বাতায়ন/ঝড়/ছোটোগল্প/৩য় বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা
বৈশাখ, ১৪৩২
ঝড় | ছোটোগল্প
পারমিতা
চ্যাটার্জি
সত্যের
জয়
"সেই মেয়েটিও বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের ব্রিলিয়ান্ট মেয়ে ছিল। আইটি সেক্টরে কর্মরতা যাদবপুর থেকে পাশ করা ইঞ্জিনিয়ার। একটু রাত হয়ে গিয়েছিল ফিরতে, মেয়েটিকে টেনেহিঁচড়ে নির্মম ভাবে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়।"
আজ কোর্টে
রায় বার হবার দিন, জয়
নিশ্চিত জেনেও, আজ
কেমন যেন তার অন্তরটা কেঁপে উঠছে বুঝতে পারছেন না বিখ্যাত আইনজীবী অমিতাভ রায়। যথারীতি
বের হবার সময় তাঁর সততার প্রতীক স্ত্রী তাকে বললেন,
-সত্যের জয় হোক, বিচার পাক এক নিরীহ মেয়ের হতভাগ্য বাবা-মা।
অমিতাভবাবু
জানেন অনেক টাকার বিনিময়ে অসত্যের হয়েই তিনি লড়াই করছেন। সওয়ালজবাব শেষ হয়ে গেছে, রায় বের হবে আজই। এমনভাবে কেসটা সাজিয়েছেন যে বিপক্ষের উকিল কোন কূলকিনারা
পাচ্ছিলেন না। তবুও আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, বলেছিলেন
এখনও আমি জোর গলায় বলতে পারি, সত্যের জয় হবেই, ভগবানের আইনও আছে সেখান থেকে কেউ ছার
পায় না। গাড়িতে উঠতে যাচ্ছেন, তখন তার একমাত্র অতি আদরের মেয়ে সোনাই এসে বলল,
-বাপি আমাকে
একটু কলেজে নামিয়ে দেবে?
সস্নেহে
তিনি মেয়ের গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
-হ্যাঁ মা
নিশ্চয়ই।
মেয়েকে
নামিয়ে দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ তার মনে হল, সেদিনের
বিপক্ষের উকিলদের কথা,
এখানে বিচার না হলেও,
ভগবানের আইনে কেউ পার পায় না। মুখের সামনে ভেসে উঠল সোনাইয়ের টুলটুলে নিষ্পাপ
মুখের মুখচ্ছবি। সেই মেয়েটিও বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের
ব্রিলিয়ান্ট মেয়ে ছিল। আইটি সেক্টরে কর্মরতা যাদবপুর
থেকে পাশ করা ইঞ্জিনিয়ার। একটু রাত হয়ে গিয়েছিল ফিরতে, মেয়েটিকে
টেনেহিঁচড়ে নির্মম ভাবে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়।
আবারও
সোনাইয়ের মুখটা ভেসে উঠল,
কী করবেন টাকা নিয়ে যদি সোনাইয়ের কিছু হয়ে যায়, তার পাপের
প্রায়শ্চিত্ত যদি তার মেয়েকে দিতে হয়! কোর্ট চত্বরে পৌঁছে দেখলেন, তার
মক্কেলরা সব দাঁড়িয়ে আছে,
তাকে দেখেই সব এগিয়ে এলো,
-সব কিছু ঠিক আছে তো
স্যার? আমরাই
জিতছি তো?
তিনি
কোর্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে তাদের হাতে টাকার বান্ডিল দিয়ে বললেন,
-না আমি খবর
পেয়েছি সব বেঠিক হয়ে গেছে। কিছুই ঠিক নেই।
রায় বের হবার আগে তিনি জজসাহেবকে ফোন করে বললেন,
-এতদিন আমি
টাকার বিনিময়ে নির্দোষ একটি ছেলেকে ফাঁসাতে যাচ্ছিলাম, আসল অপরাধীর
নাম তুষার দেব, হ্যাঁ
স্যার শহরের ওপর তলায় এদের ঘোরাফেরা, টাকা দিয়ে মিথ্যেকে সত্য প্রমাণ করাই
এদের কাজ, আর
এদের সাহায্য করি আমরা,
হ্যাঁ আমাদের মতন পাপীরা। আজ জীবনে প্রথমবার হয়তো হেরে যাবো কিন্তু মানবিকতার দিক থেকে আজই হবে আমার আসল জয়, হ্যাঁ সত্যের জয়।
বাড়িতে
ফিরলেন বড়ো এক হাঁড়ি মিষ্টি নিয়ে, স্ত্রী অনুপ্রভার হাতে মিষ্টির হাঁড়ি তুলে দিয়ে বললেন,
-আজ আমি
পেরেছি অনু, লোভকে
জয় করে সত্যকে জিতিয়ে দিতে,
আজই হল আমার সত্যিকারের জয়, আর এতদিন শুধু টাকাকে জয় করেছি মানবিকতা সততাকে মেরে ফেলে, আমি ভাবতাম
আমি জয়ী হয়েছি কিন্তু আসলে আমি দিনের পর দিন শুধু হেরেই গেছি আর হত্যা করেছি নিজের
সমস্ত মানবিক সত্তাকে,
আজ বড়ো শান্তি লাগছে অনু, বিশ্বাস করো খুব শান্তি পাচ্ছি, কোর্টে
পরাজিত হলেও নিজের বিবেকের কাছে জয়ী হয়েছি। তুমি খুশি হওনি অনু?
-হ্যাঁ
এতদিনে আমি সত্যি খুব খুশি হয়েছি, এতদিনে জীবনের সত্যের যথার্থ পথটা তুমি খুঁজে পেলে।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment