ধারাবাহিক
উপন্যাস
পারমিতা চ্যাটার্জি
শেষ
থেকে শুরু
[পর্ব – ২০]
"সজল দেখছে ওর যতটা খুশি হবার কথা প্রিয় বন্ধুর বিয়েতে ও যেন ততটা খুশি হতে পারছে না। বুকের কাছে মন খারাপের চিনচিনে ব্যথা অনুভব করছে। জোর করে নিজের ভাবনাটা মন থেকে সরিয়ে ফেলতে চেষ্টা করছে, নিজের সাথে নিজেই যুদ্ধ করছে।"
পূর্বানুবৃত্তি ওরা সব নিকট
আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে কলকাতা থেকে গোটা ছয়েক গাড়িতে রওনা হলো। বিয়ের আগে বউয়ের সঙ্গে
দেখা করা যাবে না শুনে রাহুল মনমরা হয়ে গেল। যাত্রার ফাঁকে চা খেতে নেমে সুচরিতার সঙ্গে
আলাদা গল্প করতে গেলে তাকে নিয়ে মজা করল সবাই। তারপর…
সজল এসে
দাঁড়াল রাহুলের সামনে,
দুজন দুজনকে
দেখল তারপর জড়িয়ে ধরল,
সজল বলল,
-আমি খুব খুশি হয়েছি রে, সুচরিতার একনিষ্ঠ ভালোবাসার যে তুই মর্যাদা দিয়েছিস। অনেকদিন পর ভীষণ প্রিয় দুবন্ধুর দেখা, সজলকে রাহুল বলল,
-চল আমার
কোয়ার্টারে আয় ওখানে দুবন্ধু থেকে যাই।
-আর তোমার বউ?
-ও তো এখন বাপের বাড়ির কন্ট্রোলে।
-সে কী রে?
-হ্যাঁ এখন থেকে বিয়ে অবধি নাকি মুখই দেখা যাবে না।
-সে কী রে! তুই বেঁচে থাকবি? পুরো একদিন
না দেখে?
-এই ইয়ার্কি করিস না।
রাতে সবাই
হালকা ডিনার করে
শুয়ে পড়ার তোড়জোড় করতে লাগল, সবাই খুব
ক্লান্ত। রাহুল আর সজল একসাথে ডিনার করে দুজনে গল্প করতে লাগল। মনকলি ওর সাথে
কীরকম অসভ্যতা করেছিল সব কথা বলে রাহুল যেন হালকা হল
প্রিয় বন্ধুর কাছে।
-সত্যি কথা ও যতই আমাকে পটানোর চেষ্টা করত, আমার ওর ওই
প্রগলভতা ভালো লাগত না।
-ভাবতাম তোকে বলি ওর দিক থেকে মন সরা, তোকে যে
ভালোবাসে তার কাছেই যা,
তুই তখন শুনিসনি আমার কথা, শেষ পর্যন্ত…
-শেষ পর্যন্ত তোমার কথাই তো শুনলাম বন্ধু। কিন্তু তুই কি সন্ন্যাসী হয়েই থাকবি?
-না রে ও দেশের একটি মেয়ের সাথে আছি আপাতত ফিরে গিয়ে
বিয়ে করার কথা ঠিক হয়ে আছে।
এদিকে
মনকলির সাথে মনকলির বরের বেশ ভাব জমে উঠেছে। প্রবীর যতটা পারছে মনকলির সাথে কথা
বলে, ভালোবেসে
ওকে যত্নে রাখার চেষ্টা করছে, আগের মতন অবহেলা করছে না একদম। মনকলিও নিজের
কোয়ার্টারে স্বামী নিয়ে আছে। মুখরোচক কিছু রান্না যতটা পারে করবার চেষ্টা করছে।
পরের দিন
সকালে প্রথমে মেয়ের বাড়ির লোকেরা আশীর্বাদ করতে গেল, সঙ্গে
কলকাতা থেকে আনা ভালো জলভরা তালশাঁস সন্দেশ। তার সাথে
আশীর্বাদ লেখা বড়ো বড়ো সন্দেশ, এক হাঁড়ি দই, এক হাঁড়ি রসগোল্লা। এদিকে মেয়েকে
সাজানো হচ্ছে, মেয়ের
বাড়ির আশীর্বাদ এরপরেই হবে। মেয়েকে ওরা আগেকার দিনের কুন্দন সেট দিয়ে আশীর্বাদ করল। রাহুল একটু বিরক্ত হয়েই প্রমোদবাবুকে বলল,
-এত অনুষ্ঠান
আমার ভালো লাগছে না স্যার।
-তা কী করবে, মানুষ একটু আনন্দ করবে না?
-আমি চেয়েছিলাম রেজিস্ট্রি করে মালাবদল আর খাওয়াদাওয়া
ব্যস।
স্যার বললেন,
-আরে একটাই
তো দিন একটু সহ্য করে নাও।
রাহুলের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল, ও তো একটু শান্ত প্রকৃতির ছেলে বেশি হই-হুল্লোড় কোনদিন পছন্দ করে না। মনকলি আর ওর বর এল, এসে সজলকে
বলল,
-এখন মনে
হচ্ছে অনেকটা ভালো আছে,
বাইরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করালে মনে হয় ঠিক হয়ে যাবে, না সজল?
সজল বলল,
-আমরা তো
সবাই তাই চাই।
আর গায়ে
হলুদের ঝামেলা হল না,
প্রিন্সিপাল স্যার অনেক করে বুঝিয়ে রাজি করালেন, তাতে ছেলের
লোকেরা থেমে গেলেও সুচরিতার মাসি মামী পিসি ওরা চাইল, কিন্তু সেই অর্থে ওদের এয়ো
নেই, সুচরিতার
দুই বউদি ছাড়া আর সবাই বিধবা হয়ে গেছেন। শেষ পর্যন্ত গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান বাদ হয়ে
গেল।
মনকলি গিয়ে সুচরিতাকে খুব সুন্দর শাড়ি আর একটা মুক্তোর মালা দিল। খুব
সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়ে ওর কানে কানে বলল,
-জানিস
প্রবীর একদম বদলে গিয়েছে,
ও আশা করছে
বিদেশে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করালেই আমি ভালো হয়ে যাব, কিন্তু আমি জানি
আমি আর ভালো হব না, খুব
বেশি দিন বাঁচবও না।
-কেন এরকম বলছিস? সবাই মিলে চাইছে তোর সুস্থতা, আমাদের সবার এত শুভকামনা সব বৃথা
যাবে? তা
কখনোই হতে পারে না, তুই
মনে একটু জোর
আন, মনটাকে
ভালো রাখার চেষ্টা কর,
আমারা সবাই আছি তো! অসুখের কথাটা ভুলে যা তো একদম ভুলে যা।
-ভুলে গেলেই কি অসুখটা উড়ে যাবে রে! নে চল, অনেক দেরি
হয়ে গেল, কী
সুন্দর লাগছে তোকে।
ঘাড়ের কাছে এলোখোঁপায় সাদা জুঁই ফুলের গোড়ের মালা খুব সুন্দর করে জড়িয়ে দিয়েছে মনকলি।
ঠিক হল দু
বাড়ির আইবুড়োভাত একসাথে খাওয়া হবে। সজল রাহুলকে সুচরিতার দেওয়া তসরের পাঞ্জাবি
আর পাজামা পরিয়ে বেশ সুন্দর করে সাজিয়েছে। রাহুলও
বন্ধুকে একটা সুন্দর পাঞ্জাবি আর সেরোয়ানি কিনে দিয়েছে, সজল সেইটাই
পড়েছে, খুব
সুন্দর মানিয়েছে সজলকে। সুচরিতাকে মনকলির সাথে আসতে দেখে সজল মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে
রইল, বন্ধুর চোখের এ
মুগ্ধতা রাহুলের চোখ এড়িয়ে গেল না। রাহুলও দেখল আজ সুচরিতাকে খুবই সুন্দর
লাগছে।
-সত্যি চোখ ফেরাতে পারছি না।
রাহুল ওর
কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল।
সজল দেখছে ওর যতটা খুশি হবার কথা প্রিয় বন্ধুর
বিয়েতে ও
যেন ততটা খুশি হতে পারছে না। বুকের কাছে মন খারাপের চিনচিনে ব্যথা অনুভব করছে। জোর
করে নিজের ভাবনাটা মন থেকে সরিয়ে ফেলতে চেষ্টা করছে, নিজের সাথে নিজেই যুদ্ধ করছে। শেষে
একটু স্থির হয়ে রাহুল আর সুচরিতাকে দাঁড় করিয়ে মোটা অঙ্কের চেক তুলে দিয়ে বলল,
-যেমন ভাবে
ইচ্ছে খরচা কর।
ওরা দুজনেই
অবাক হয়ে বলল,
-তা বলে এত? তুই কি পাগল হয়ে
গেছিস নাকি?
-না রে বাবা আমি পাগল ছাগল কিছুই হইনি, আমি শুধু
চাই আমার প্রিয় বন্ধু আর প্রিয় বান্ধবীর ঘরটা নতুন ভাবে সেজে উঠুক, খাট, আলমারি, ড্রেসিং
টেবিল, ডাইনিং
টেবিল সব নতুন হবে।
রাহুল বুঝতে
পারছে সজলের কষ্টটা কিন্তু সুচরিতার হাসিখুশি ঝলমলে মুখটা তার মনে জোর দিচ্ছে। প্রিন্সিপাল
একটা বড়োসড়ো ফ্রিজ এনে হাজির করলেন,
-ওইটুকু
ফ্রিজ কি বিয়ের পর হয় নাকি?
একটু পরে
রেজিষ্ট্রেশন হবে সুচরিতাকে আর একচোট সাজাতে বসল, মনকলি যত গয়না ছিল সব পড়াতে লাগল, সুচরিতা বলল,
-ওরে বাবারে
এবার ছাড় আর পারছি না আমি।
সিঁদুর রঙা
বেনারসিতে সুচরিতার ফর্সা রং
যেন ঠিকরে পড়ছে,
-সত্যি
অসাধারণ লাগছে, আমার
চেয়ে তুই
অনেক বেশি সুন্দর।
মনকলি বলল।
-এই তুই কী এখন কম্পিটিশনে
বসবি নাকি? কে
বেশি সুন্দর?
-আরে না না আমার ছোট্টবেলার সুন্দরী বন্ধুকে একটু আদর করব না?
এদিকে
রেজিস্টার তাড়া দিচ্ছে।
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment