাবেন না, আর এই কুড়ি টাকা মূল্যের বই তিনি হামেশাই কিনে থাকেন।
- আরে অলোক যে, কতদিন
পর স্যারকে মনে পড়ল, এসো এসো বসো, থাক থাক প্রণাম করতে হবে না, তারপর কী খবর
তোমার, কার মুখে যেন শুনছিলাম, তুমি নাকি আজকাল পড়াশোনা ভাল করে করো না।
- তা তোমার মুখেই শুনি, কী বৃত্তান্ত।
- তা নয় স্যার, পড়াশোনা করছি, তবে আমি এখন একটু সাহিত্যে উৎসাহী হয়েছি, এই দেখুন স্যার, আমাদের পত্রিকা, আমার কবিতা ছাপা হয়েছে।
- তা বেশ বেশ, কই দেখি। একি এই ছোট্ট আবেগসর্বস্ব কবিতা এই নামী লিট্লম্যাগে ছাপল ওরা। কিছু মনে করো না, তুমি তো জানো, আমি সবসময়ই ষ্পষ্টভাষী।
- একদম ঠিক বলেছেন স্যার, এই দেখুন স্যার, আমার কবিতার খাতা, এই দশটি কবিতা আমি দিয়েছিলাম ছাপার জন্য। আপনি তো পুরনো আমলের বাংলায় এমএ। আপনিই বিচার করুন।
- তাহলে শোনো, তোমার এই
'নীরবে, নিভৃতে' কবিতাটি খুবই প্রতিশ্রুতিময় কবিতা। এই কবিতাটি কলকাতার পত্রিকাতেও
নির্বাচিত হত। কিন্তু এরা বাতিল করেছে।
- এসো, তোমার একটু চক্ষু উন্মোচন করি, তোমার এই প্রভাসবাবুরা অতীব ভদ্রলোকের ছদ্মবেশে তোমার মতো সরল, ইনোসেন্ট যুবকদের নিজের খ্যাতি ও মর্যাদাবৃদ্ধিতে ইউটিলাইজ করেন, এরা সর্বদা চাটুকার পরিবেষ্টিত হয়ে গ্রুপবাজি ও লবিবাজিকে এমন এক মোহনীয় মোড়কে আবৃত করে রাখেন, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমান লোকেও বুঝতে পারে না। তোমাকে কবি ও লেখকরূপে প্রতিষ্ঠা দেওয়া নয়, তোমার সদস্য চাঁদা ও অর্থ সংগ্রহে তোমাকে ব্যবহার করাই এদের একমাত্র অভিপ্রায়।
ঘন্টাখানেক অতীনবাবুর
সঙ্গে কথা বলার পর অলোকের মাথা থেকে কী যেন একটা বোঝা নেমে যায়। অনেক হালকা বোধ
করে সে। ধীরে ধীরে গ্রামের মেঠোপথ ধরে বাড়িতে ফিরে আসে। নিজের ঘরে ঢুকে পড়ার
টেবিলের বিজ্ঞান বইগুলোর ধুলো ঝেড়ে সুন্দর করে সাজায়।
- হ্যালো, হ্যালো, কী হলো, তুমি শুনতে পাচ্ছ?
তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে অলোক উত্তর দেয়, - আমার খুব ভাল লাগছে প্রভাসদা, এই প্রথম আমি এই ধরনের আনন্দ পেলাম। একটা কথা জিজ্ঞেস করব দাদা?
- হ্যাঁ হ্যাঁ বলো, এত সংকোচের কী আছে?
- আমার কোনও কবিতা কী ছাপা হয়েছে পত্রিকায়?
- হ্যাঁ, তোমার একটা কবিতা ছাপা হয়েছে, কাল সকালের দিকে আমার বাড়িতে এসো, তোমার কপি নিয়ে যেয়ো, এসো কিন্তু, অনেক কথা আছে।
- অবশ্যই আসব দাদা, আপনার কথা কি অমান্য করতে পারি?
- আরে এসো এসো, তোমার কথাই ভাবছিলাম, এই দেখো আমাদের এবছরের রবীন্দ্র সংখ্যা অলোক কাঁপা কাঁপা হাতে পত্রিকাটি ধরে দ্রুত পাতা ওল্টাতে থাকে।
- আরে আস্তে আস্তে, অবশ্য তোমার বয়সে আমারও এমন উদ্দীপনা হোতো, পেয়েছ তোমার কবিতা?
তার কবিতা চোখে পড়তেই, হঠাৎ তার উৎসাহের গ্যাসবেলুনটা কে যেন সূক্ষ্ম সুচ ফুটিয়ে দেয়। যে কবিতাটা তার নিজেরই কখনো মনে হয়নি, ছাপা হবে বলে, সেটা এমন একপাতার এককোণে ছাপা হয়েছে যে চট করে কারোর চোখেই পড়বে না। যাইহোক, দ্রুত সে নিজেকে সামলে নেয়।
- আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে প্রভাসদা, তা আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না।
- ঠিক আছে, ঠিক আছে, এই উৎসাহ ধরে রাখতে হবে কিন্তু, ক্রিকেট তো অনেকেই খেলে, কজন আর শচীন তেন্ডুলকর হয়, এটা ভুলে যেয়ো না। আর শোনো, এই দশটা কপি তোমাকে দিলাম, তোমার চেনাশোনা, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আত্মীয়স্বজন এদের মধ্যে চেষ্টা করে বিক্রয় করতে হবে কিন্তু, এর উপরই কিন্তু পরবর্তী সংখ্যার প্রকাশনা অনেকখানি নির্ভর করবে।
- তা তোমার মুখেই শুনি, কী বৃত্তান্ত।
- তা নয় স্যার, পড়াশোনা করছি, তবে আমি এখন একটু সাহিত্যে উৎসাহী হয়েছি, এই দেখুন স্যার, আমাদের পত্রিকা, আমার কবিতা ছাপা হয়েছে।
- তা বেশ বেশ, কই দেখি। একি এই ছোট্ট আবেগসর্বস্ব কবিতা এই নামী লিট্লম্যাগে ছাপল ওরা। কিছু মনে করো না, তুমি তো জানো, আমি সবসময়ই ষ্পষ্টভাষী।
- একদম ঠিক বলেছেন স্যার, এই দেখুন স্যার, আমার কবিতার খাতা, এই দশটি কবিতা আমি দিয়েছিলাম ছাপার জন্য। আপনি তো পুরনো আমলের বাংলায় এমএ। আপনিই বিচার করুন।
- এসো, তোমার একটু চক্ষু উন্মোচন করি, তোমার এই প্রভাসবাবুরা অতীব ভদ্রলোকের ছদ্মবেশে তোমার মতো সরল, ইনোসেন্ট যুবকদের নিজের খ্যাতি ও মর্যাদাবৃদ্ধিতে ইউটিলাইজ করেন, এরা সর্বদা চাটুকার পরিবেষ্টিত হয়ে গ্রুপবাজি ও লবিবাজিকে এমন এক মোহনীয় মোড়কে আবৃত করে রাখেন, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমান লোকেও বুঝতে পারে না। তোমাকে কবি ও লেখকরূপে প্রতিষ্ঠা দেওয়া নয়, তোমার সদস্য চাঁদা ও অর্থ সংগ্রহে তোমাকে ব্যবহার করাই এদের একমাত্র অভিপ্রায়।
***

No comments:
Post a Comment