বাতায়ন/ঝড়/ছোটোগল্প/৩য় বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩২
ঝড় | ছোটোগল্প
কেয়া নন্দী
লড়াই
"এক রাতে আব্বুর ভয়ংকর চিৎকারে ভয় পেয়ে সে দাদিকে জড়িয়ে ধরেছিল। সেই রাতটাই ছিল আম্মির শেষ রাত। সকালে ঘুম ভাঙতেই ইরফান দেখে বাড়ি ভর্তি লোক আর দুজন পুলিশ। আম্মি ঘরের শানে ঘুমোচ্ছে।"
‘যেভাবেই হোক টাকাগুলো জোগাড় করতেই হবে। এ বছর যদি পরীক্ষাটা না দিতে পারি ইচ্ছাটা মরে যাবে। বন্ধুরা সবাই বসবে আর আমি পয়সার অভাবে...’ ইস্কুল-পড়াশোনার পাশে সারাক্ষণ এই কথাই মাথায় চলতে থাকে ইরফানের।
দাওয়ায়
বসে ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ ‘ভোকাট্টা’ শব্দে সম্বিত ফেরে। কাটা ঘুড়িটার দিকে তাকিয়ে
মনে মনে ভাবে ইরফান, তার জীবনটাও ঠিক ওইরকম। কখন যে কেটে কোথায় চলে যাবে কে জানে?
‘বাপজান, খুঁট-টা খুলে উয়াদের পিছন ঘরে পাঠায় দিবা?’ ‘দিই’— ইরফান বোঝে বিকেল
হয়ে গেলে দাদিআম্মির আর শরীর চলে না। এই
বয়সে কোন ভোর থেকে সব কাজ করে।
……
মাঝে
মাঝে রেবেকা-র বড়ো
ভয় করে। ভাবে, আজ না হয় দাদা-দাদি আছে। মানুষের মরণ তো আর জানবুঝে আয়ে না। আল্লা না করুক— তাদের কিছু হয়ে
গেলে নাতিটার কী হবে? ইরফানের
দাদাজির বিছানা ছেড়ে উঠতে কষ্ট হয়। সংসার চালাবার জন্য
ছাগল দু’টা পালার বড়ো খাটনি। ছেলেটা তো সব শেষ করে দিলো— নাতিটার মুখ চেয়ে
কষ্ট করতে হয়।
ছুটিছাটা থাকলে এদিক-সেদিক ফাইফরমাশ
খেটে ইরফান পয়সা জমাতে শুরু করে সেই ক্লাস নাইন থেকে। যাতে মাদ্রাসা বোর্ডের
‘আলিম’ পরীক্ষায় বসতে পারে। পরীক্ষার আগে স্যারেরা দেখেন, স্কুলের পুরো বেতন দেওয়া আছে
কিনা।
……
খুব ভালো আসে না তবুও ছোটোবেলার কিছু স্মৃতি বড্ড দগদগে হয়ে আছে ইরফানের। প্রায়শই বেশ গভীর রাতে আব্বুর চিৎকার আর আম্মির কান্না। একটু বড়ো হতেই দাদিআম্মি তাকে নিজের ঘরে রাতে ঘুম পাড়াত। সকালে আব্বু দোকানে চলে গেলে সে
আম্মীর কাছে যেত। সেই সময়েই দেখত আম্মির হাতে-গলায় কালো
কালো দাগ। বুঝত না তখন। যদিও এখন সব পরিষ্কার।
এক রাতে আব্বুর ভয়ংকর চিৎকারে ভয়
পেয়ে সে দাদিকে
জড়িয়ে ধরেছিল। সেই রাতটাই ছিল আম্মির শেষ রাত। সকালে
ঘুম ভাঙতেই ইরফান দেখে বাড়ি ভর্তি লোক আর দুজন পুলিশ। আম্মি ঘরের শানে ঘুমোচ্ছে।
……
সেই সময় ফুফুর বাসায় কিছুদিন ছিল সে।
ইরফানের তখন পাঁচ-ছয় বছর হবে; বাড়ি ফিরে প্রথম আম্মির খোঁজ করেছিল। দাদি বলেছিল, আম্মির বড়ো অসুখ তাই আব্বু শহরে
কোবরেজ দেখাতে গেছে।
পাশাপাশি ঘরের বন্ধুরা যখন আব্বু-আম্মির কোলে থাকত তখন ইরফান দাদা-দাদিকে জড়িয়েই ঘুরঘুর করত। আম্মিকে না পেয়ে পেয়ে
দাদিই ইরফানের কাছে দাদিআম্মি হয়ে
গেল।
পাড়ার রহমান, মকবুল, মনিরুলরা আব্বু-আম্মির সাথে কত আহ্লাদ করে
ইস্কুলে যেত। ইরফান দাদাজির সাথে গেলেও ওই বয়সে আব্বু-আম্মির জন্য কষ্ট হতো। তাদের কথা জিজ্ঞেস করে মাঝে মাঝেই দাদা-দাদিকে বিরক্ত করত। কিন্তু কেউই ওকে পাত্তা দিত না।
……
একটু বড়ো হতে সব স্পষ্ট করে দিলো ফুফু। বলল, তোর আব্বু একটা খারাপ জায়গায় গিয়ে বদসঙ্গে
পড়েছিল। তাই নেশা করে প্রতিরাতে...।
সেদিন ‘খারাপ জায়গা’ বুঝতে না পারলেও
আজ কিছুটা বোঝে ইরফান। জমানো পয়সায় বেশ কিছুদিন সংসার চললেও একটা সময় টান পড়তে
থাকে। ধার করে দাদি
দুটো ছাগল কেনে যাতে সেখান থেকে কোনক্রমে তিনটে পেট চলে।
জেল থেকে ছাড়া পাবার পর দাদা আর
আব্বুকে ঘরে ঢুকতে দেয়নি। দাদা-দাদি-প্রতিবেশীদের আলোচনা শুনে বুঝেছিল তাদের এই পরিস্থিতির মূল কারণ
আব্বুর বদসঙ্গ। ইরফান ভাবে, বিভিন্ন
পরবে পাড়ার বন্ধুরা যখন আমোদ-আহ্লাদে ব্যস্ত তখন সে ওইদিনটা
কিছু কাজের খোঁজ করত। দাদিআম্মি ভয় পেত— সেও যদি কোন কুসঙ্গে পড়ে যায়! কিন্তু
ইস্কুলের বেতন ছাড়াও বইখাতারও তো খরচ আছে। ইরফানের মাথায় কোন এক দংশক প্রাণী
সারাক্ষণ হুল ফোটায়—
‘বোর্ড পরীক্ষাটা যে করেই হোক দিতে হবে’। পাশ করলে অফিসের গার্ড বা ট্রাফিক পুলিশ
বা অন্য কোন একটা কাজ... একটা জোটাতেই হবে। নাহলে কোন এক ‘ঝড়ে ভাঙা’ চালাঘরটা কীভাবে রক্ষা পাবে! দাদা-দাদির কী হবে!
……
স্কুলের বেতন বেশ কয়েক মাস পড়ে আছে।
কানে এসেছে পাড়া থেকে একটা ‘ছোট হাতি’ ছাড়বে কুম্ভর উদ্দেশ্যে। কম পয়সায় অনেক
লোক যাবে। ইরফান ভাবে, যদি ওখানে যাওয়া যায় কিছু না কিছু ভাবে দুটো পয়সা হাতে আসবে। ভিখারিকেও তো মানুষ পয়সা দেয়। দাদিকে রাজি করিয়ে
ইরফানও পৌঁছে যায় পুণ্যস্থানে।
কুম্ভের শাহীস্নানে আকাশ বাতাস মুখরিত।
সবাই যখন পূণ্যতোয়ায় অমৃতস্নানে ব্যস্ত চিন্তার দমকা হাওয়ায় ইরফানের মাথা
ওলট-পালট। কী করা
যায়? চোখে পড়ল ত্রিবেণীসঙ্গমে স্নান সেরে অনেকেই
নদীমাতার উদ্দেশ্যে কোন না কোন কয়েন ফেলছে। বিধ্বস্ত ইরফানের মাথায় খেলে,
সে যদি জলে থাকে কিছু কয়েন তো উদ্ধার করতে পারবে।
যেখানে ভিড়টা বেশি হচ্ছে সেখানে গিয়ে
দাঁড়ায় ইরফান। কিছুক্ষণ পরে বুঝতে পারে পকেটটা বেশ ভারী ঠেকছে। এদিকে ডুব দিতে দিতে চোখ
জ্বালা করছে, ঠান্ডায় শরীর কাঁপছে। পারছে না, তবুও অমৃতক্ষণটা নষ্ট করছে না। তার বয়সি
ছেলেমেয়েগুলো যখন আব্বু-আম্মির সাথে আসছে তখন ইরফানের
বুকের ভেতরে ‘ভেজা হাওয়া’র দাপট চলতে থাকে; লোনা জলে চোখ
ঝাপসা হয়। তবুও ভেঙে পড়লে চলবে না। দাঁত চেপে লড়াই করে
নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে।
আর কোন এক আম্ফানে ভেঙে পড়া সংসারটাকে নতুন
করে সে সাজাবে।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment