প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Wednesday, March 12, 2025

স্মৃতি সুধায় [২য় পর্ব] | পারমিতা চ্যাটার্জি

বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক গল্প/২য় বর্ষ/৩৩তম সংখ্যা/৮ই চৈত্র, ১৪৩১
ধারাবাহিক গল্প
পারমিতা চ্যাটার্জি
 
স্মৃতি সুধায়
[২য় পর্ব]

"কী সব কিনছরাস্তার ধূলোমাখা সব অখাদ্য শ্রী এতদিন আমার সাথে থেকেও তোমার চিপ মেন্টালিটিটা আর গেল না
তখন মেলা প্রাঙ্গণে রবীন্দ্রসংগীত গাইছেন একজন কেউ "দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি"।"

 
পূর্বানুবৃত্তি রবীন্দ্রভারতীর গানের ছাত্রী শ্রীচেতা কয়েকজন বান্ধবীর সঙ্গে ছবির প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিল। ছবি দেখতে দেখতে একটা ছবির সামনে থমকে গেল, অনেকক্ষণ। শিল্পী সুজয় সেন কথা বলে জানতে পারল ছবিটা পছন্দ হলেও আজ নেবে না, শুধু অ্যাডভান্স দেবে। তারপর…
 

বিয়ে মানেই তো রোজকার চাল নেই ডাল নেই তখন তুমিও বলবে— এবার ছবি আঁকা ছেড়ে একটু রোজগার বাড়াবার দিকে মন দাও, মেয়ের এখনও স্কুলের মাইনে দেওয়া হয়নি আর আমিও বলব— গানটা কম করে সংসারে একটু মন দাও মেয়ের রেজাল্টাটা দেখেছ কী হয়েছে? এসবের মধ্যে তোমার সুর আর আমার রংতুলি ক্যানভাস সব হারিয়ে যাবে। তার চেয়ে আমরা যদি বিয়ে না করে দূরে থেকে রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতার লাবণ্য আর অমিতের ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখি চিরকাল? হয়তো দেখা হবে না হলেও বছরে একবার কী দুবার কিন্তু আমাদের ভালোবাসা থেকে যাবে শ্রী এই না দেখা হবার আকাঙ্ক্ষা আমাদের দুজনকে অনেক কাছে রাখবে। চিরকাল আমরা প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ থাকব, কোনদিন কেউ আমাদের এই বাঁধন কেটে দিতে পারবে না।

 
শ্রী বলল,
-তাতে হয়তো ঘর বাঁধা হবে কিন্তু মনকে তো আর কারও সাথে বাঁধতে পারব না
-নাই-বা পারলে শ্রী মনের বাঁধন তো তোমার আমার সাথেই আছে এই বাঁধনকে বাঁচাবার জন্যেই তো আমাদের এই প্রয়াস, তাহলে একবার কাছে এসো
বলে সুজয় দুহাত বাড়িয়ে  শ্রীকে কাছে টেনে নেয় আর গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরে ওর মুখ কপাল গলা অজস্র চুম্বনে ভরিয়ে দেয়। শ্রীও গভীর ভাবে এই আদর উপভোগ করে।
 
কালের যাত্রাপথে দুজনেই চলতে থাকে দুপথ দিয়ে প্রায় দশ বছর পর শ্রীর আব্দারে শ্রী সপরিবারে আসে শান্তিনিকেতন পৌষমেলার প্রাঙ্গণে। শ্রীর স্বামী নামী কোম্পানির চিফ অফিসার। শান্তিনিকেতনে এসে শ্রী যেন ফেলে আসা দিনগুলির স্বাদ গভীরভাবে অনুভব করতে থাকে। সে মহা উৎসাহে ছেলেকে বলে,
-দেখ কী ভালো পিঠেপুলি খাবি?
ছেলে বলে,
-হ্যাঁ
স্বামী সোহম দেখতে পেয়ে বলে,
-কী সব কিনছ? রাস্তার ধূলোমাখা সব অখাদ্য শ্রী এতদিন আমার সাথে থেকেও তোমার চিপ মেন্টালিটিটা আর গেল না
তখন মেলা প্রাঙ্গণে রবীন্দ্রসংগীত গাইছেন একজন কেউ "দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি"।
 
শেষ সে এসেছিল সুজয়ের সাথে, কী মজাই না করেছিল দুজনে সেদিন সুজয় ওকে একটা লাল পলাশের মালা পরিয়ে দিয়েছিল। ও মনে মনে বলল— তোমার লাল পলাশের মালা এখনও অলক্ষ্যে আমার গলায় আছে সুজয় সোনার ঝকমকানি মালা তাকে ছিঁড়ে ফেলতে পারেনি।
 
একটা ছবির  স্টলে দাঁড়িয়ে সে ছবি দেখছিল হাতে আঁকা কত শিল্পীর ছবি কিন্তু সুজয়ের ছবি তো নেই। হঠাৎ একটা চেনা গলা শুনে মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখল সুজয় তার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি দেখছে, মুখ নিচু করে জিজ্ঞেস করল,
-কেমন আছ শ্রী?
-তুমি? আমি তো তোমার ছবি খুঁজছিলাম।
-আমি জানি, তাই তোমায় দেখতে পেয়েই এখানে এলাম। আমার রংতুলি ইজেল সব হারিয়ে গেছে শ্রী, আমি আঁকা ছেড়ে দিয়েছিছবি আঁকার মতন কাজে আমার স্ত্রীর মন ভরে না ওতে আধুনিক ফ্ল্যাট দামি গাড়ি কিছুই হয় না, তাই সবার মন রাখতে আমি এখন একটা নামী অ্যাডএজেন্সির গ্রাফিক ডিজাইনারআর তোমার কথা বল?  তোমার গান?
-আমার সুরও হারিয়ে গেছে সুজয়, আধুনিক পার্টিতে রবীন্দ্রসংগীত চলে না আমার স্বামীও পছন্দ করে না তাই আমিও আর গাই নাকিন্তু তোমার প্রেম আমি বাঁচিয়ে রেখেছি একান্ত গোপন কুঠুরিতে ওইটুকু শুধু একান্তই আমার, ওখানে তোমার ছবি রংতুলি ইজেল সব যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছি খুঁজলেই পেয়ে যাবে।
-আমি জানি তাই-তো আজও পলাশের মালা হাতে এসেছি তোমায় দেখেআর তোমার ভালোবাসা (নিজের বুকের মাঝে হাত রেখে বলল) হৃদয়ে রেখে দিয়েছি যত্ন করে, তোমার সুরও আমায় বেঁধে রেখেছে এখনও তোমার তানপুরার তারে ওটাও ছিঁড়বে না কোনদিন
-মালাটা দেবে-না?
শ্রী সামনে হাত মেলে দেয়, সুজয় ওর প্রসারিত হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলে,
-এই নাও
দূর থেকে ভেসে আসে স্বামীর গুরুগম্ভীর গলা,
-কোথায় গেলে?
শ্রী একবার করুণ চোখ দুটো মেলে ধরে সুজয়ের দিকে তারপর মৃদু হেসে বলে,
-আসি?
সুজয় বলল,
-এসো— তোমার ওই চোখদুটো আঁকা আছে আমার বুকের ক্যানভাসে।
-ভালোবাসা বেঁচে আছে সুজয়...
-হ্যাঁ আমরা হারিয়ে যাব না, চিরকাল দুজন দুজনকে খুঁজে বেড়াবতারপর হঠাৎ আবার একদিন খুঁজে পাবো জনস্রোতের প্লাবনের মধ্যে।
দুজনে দুদিকের পথ ধরে যেতে যেতে একবার পিছন ফিরে তাকায়।
 
মাইকে রবীন্দ্রসংগীত বাজছে, "ভরা থাক স্মৃতি সুধায় বিদায়ের পাত্রখানি"।
 
সমাপ্ত
 

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)