প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Wednesday, March 12, 2025

শেষ থেকে শুরু [পর্ব – ২১] | পারমিতা চ্যাটার্জি

বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক উপন্যাস/২য় বর্ষ/৩৫তম সংখ্যা/২২শে চৈত্র, ১৪৩১
ধারাবাহিক উপন্যাস
 
পারমিতা চ্যাটার্জি
 
শেষ থেকে শুরু
[পর্ব২১]

"মালাবদলসিঁদুরদান উলু আর শঙ্খধ্বনির মাঝে কেউ লক্ষ্য করেনি মনকলির মুখটা শুকিয়ে গেছে। থেকে থেকে বুকের ব্যথাটা বেশ চাগার দিচ্ছে। যার লক্ষ্য করার কথা তার ঠিক লক্ষ্য পড়েছে।"

 
পূর্বানুবৃত্তি সজল আর রাহুল ডিনার করে গল্প করতে করতে ঘুমতে গেল। কথায় কথায় মনকলির অসভ্যতার কথা বলে হালকা হলো। এদিকে বর প্রবীরের সঙ্গে মনকলির বেশ জমে উঠেছে, দুজনেই দুজনের কেয়ার নিচ্ছে। বিয়ের সাজে সুচরিতাকে খুব সুন্দর লাগছে দেখে সজলের মনটা কেমন করে উঠল। তারপর…
 

মনকলি সুচরিতাকে নিয়ে এল যখন সবাই মিলে বলে উঠল কী অপূর্ব লাগছে, রাহুল তো মুগ্ধ হয়েই আছে আবারও নতুন করে মুগ্ধ হল যেন, একদৃষ্টিতে চেয়ে ছিল, সুচরিতার অস্বস্তি হচ্ছে, রাহুলকে বলল,

-কী হচ্ছে, চোখটা নামাও!
রাহুল হেসে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে দেখল, সজল নেই,
-সজল কোথায় গেল?
বলে ও উঠে খুঁজতে যাচ্ছিল, স্যার ধরে ওকে বসিয়ে দিয়ে বলল,
-এখন সইটই সব করে নাও তারপরে বন্ধুকে খুঁজতে যেও।


সজল আজ সুচরিতাকে দেখে যেন নিজেকে সামলাতে পারছিল না। সেই কবে থেকে ভালোবেসে আসছে কিন্তু সুচরিতার দিক থেকে কোন সাড়া পায়নি। একসময় ভাবল, কী এমন দেখল, রাহুলের মধ্যে যা তার মধ্যে নেই! আবার একসময় ভাবছে তখন যদি একটু জোর করত, তাহলে হয়তো— নাহ্‌ তাহলেও হত না, কে যে কখন কীভাবে কাকে ভালোবেসে ফেলে তা নিজেও জানে না।
 
হাঁটতে হাঁটতে এসব আবোলতাবোল ভাবতে ভাবতে অযোধ্যা পাহাড়ের প্রায় কাছাকাছি চলে গেল, হঠাৎ যেন ঘোর কাটল, আনমনে হাঁটতে হাঁটতে সে কতদূর চলে এসেছে! রাহুল তার প্রিয় বন্ধু তার সাথে সুচরিতার বিয়ে হচ্ছে, সে কী সব উল্টোপাল্টা ভাবছে। ইশ্‌ বিয়েটা বোধহয় এতক্ষণ হয়েই গেছে, রাহুল কী ভাবছে কে জানে, তাড়াতাড়ি সে হাঁটতে লাগল বিয়ের আসরের দিকে।
 
ওদের সই হয়ে গেছে, এখন দুজনকে মালাবদল করিয়ে সিঁদুরদান হবে, রাহুল ছটপট করছে সজলের জন্য, কোথায় গেল ছেলেটা! বেশ চিন্তাও হচ্ছে, অজানা জায়গা, সে যেন ঠিক মতন মন দিতে পারছে না বিয়েটাতে। সুচরিতার অভিমানী মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করছে, এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে সজল ঢুকল, ঢুকেই প্রিয় বন্ধু রাহুলকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-সরি রে আমি এই এত সুন্দর প্রকৃতি দেখে হাঁটতে হাঁটতে একটু দূরেই চলে গিয়েছিলাম
রাহুল বলল,
-যদি হারিয়ে যেতিস কী হত? আমি মন দিয়ে বিয়েটাই করতে পারছিলাম না।
সজল বলল,
-নে এখন তো এসে গেছি তাড়াতাড়ি মালাবদল কর
মালাবদল, সিঁদুরদান উলু আর শঙ্খধ্বনির মাঝে কেউ লক্ষ্য করেনি মনকলির মুখটা শুকিয়ে গেছে। থেকে থেকে বুকের ব্যথাটা বেশ চাগার দিচ্ছে। যার লক্ষ্য করার কথা তার ঠিক লক্ষ্য পড়েছে। প্রবীর হঠাৎ খেয়াল করল, মনকলি যেন জোর করে কোন কষ্টকে চেপে যাচ্ছে। ও তাড়াতাড়ি এসে ওকে জড়িয়ে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। ভিড় থেকে বাইরে এনে চেয়ারে বসিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করল,
-কী হয়েছে মন?
-কিছু হয়নি গো শুধু বুকে—
-শুধু বুকে কী?
-একটা ব্যথা হচ্ছে
-সে কী! কখন থেকে! আমায় বলোনি তো!
-না, বলার মতন সেরকম কিছু কষ্ট হয়নি তাই
বলে মনকলি তার সুন্দর মুখটা তুলে ধরল স্বামীর  মুখের দিকে, প্রবীর মুখটা নিজের বুকে চেপে ধরল, মনকলি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। প্রবীর বিমূঢ় হয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
-চলো কাল সকালে আমরা কলকাতা চলে যাই
মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল মন।
সজল দূর থেকে দেখে কাছে এসে জিজ্ঞেস করল,
-কী হল?
মুখ শুকনো করে প্রবীর বলল,
-ওর বুকের ব্যথাটা আবার হচ্ছে সজল, ভাবছি কাল কলকাতায় নিয়ে যাব
-আপাতত ব্যথা কমার কোন ওষুধ নেই?
-হ্যাঁ তা তো আছে, আমি ওর কোয়ার্টার থেকে চট করে নিয়ে আসছি
-হ্যাঁ তাই নিয়ে এসো, আমি ততক্ষণ বসছি এখানে চিন্তা কোরো না।
সজলের খারাপ লাগল এতদিনে ওদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটা সুন্দর মিলন হল, তাও মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়ল, আর এ এমনই অসুখ এ যে ভালো হবে না সে সবাই জানে তবে আজকাল অনেকদিন বাঁচিয়ে রাখে এ অসুখটা মানুষকে। অন্তত পাঁচ-সাত বছরও যদি ভালোভাবে একটু বেঁচে যায় তাহলেও প্রবীর শান্তি পাবে। অসুখের প্রথম দিকে প্রবীর যে খুব সঙ্গ দিয়েছিল তা নয়, এ কথা প্রবীর নিজেই বলেছে তবে চিকিৎসার কোন গাফিলতি করেনি। কিন্তু এই অসুখে মানুষ তো একটু সহমর্মিতা চায় যা প্রবীর এখন দিচ্ছে তা তখন পারেনি।
 
আজ সজলের মনটাও ছটপট করছে, সেও হয়তো ফিরে গিয়ে বিয়ে করবে কিন্তু ও দেশের মেয়ে বাবা-মা কিছুতেই মেনে নেবে না, তবু বিয়ে করতে হবে কোন মেয়ের সাথে এতদিন থেকে তারপর বিয়ে করব না বলে প্রতারণা সে কিছুতেই করতে পারবে না।
 
রাহুল আর সুচরিতা এসে দাঁড়াল, প্রবীরও ওষুধ নিয়ে এল, রাহুল বলল,
-কী হয়েছে? আমাকে ডাকিসনি কেন?
প্রবীর করুণ মুখে বলল,
-ওর বুকের ব্যথাটা আবার বেড়েছে তাই ওষুধটা আনতে গিয়েছিলাম বাড়িতে, ওষুধটা খাইয়ে দাও তাড়াতাড়ি সজল লক্ষ্য করল, প্রবীরের হাত কাঁপছে, সে তখন প্রবীরের হাত থেকে ওষুধ নিয়ে মনকলির ঘাড়ের তলায় হাত দিয়ে ওকে একটু হেলিয়ে ওষুধটা খাইয়ে দিল, সুচরিতা ওর কাছে বসে ওর মাথাটা বুকে টেনে নিল, দু চোখ দিয়ে দুবন্ধুর জল পড়ছে। সুচরিতা বলল,
-কিচ্ছু হবে না তোর, আমরা কিচ্ছু হতে দেব না।
মনকলি আসতে আসতে উঠে বসল,
-কমেছে ব্যথাটা?
আকুল প্রশ্ন প্রবীরের
-হ্যাঁ এখন অনেকটা ভালো লাগছে
রাহুল বলল,
-পারবি খেতে যেতে?
সুচরিতা বলল,
-না তোমরা সবাই খেতে বস আর ওর জন্য একটু খাবার এনে দাও আমি ওকে এখানে খাইয়ে দিচ্ছি
-না তা হয় না সুচরিতা, তোমাদের আজ বিয়ে, রাহুলের দিকটাও তো দেখতে হবে! আমরা আছি তো! আমি, প্রবীর সবাই আছি, আজকের দিনটার জন্য আমাদের হাতে ছেড়ে দাও বন্ধুকে
মনকলি বলল,
-ওষুধ খেয়ে ব্যথাটা অনেক কম মনে হল আজ সুচির বিয়ে এখন আমরা সবাই একসাথে বসে খেতে পারব।
মনকলি সামান্য খাবার নিয়ে  নাড়াচাড়া করছে, প্রবীর লক্ষ্য করল, রাহুল জিজ্ঞেস করল,
-কী রে মনকলি এখন শরীর কেমন আছে?
মনকলি উত্তর দিল,
-প্রবীর খুব কষ্ট পাচ্ছে
-এটা আমার প্রশ্নের উত্তর হল না
-এখন আমি ভালো আছি
এবার হাসি হাসিমুখে রাহুল বলল,
-এইটাই আমি শুনতে চেয়েছিলাম, তুমি ভালো আছ আর তুমি ভালো থাকবে, এত ভালো স্বামী তোমার তার সাথে ভালো না থেকে পারা যায়!
প্রবীর বলল,
-বাইরে নিয়ে গিয়ে ভালোভাবে চিকিৎসা করলে আমার বিশ্বাস ও ভালো হয়ে যাবে, আমাকে আমার বাবার বন্ধু বলেছিলেন, ওঁর স্ত্রী ওই একই রোগে আক্রান্ত প্রায় ৩০ বছর বয়স থেকে এখনও বেঁচে আছেন ভদ্রমহিলার ৭০ বছর বয়স।
-অত আশা কোরো না তুমি তাহলে কষ্ট আরও বেড়ে যাবে, এমনও তো অনেক আছে রোগ ধরা পড়ার তিন-চার মাসের মধ্যে শেষ হয়ে গেছে
-কী মুশকিল তোমার তো তা হয়নি, তবে তুমি এসব নিয়ে এত ভাবছ কেন?
রাহুলও ভালো করে খেতে পারছে না, একসময় এই মনকলিকে পাগলের মতন ভালোবেসে ছিল, এখন সেই ভালোবাসা শূন্যতে নেমে এলেও ওরা একসাথে বেড়ে উঠেছে, প্রথন যৌবনের সেই সোনার দিনগুলো ছেলেমেয়ে একসাথে বন্ধুর মতন পড়াশোনা করা, পাড়ার পুজো, সরস্বতী পুজোয় অংশগ্রহণ করা, বড়োই মধুর ছিল, যদিও মনকলি, সুচরিতা ওদের আরও কিছু বন্ধু সবার নাম আর মনে পড়ছে না, তাদের থেকে চার-পাঁচ বছরের জুনিয়র ছিল।
 
মনকলির তখন চোদ্দো বছর বয়স ওইটুকু মেয়ের কী অহংকার ছিল, তাও রাহুল ওকে প্রপোজ করে কী যাচ্ছেতাই অপমানিত হয়েছিল আজও ভাবলে ওর দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে না, ওর যে এত অসুখ, তাও তাকে যেন স্পর্শ করছে না, আরও ভালোভাবে বলা যেত।
 
সুচরিতা যেমন সজলকে কত নম্র-ভদ্রভাবে না বলেছিল তাই সজল তো অপমানিত হয়নি আজও সুন্দরভাবে ওরা কথা বলে। যতই সজল অন্য কাউকে ভালোবেসে বিয়ে করুক তবুও এখনও যে তার সুচরিতার প্রতি এক অটুট ভালোবাসা, একটুও কমেনি তা রাহুল বেশ বুঝতে পারে। এখন রাহুলও বুঝতে পারে সুচরিতার শুধু বাইরেটা সুন্দর নয় তার চেয়ে ভেতরটা অনেক বেশি সুন্দর।
 
ওদের  খাওয়ার পর সবাই ওদের নিয়ে কোয়ার্টারে নিয়ে গেল, খুব সুন্দর করে সাজিয়ে ছিল সমস্ত কোয়ার্টারটা। খাটটাও অসাধারণ সাজিয়ে ছিল সজল, বাড়ির গেট থেকে আরম্ভ করে খাট পর্যন্ত সব জায়গায় নিখুঁতভাবে সজল সাজিয়েছিল। সবই করছে কিন্তু সুচরিতার প্রতি টানটা যেন কিছুতেই কমছে না
 
ওদের ফুলশয্যার ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারবার চেষ্টা করছে, আর রাহুল বেশ শক্ত করে দরজা বন্ধ করে জানলাগুলো চেক করতে লাগল। সুচরিতা খাটে বসে মিটিমিটি হাসছে।
 
 
ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)