ধারাবাহিক
গল্প
ডঃ নিতাই
ভট্টাচার্য
চড়ক
সংক্রান্তি
[১ম পর্ব]
"অপলক হয়ে গাজন সন্ন্যাসীদের দিকে তাকিয়ে থাকে রতন আর কে যেন ফিশফিশ করে বলে, "পালিয়ে যা রতন, পুলিশে ধরলে ফাঁসি হবে তোর।" স্মৃতির দেরাজ খুলে যায়। কত কথা ভেসে আসে মনে। আর সুনীল ঘোষের রক্তমাখা মুখটা ফুটে ওঠে সামনে।"
"বাবা
মহাদেবের চরণে সেবা লাগি।" থমকে দাঁড়ায় রতন। তাকিয়ে দেখে, বাঁধের পাশে
বড় অশ্বত্থ গাছের নীচে বেশ কয়েকজন গাজন সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে
রয়েছে। মাঝেমধ্যে একযোগে গলা ছেড়ে বলে "বাবা মহাদেবের..."।
কাল চড়ক
সংক্রান্তি। চোত মাসের শেষ দিন। মহাদেবের পুজো দিয়ে ব্রতভঙ্গ করবে গাজন
সন্ন্যাসীরা। বড় কঠিন এই গাজন সন্ন্যাসীদের ব্রত, রতন জানে। তার গ্রামেও বিপুল সমারোহে
ধর্মরাজের পুজো হতো। হতো কেন, আজও হয় নিশ্চয়ই, তবে সে-সবের থেকে রতন আজ অনেক অনেক দূরে। কোথায় পশ্চিম মেদিনীপুরের মঙ্গলগ্রাম আর কোথায় ভেদিয়া!
আজ সারাদিন
আলমগঞ্জের হাটে ছিল রতন। মাঝেমধ্যে গাজন সন্ন্যাসীদের হাঁকডাক কানে এসেছে। চোখেও
পড়েছে বেশ কয়েকজনকে। বেচাকেনার ফাঁকে সেই ডাক ভাসিয়ে নিয়ে গেছে রতনকে। এক
অফুরান শূন্যতায় ভরে উঠেছে মন।
"জয় বাবা
মহাদেবের...।" ধীর পায়ে এগিয়ে যায় রতন অশ্বত্থ গাছের দিকে, গোল হয়ে
বসেছে শিবভক্তের দল। দিন শেষে বাবা মহাদেবের চরণে প্রার্থনা জানিয়ে যে যার ঘরে
ফিরে যাবে। একপাশে দাঁড়িয়ে থাকে রতন। ফেলে আসা দিনের কথা মনে আসে। বহু বছর আগে
গাজনে একবার সন্ন্যাসী হয়েছিল। দিন শেষে বাড়ি ফিরে ধর্মরাজের উদ্দেশ্যে ধুনি জ্বালাত। আর রতনের বউ একরত্তি ছেলেটাকে রতনের কোলে বসিয়ে দিয়ে বলত, "ধর্মরাজকে
বলো খোকা যেন..."। ছেলে কোলে নিয়ে প্রার্থনা করত রতন ধর্মরাজের কাছে। তবে সে
বছর চড়ক সংক্রান্তির দিনে পুজো দিয়ে মানত রক্ষা করা হয়ে ওঠেনি রতনের, কারণ ছিল।
অপলক হয়ে
গাজন সন্ন্যাসীদের দিকে তাকিয়ে থাকে রতন আর কে যেন ফিশফিশ করে বলে, "পালিয়ে যা রতন, পুলিশে ধরলে
ফাঁসি হবে তোর।" স্মৃতির দেরাজ খুলে যায়। কত কথা ভেসে আসে মনে। আর সুনীল
ঘোষের রক্তমাখা মুখটা ফুটে ওঠে সামনে। এক বোধ্য পাপবোধ ছায়া ফেলে মনে। ভারী হয়ে
ওঠে বুক।
সেদিন চড়ক
সংক্রান্তি। ধর্মরাজের পুজো। গাজন সন্ন্যাসী হয়েছে রতন, একমাত্র
সন্তানের আরোগ্য কামনায় মানত রেখেছে। এক মাস শুদ্ধাচারে থেকে ভিক্ষার অন্নে
খুন্নিবৃত্তি করে সংক্রান্তির দিনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হত্যে দেবে বাবা
ধর্মরাজের থানে। পরামর্শ দিয়েছিল গ্রামের সুধা মোড়ল।
তখন সুখের
সংসার রতনের। মা-বাপ জমি আর চাষ নিয়ে সুন্দর গ্রাম্যজীবন।
তারপর বিয়ে হলো পুষ্পর সঙ্গে। রতনের স্ত্রীর কোল আলো করে সন্তান এলো, সুখ-সুধায় টলটলে সংসার। ফুটফুটে ছেলে কোলে পেয়ে খুশি পুষ্প। ভীষন খুশি রতন। দিন কাটে আনন্দে। সময়ের তালে তালে বড় হচ্ছে ছেলে। মাস কয়েকের
মধ্যেই সুখের ঘরে বিষাদের ছায়া। সদ্য হামা টানতে শিখেছে ছেলে। মাঝেমধ্যে নিজের
পায়ে দাঁড়াতে চায় আর তখনই উল্টে পড়ে, ডান পা ভীষণ দুর্বল। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে দেশ দুনিয়ার ডাক্তারের কাছে ছুটেছে রতন।
সবাই একই কথা শুনিয়েছে, বাচ্চার এই সমস্যা জন্মগত।
অদৃষ্টের
লিখন। চোখের জল ফেলে পুষ্প। হতাশায় দীর্ণ রতন। তখন রতনকে পরামর্শ দেয় গ্রামের
সুধা মোড়ল। "আমাদের গ্রামের ধর্মরাজ বড় জাগ্রত দেবতা রে রতন। কত লোকের কত
বিপদ কাটল। মানত কর তুই। সন্ন্যাসী হয়ে..."। পরামর্শ মনে ধরে রতনের। সেই বছর
গাজন সন্ন্যাসী হয় রতন। "বাবা ধর্মরাজের চরণে সেবা লাগি", বলে পাঁচটা
গ্রামে ভিক্ষে করে চোত মাস ভোর। দিন শেষে সেই অন্নই গ্রহণ। সারাদিন
শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বাবা মহাদেবের নাম নেওয়া, সবই চলছিল ঠিক ঠিক। এরই মাঝে একদিন
সকালবেলায় আসে রতনের পাশের বাড়ির সুনীল ঘোষ। "দাস পুকুরের পাড়ের জমিটা মাপজোখ করে নিজের নিজের সীমানা ঠিক করে
নেওয়া ভাল রতন। আমার অংশটা বিক্রি করব আমি।" সুনীল বলে রতনকে। "সে ব্যাপারে
পরে কথা হবে চোত মাস কাটুক,
বোশেখ মাসে যা করার করা যাবে"। রতনের কথা মানতে নারাজ সুনীল, হাতে তার
সময় কম। সেই নিয়েই ছোটখাট বচসা বাধে দুজনের মধ্যে। বেশ গরম কথা সুনীলকে শোনায়
রতন। সুনীলও ছাড়বার পাত্র নয় জেদ বাড়ে তারও, "শেষ দেখেই
ছাড়ব"।
সংক্রান্তির
দিনে সাতসকালে চান করে ভিজে কাপড়ে ধর্মরাজের থানের দিকে হাঁটা দেয় রতন, থমকে
দাঁড়ায় দাস পুকুরের পাড়ে এসে। দেখে নিজের মতো করে জায়গার
সীমানা নির্ধারণ করে নিয়ে বেড়া দিচ্ছে সুনীল। মাথায় আগুন ছোটে রতনের। দু-এক কথায় সুনীলকে থামানোর চেষ্টা করে। পরিস্থিতি গরম হয়ে ওঠে। দিগ্বিদিক জ্ঞান হারায় রতন। একটা লাঠি তুলে নিয়ে ভীষণ জোরে
বসিয়ে দেয় সুনীলের মাথায়। চোখ উল্টে মাঠিতে পড়ে সুনীল।
মাথার রক্তে মাটি ভিজেছে। রতনের কাণ্ড দেখে দৌড়ে আসে
অনেকে। সকলেই নিশ্চিত, প্রাণ হারিয়েছে সুনীল ঘোষ। শুরু হয় হাপিত্যেশ। রতনকে গঞ্জনা দেয় সকলেই। পুলিশে খবর দেবার কথাও বলে কেউ কেউ। হঠাৎ করেই
ভিড়ের মধ্যে থেকে কে যেন চিৎকার করে রতনকে বলে, "পালিয়ে যা
রতন পুলিশে ধরলে ফাঁসি হবে তোর"। সেই ভয়ানক পরিস্থিতিতে সে কথার গুরুত্ব
অনুধাবন করতে অসুবিধা হয়নি রতনের। সেই গ্রাম ছেড়েছে রতন, ফেরেনি আর।
তারপর এলাকা ছেড়ে বহু দূরে চলে গেছে। মেদিনীপুর থেকে হাওড়া
হয়ে এসে পৌঁছায় দানাপুরে। পুলিশের ভয়ে এদিক সেদিক লুকিয়ে থেকেছে। বেশ
কিছুদিনের জন্য আশ্রয় পায় এক বিহারি কবিরাজের কাছে। প্রায়
বছর দুয়েক বিহারের বিভিন্ন গ্রামে কবিরাজি ওষুধ ফেরি করেছে রতন। একদিন গয়ার কাছে
এক মেলায় পরিচয় হয় কেশব বাউলের সঙ্গে। কেশবকে ভাল লাগে রতনের। বিশ্বাস করে
নিজের অবস্থার কথা খুলে বলে। কেশব বলে "আখড়ায় একা থাকি আমি। বাউল মানুষ।
মেলায় মেলায় ঘুরি। হাটেবাজারে ট্রেনে গান শোনাই। পেটের চিন্তা করি না, সে চিন্তা
চিন্তামণির। মাথা গোঁজার আশ্রয় মিলবে আমার আখড়ায়। বুঝে দেখো আমার
সঙ্গে থাকবে কিনা।" কেশবের আখড়ায় এসে ওঠে রতন, তারপর থেকে
ভেদিয়াতেই রয়েছে।
প্রথম প্রথম
পুলিশের ভয়ে কেশবের আখড়ায় বন্দি রেখেছে নিজেকে। নতুন জায়গা, এলাকায়
নতুন মানুষ রতন। পাছে পাঁচজনের মনে সন্দেহ জাগে, তারপর পুলিশে খবর পাবে, তাই।
"এইভাবে কি বাঁচা যায়! কপালে যা আছে তা হবেই সে তুমি লোহার সিন্ধুকে লুকিয়ে
থাকলেও কপালের ভোগ থেকে রেহাই মিলবে না হে। চলো...।" রতনকে
বারবার বুঝিয়েছে কেশব বাউল। কথাটা ভুল নয়, অন্যায়ের সাজা তো পেতেই হবে। আজ
নয়তো কাল। কাল নয়তো পরশু,
ধর্মের কল বাতাসে নড়ে উঠবেই। তবে যত দিন নিজেকে পুলিশের চোখের আড়ালে রাখা
যায় সে-কথা ভেবেই আড়ালে থাকা, জেল পুলিশে কার না ভয় থাকে। পরে পরে
কেশবের কথায় মনে সাহস ধরে অদৃষ্টের হাতে নিজের ভাগ্য ছেড়ে দিয়ে নতুন করে
উপার্জনের কথা ভেবেছে রতন। ভেদিয়ার আশেপাশের গ্রামের
হাটেবাজারে বাতবেদনার উপশমী কবিরাজি তেল বিক্রি করে। সে এক
অন্যরকম জীবন। সারাদিন পথে হাটেবাজারে কাটে। দিন শেষে আখড়ায় ফিরে অখণ্ড অবসর মেলে। বউ-ছেলের কথা ভিড় জমাতো রতনের মনে।
পুষ্প আর ছেলের কথা ভেবে আকুল হত। চোখের জল ফেলেছে কত। কেশব চেয়েছে রতনের গ্রামে
গিয়ে পরিবারের সকলের খবর আনতে। বাধ সেধেছে রতন নিজে। পুলিশের নজর বড় সজাগ, যদি কিছু
বিপদ হয়। রতনের পাপের খাঁড়া যদি তার বউ-ছেলের উপর পড়ে! তাই
কোনভাবেই নিজের গ্রামে যেতে দেয়নি কেশবকে। অন্য কোনভাবে যোগাযোগও করতে দেয়নি।
কেটেছে সতেরো বছর!
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment