বাতায়ন/ঝড়/ছোটোগল্প/৩য়
বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ,
১৪৩২
ঝড় | ছোটোগল্প
মাখনলাল
প্রধান
চলবার
পথ
"সকলেই গ্ৰাস করতে চায়। তাদের সঙ্গে তোমাকেও চায় যে। নিজেকে উপরে নিয়ে যাওয়ার এটাই একমাত্র পথ। মজুরি হল অলৌকিক জায়গায় পৌ়ঁছে দেবার টোপ।"
এক মাইল লম্বা একটা সামিয়ানা টাঙানো। খরতাপ ঘন হয়েও সেখানে দাঁত ফোটাবার সুযোগ পাচ্ছে না। কী যেন সব বিরাট মার্কা আয়োজন। জনবহুল দেশে জমায়েতে কার্পণ্য থাকতে নেই। চল না ওখানে, কথার পসরা সাজিয়ে অনেকেই আসবে। আলো আর পথ নিয়ে অনেকরকম নকশা তৈরির যুক্তিজাল বিছানো হবে।
বললাম,
-যাওয়াটা একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার।
-মোটেই ব্যক্তিগত
নয়, বরং গোষ্ঠীগত। সংঘবদ্ধতাই
জীবন। সেখানে ভাবনার কত কারিগরি!
বললাম,
-ভাবতে যে জানে না, ওটা তাদের জন্য।
-না না দাদা, দাদা গো ওটা তো সবার
জন্য, আমরা সবাই ধন্য হয়ে যাব।
-আহা, আমাকে আমার মতো ভাবতে
দাও না।
চলে গেল ওরা। পৃথিবীর সমস্ত
পথের দরজা জানলা খোলা। আসছেও কাতারে কাতারে। শিশুদেরও এর মধ্যে কেন? মানুষ যেমন বোঝে। ভেতরে অন্যরকম আলো, অন্যরকম কথা, অন্য অন্য সব।
মানুষের চেহারা, শব্দ ব্যবহার, বাক্যগঠন সব অন্যরকম। আলোতে আলোতে আলোচনা।
আলোর মধ্যেও আলোর অভাব, কালোর সনির্বন্ধ অবস্থান। বক্তা বলতে ওঠেন, তাঁর মুখে, শরীরে বিশেষ আলো ফেলা
হয়েছে। তিনি প্রথমেই মুগ্ধতার মন্ত্রে মঃনসংযোগ সৃষ্টি করেন। মোলায়েম কণ্ঠে শুরু
করলেন- আমি মানুষকে গুপ্তধন পাওয়ার গোপন পথ দেখাতে পারি। সুন্দর পথ, শুভ্র আলো আর নিরাপদ। খুব সোজা সেসব পাওয়া। তবে ইচ্ছা থাকা
চাই, জেদ হতে হবে খাঁটি। কেউ আজও
ফিরে যায়নি।
বড়ো একটা
হাততালি এক দমকা কাজ শেষ করল। দ্বিতীয় ব্যক্তি উঠে বললেন- গর্ব করে বলছি না, জগতে আমিই একমাত্র ব্যক্তি সেই পথের সন্ধান দিতে পারি।
যাওয়ার পথে অনেক মজার, অনেক আনন্দের বিষয়, মণি-মাণিক্য দেখতে পাবে। এবং তখন জানবে সে পথ চলার কী গৌরব, কী অমোঘ আকর্ষণ!
তার পরের জন উঠেই বলে বসলেন, তিনি সবার থেকে আলাদা একটা নতুন পদ্ধতি বাতলে দেবেন। সেটা
যারা রপ্ত করবেন তারা বহুদূর যেতে পারবেন। একমাত্র তারাই পারেন যারা সাধনালব্ধ
শক্তিতে বিশ্বাসী। তিনি এসব তাঁর সিদ্ধপুরুষ বাবার থেকে লাভ করেছেন।
এভাবে চতুর্থ ব্যক্তি বললেন-
কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। আমি বলছি, আমরা নিজেরা ইচ্ছে
করলে অনেক শক্তি তৈরি করতে পারি। এবং সেটাই এখন জগতের চালিকাশক্তি।
মঞ্চে তাঁরা নিজের নিজের
শক্তি আর ক্ষমতা নিয়ে গভীর গভীরতর কথা বলতে বলতে একে অন্যের কথাকে ছাড়িয়ে যেতে
চাইছেন। তাঁরা বেশ নতুন নতুন ভাবনা আর যুক্তির অবতারণা করেছেন। দর্শকদের মধ্যে তখন
বেশ কবিগান জমে উঠেছে। তারা পরস্পরকে যুক্তির প্যাঁচে অবগাহন করাতে মেতে উঠেছে।
তারা দলে দলে ভিন্ন পথ পরিক্রমায়।
আমি পথের উপর বসে রোদ
পোহাচ্ছিলাম। তারা একদল আমার কাছে এসে বলল- তোমার এখানে কী সুন্দর হাওয়া! আহা, প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে গো।
বললাম,
-তুমি যেখানে বসেছিলে, সেখানে এক সময় ধান চাষ হত। গম, সবজি-তরিতরকারি কম ফলেনি। মানুষের বাড়িও ছিল এককালে।
বৃষ্টির জলে ফুল হত। তোমরা তো সব মাড়িয়ে মাড়িয়ে চলেছ।
তারা বলল,
-আমাদের তাহলে চলবার পথ কোথায়?
বললাম,
-নিজের নিজের পথে চলবে, সেটা অনাড়ম্বর এবং সহজ। কিন্তু কঠিন হল নিজেদের দিকে মুখ
করে হাঁটা।
জানতে চাইল,
-কেন?
সকলেই গ্ৰাস করতে চায়। তাদের
সঙ্গে তোমাকেও চায় যে। নিজেকে উপরে নিয়ে যাওয়ার এটাই একমাত্র পথ। মজুরি হল অলৌকিক জায়গায় পৌ়ঁছে দেবার টোপ।
তারা কপালে চিন্তার ভাঁজ নিয়ে
বলল,
-তোমার কথাগুলো ভাববার মতো।
মনে হয়, নিজেকে খুঁজে দেখা সত্যিই খুব
প্রয়োজন।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment