ধারাবাহিক
গল্প
ডঃ নিতাই
ভট্টাচার্য
চড়ক
সংক্রান্তি
[২য় পর্ব]
"রাত ঘন হয়েছে। দুয়ারে বসে রতন। কেশব কি ফিরবে আজ? কে জানে। মনের টানে সাড়া দিয়ে কেশব যে কোন ঘাটে তরি ভিড়িয়েছে আজ, তাই ভাবছিল রতন। সেই সময় কেশব আসে।"
পূর্বানুবৃত্তি ঘরবাড়ি গ্রাম থেকে পালিয়ে রতন এদিক
সেদিক ঘুরে, এটা সেটা করে পেট চালায়। গয়ার কাছে কেশব বাউলের সঙ্গে দেখা হলে কথায় কথায়
তাঁর আখড়ায় লুকিয়ে থাকে। গাজন সন্ন্যাসীদের দেখে পুরনো কথা মনে পড়ে। তারপর…
সতেরো বছর! এই তো সেই দিনের ঘটনা মনে হয় রতনের। মাঝে মাঝে আখড়ায় একলা বসে
ভাবে রতন, সময়
কেমন ভাবে এগিয়ে যায়! এতগুলো বছর পেরিয়ে গেল! আজও কত সামান্য ঘটনা রতনকে পিছনে
তাকাতে বাধ্য করে। কদিন আগে কোপাইয়ের হাটে গিয়েছিল রতন। বেচাকেনা চলছে ভালোই।
হঠাৎ করে চোখে পড়ে একটা বাচ্চাছেলে এক মহিলার হাত ধরে পা টেনে টেনে হেঁটে এগিয়ে
চলছে। সেই দেখে পুষ্প আর নিজের ছেলের কথা মনে পড়ে। সারাদিন মনের মধ্যে একই দৃশ্য মাথা
তুলেছে বারবার। সব শুনে কেশব বলে, "মন বড়ো বালাই গো রতন, কোন ঘটনায়
কোন পুরানো ছবি সামনে এনে তোমায় পিছনে টেনে ধরে সে কথা বোঝা শিবেরও অসাধ্য।"
কথাটা ঠারেঠোরে সত্যি বলে মেনেছে। এই তো সেদিন, মাস তিন-চার আগের কথা। ভেদিয়া স্টেশনে নেমে বাঁধের পথ ধরে আখড়ায় ফিরছিল রতন। এক
মাঝবয়েসি মহিলার কথা বলার ধরন দেখে পুষ্পর কথা মনে আসে।
বিমর্ষ হয় রতন।
পরিবারের
সবার কাছ থেকে দূরে থাকার যন্ত্রণা আজও অসহনীয় মনে হয় রতনের। সময় নাকি নিত্য
নতুন ঘটনা সামনে এনে দিনে দিনে ধূসর করে তোলে অতীতকে। হাজারো ঘটনার পলি, ফেলে আসা
দিনের রংয়ের উজ্জ্বলতা মলিন করে দেয়। মনের মধ্যে জ্বলতে থাকা আগুনও নাকি স্তিমিত
হয়ে আসে সময়ের প্রবাহে। কোথায়? এই সতেরো বছরে একটা দিনও বেঁচে স্বস্তি পায়নি রতন। হাজারো
চিন্তার চোরাস্রোতে বয়ে গেছে জীবন। শুধু যে আপন পরিবারের কথা ভেবে যন্ত্রণা
পেয়েছে এমন তো নয়,
এক অপরাধবোধ ঘুর ঘুর করেছে চারপাশে। হা-হুতাশ করেছে নিজের
মনে।
অনুতাপের আগুনে দগ্ধ হয়েছে রোজ। না জানি কত কষ্টে রয়েছে সুনীল ঘোষের পরিবার।
একটা আস্ত মানুষকে খুন করেছে রতন। সেই পাপের সাজা থেকে নিস্তার নেই তার।
সন্ধ্যা
নেমেছে। ফাঁকা হয়েছে অশ্বত্থ গাছের তলা। কখন যে ফিরে গেছে গাজন সন্ন্যাসীরা, খেয়াল
রাখেনি রতন। ছায়ান্ধকারে দাঁড়িয়ে নিজের সঙ্গেই কথা বলে
চলেছিল এতক্ষণ। মাত্র কয়েক মিনিটে কত বছরের ঘটনা ফিরে এসেছে রতনের মনে। একটা
দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে বুকের থেকে। পা ফেলে আখড়ার দিকে। চান সেরে চুলো জ্বালবে।
দুই জনের জন্য রাতের সামান্য খাবারের আয়োজন করবে তারপর।
বাঁধের
রাস্তা ধরে রতন। নিজের কথা ভেবে কাতর রতন ভাবে কেশব বাউলের কথা। বড়ো অদ্ভুত মানুষ
কেশব। কোন সে যুবক বয়সে ঘর ছেড়েছে। তারপর থেকে পথেই কাটছে জীবন। তারও তো আপনজন
প্রিয়জন আছে, তাদের
কথা ভেবে কেশবকে কখনও বিমর্ষ থাকতে দেখেনি রতন। পুরানো কথার ভার মুখের হাসিকে
ছায়াবৃত করেনি কখনও। কীভাবে পারে কেশব? জিজ্ঞাসা
করেছে রতন বহুবার। কেশব হেসে বলে, "ছাড়ব বলেই ছেড়েছি, তাকে আর
আঁকড়ে ধরা কেন।" বলে গলা ছেড়ে গান ধরে কেশব,
"অচিন পাখি খুঁজতে চেয়ে
ঘর বেঁধেছি ঘরকে ভুলে,
প্রেম
সায়রে ডুব দিয়ে তাই..."
সহজ কথায়
সেজে ওঠা সেই গান সহজবোধ্য মনে হয় না রতনের। বরং এক উদাসী ডানায় ভর করে মন ভেসে
যায় অজানা কোন দেশে। কেশবের সে গানের সুর মূর্ছনায় রতনের দুই চোখের কোল টলটলে
হয়ে ওঠে। কেমন এক বলতে না পারা ব্যথায় ভরে ওঠে মন। "কার কথা মনে আসে বলতে
পারি না গো বাউল। মন আমার হুহু করে ওঠে, মনে হয় অঝোরে কাঁদি", বলে রতন।
গান থামিয়ে রতনকে বুকে টেনে নেয় কেশব। বলে, "মনের ভাব বোঝা বড়ো কঠিন হে। সে
সুখেও কাঁদে দুখেও কাঁদে। মন যে ঠিক কী চায় সে কথা মনেরও
অজানা গো।" কেশব বাউলের কথা শুনে ফুঁপিয়ে ওঠে রতন, যেন বাচ্চাছেলেটি।
সান্ত্বনা দেয় কেশব। প্রায় সমবয়সি মানুষটিকে তখন তার চেয়ে কত
বড়ো মনে হয় রতনের।
রাত ঘন
হয়েছে। দুয়ারে বসে রতন। কেশব কি ফিরবে আজ? কে জানে। মনের টানে সাড়া দিয়ে কেশব
যে কোন ঘাটে তরি ভিড়িয়েছে আজ, তাই ভাবছিল
রতন। সেই সময় কেশব আসে। "কই হে রতন। দেখো দেখি কাকে সঙ্গে
করে নিয়ে এসেছি। আমার ছেলেবেলার বন্ধু গো..."
ছেলেবেলার
এক বন্ধুর সঙ্গে পথে দেখা হয়েছে কেশবের। তাকে নিয়ে এসেছে আখড়ায়। "বলে
কিনা মেয়ের বাড়ি থেকে ফিরছি, পরে আসব। আমি জোর করে নিয়ে এসেছি।" হাসতে হাসতে বলে
কেশব।
গল্পেগুজবে
এগিয়ে চলেছে সময়। দুই বন্ধুর ছেলেবেলার কথায় মুখর হয়েছে আখড়া। আকাশে নক্ষত্রদের
প্রবেশ প্রস্থানে গভীর হয়েছে রাত। একসময় ঘুমে ঢলে পড়েছে কেশব। গভীর নিদ্রায়
মগ্ন কেশবের বন্ধু। নিঝুমতায় মুখর হয়েছে প্রকৃতি। বহু দূর থেকে গাজন
সন্ন্যাসীদের ডাক কানে আসে। ঘুম ছিল না রতনের দুই চোখে। এমন সংবাদ যে কখনও শুনতে
হবে সে কথা তার ভাবনার অতীত ছিল। এত বছর যে অপরাধের পাষাণভার বুকে
নিয়ে বেঁচে থেকেছে রতন আজ সেই ভার যেন নিজে থেকেই সরে গিয়ে এক অমেয় স্বস্তির
বার্তা এনেছে জীবনে। রতন খুনি নয়! রতনের লাঠির আঘাতে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেও প্রাণ হারায়নি সুনীল ঘোষ! এই সংবাদ দিয়েছে কেশব
বাউলের বন্ধু। সুনীল ঘোষের ছেলের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে কেশবের বন্ধুর মেয়ের, আজ রতনের
গ্রাম থেকেই ফিরেছে ভদ্রলোক।
এক অননুভূত
অনুভূতি মনে নিয়ে সারা রাত ছটপট করেছে রতন। মনের সমস্ত পাপ এক লহমায় কে যেন মুছে
দিয়েছে। শাপমুক্তি হয়েছে রতনের। কেশব বাউল ঠিকই বলে, "জীবন বড়ো
বিচিত্র হে।"
তারপর থেকে
ব্যাকুল হয়েছে রতন। চড়ক সংক্রান্তির দিনে গ্রামের ধর্মরাজের চরণে হত্যে দিয়ে
মানত রক্ষা করতে চেয়েছে।
আজ চড়ক
সংক্রান্তি। গতকাল রাত থাকতেই ভেদিয়া থেকে গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল রতন। সাতসকালে গ্রামে পৌঁছে ধর্মরাজের থানে হত্যে দিয়ে
মানত রক্ষা করেছে। তারপর নিজের অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়েছে সুনীল ঘোষের কাছে। এত
বছর পর রতন ফিরে এসেছে খুশি পরিবারের লোকজন। রতনকে ঘিরে সুখের হিল্লোল আজ। সতেরো
বছর পর পুরানো মাটির গন্ধ পেয়ে পরম শান্তি পেয়েছে রতন নিজে। দূরে থেকে যে সমস্ত ভাবনা পীড়িত করেছে রোজ রোজ, পরিবেশ
পরিস্থিতির বদল আজ ধুয়ে দিয়েছে সেই সব ঘুম-কাড়া দুশ্চিন্তার রেখাগুলিকে।
রতনের ছেলে ডান-পা টেনে টেনে হাঁটে এই দৃশ্য তাকে আজ যত না
যন্ত্রণা দেয় তার চেয়ে ঢের বেশি সুখী হয় রতন ছেলে তার সুস্থ থেকে বেঁচে আছে এই
কথা ভেবে। বাবা-মায়ের বয়স হয়েছে। বার্ধক্যজনিত সমস্যা
এসেছে তাদের জীবনে। সে তো অনিবার্য। পুষ্পর শরীরের সে বাঁধন আজ শিথিল অনেকটাই।
সময় থাবা বসিয়েছে তারও শরীরে, সে তো অস্বাভাবিক নয়। সব চেয়ে
সুখের কথা পরিবারের সবাই খেয়েপরে বেঁচে রয়েছে। রতনের উপস্থিতি
নবপ্রাণ সঞ্চার করেছে সকলের মধ্যে। সুখী আজ রতন নিজেও। তবুও কোন অবাধ্য ভাবনা
ভাসিয়ে নিয়ে যায় রতনকে, চোখের দুই কোল বানভাসি হয় বারবার। কোন অজানা কারণে বুকের
মধ্যে অনুভব করেছে এক নিষ্ঠুর বিষন্নতা। সবার মাঝে থেকেও একলা মনে হয় নিজেকে, কান্না আসে
বুক ঠেলে। এত বছর রতনের চোখে জল দেখলে আপন বুকে টেনে নিয়ে সান্ত্বনা দিয়েছে যে
মানুষটা সে আজ বহু দূরে। আজ কার ভালোবাসার স্পর্শে শান্ত হবে রতনের মন? জানে না
রতন। শুধু দু চোখ বন্ধ করলে শুনতে পায় কে যেন কানে কানে বলে, "...মন সুখেও
কাঁদে দুঃখেও কাঁদে। মন যে কী চায় সে কথা বুঝি মনেরও অজানা
গো।"
সমাপ্ত
No comments:
Post a Comment