বাতায়ন/ঝড়/ছোটোগল্প/৩য় বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা
বৈশাখ, ১৪৩২
ঝড় | ছোটোগল্প
কেয়া নন্দী
সারপ্রাইজ
"কষ্টে তনয়ার চোখ জল ভরে আসছিল। শাশুড়ি নয়, শাশুড়ি— সিদ্ধার্থর ব্যবহারটা আজ বড্ড অচেনা লাগছে তনয়ার। ভালো করে কোন কথাই বলছে না। রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব কথা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ শাশুড়ি বলে"
অফিস থেকে
বাড়ি ফিরেই, তনয়ার
চক্ষুচড়ক গাছ— কী হলো? মা-ছেলে দুজনেই রান্না ঘরে! সামনে
গিয়ে দেখে সিদ্ধার্থ মাংস কষছে আর শাশুড়ি ময়দা মাখছে। ওদিকে
আলুর দম, পোলাও-পায়েস
সব ইতিমধ্যে শেষ। বা-আ-বা আজ বাড়িতে কী হবে যে এত রান্না? এসব ভাবতে
ভাবতেই সিদ্ধার্থকে জিজ্ঞেস করে,
-অফিস যাওনি?
তনয়ার কথায় সিদ্ধার্থর একটা আলগোছে জবাব-
-না, ইচ্ছে
করছিল না।
-কেন,
শরীর খারাপ?
সিদ্ধার্থ
উত্তর দিল না দেখে শাশুড়িকে তনয়া বলে,
-মামণি রাখো-না, আমি
এসে করছি।
সঙ্গে সঙ্গে
শাশুড়ি বলে ওঠে,
-না-না, তুমি অফিসে তো কত কাজ করেছ… ঘরে গিয়ে বরং একটু রেস্ট নাও।
মা-ছেলে যেন
কেমন একটা ব্যবহার করছে তনয়ার সাথে। অথচ আজই সে ভেবেছিল, প্রতিবারের
মতো এবারও সিদ্ধার্থ জড়িয়ে ধরে…। এত বছরেও ভুল হয়নি; অথচ এই
ছমাসেই ও বদলে গেল— মনের মধ্যে এসবের কচকচানিতেই মায়ের
কথাগুলো মনে আসে তনয়ার। পইপই করে মা
বলেছিল, তনু
একটু ভেবে বিয়ের সিদ্ধান্ত নে।
হাতমুখ
ধুয়ে রান্নাঘরে ঢুকে তনয়া সিদ্ধার্থকে বলে,
-দাও-না, আমি
করছি।
সজোরে
সিদ্ধার্থ,
-আজ আমি করব।
তবুও তনয়া
বলে,
-তুমি পারবে
না… অভ্যাস নেই…।
-ছেড়ে দাও,
মাংসটা আজ বাবু-ই করুক।
তনয়া মনে
মনে বলে, এই তো
তথাকথিত মা আর তার বাবু-র সম্পর্ক ফুটে উঠেছে। এরপর
তনয়া শাশুড়িকে বলে,
-তাহলে তুমি
ওঠো, কচুরিটা
আমি করি।
-না, যদি
ফেটে যায়… তুমি অন্যদিন কোরো।
-ধুর,
ভাল্লাগছে না, এর থেকে
মায়ের কাছে গেলেই ভালো হতো—
কষ্টে তনয়ার
চোখ জল ভরে আসছিল। শাশুড়ি নয়, শাশুড়ি—
সিদ্ধার্থর ব্যবহারটা আজ বড্ড অচেনা লাগছে তনয়ার। ভালো করে কোন কথাই বলছে না। রান্নাঘরের
সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব কথা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ শাশুড়ি বলে ওঠে,
-তনয়া, রান্নাটা
শেষ হলে আমরা একটু মীরা কাকিমার বাড়ি যাব। তুমি শাড়ি পরে একটু সেজেগুজে
তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও। হ্যাঁ, অন্য কিছু নয়, শাড়িই পরবে।
নিজের ঘরে
ঢোকার মুখে শ্বশুরমশাইয়ের মুখোমুখি হতে উনি একটু মুখ টিপে হেসে ঘরে চলে গেলেন। বা-আ-বা শেষ
পর্যন্ত উনিও… টলটলে চোখেই কোনরকমে তনয়া রেডি হলো। ইশ্, পুরো দিনটাই
মাঠে মারা গেল… এরকম জানলে অফিস ছুটি নিয়ে সকালবেলা মায়ের কাছে চলে গেলেই হতো।
বিয়ে উপলক্ষ্যে এ বছর অনেক ছুটি নিয়েছে, তাই আজ বিবেকে বাধে… মাথায় এসব চলতে
চলতেই শাড়ি পরে ঘর থেকে বেরিয়ে দালানে এসে তনয়া দেখে, খাবার
টেবিলের সামনে শ্বশুর-শাশুড়ি-সিদ্ধার্থ তিনজনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে।
তনয়া থমকে
গেলে শাশুড়ি বলে,
-এদিকে এসে
বসো।
সামনে গিয়ে
দেখে থালায় কড়াইশুঁটির কচুরি, আলুর দম, পোলাও, মাংস, পায়েস। এক চামচ
পায়েস তনয়ার মুখে দিয়ে শাশুড়ি বলে,
-শুভ জন্মদিন…
অনেক আদর… অনেক ভালোবাসা।
প্রদীপের
তাপ মাথায় দিয়ে বলে,
-আশীর্বাদ
করি সুস্থ থাকো, আনন্দে
কাটুক তোদের জীবন।
-মামণি…
বলে
শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরে তনয়ার কান্না।
-না… একদম কান্না নয়, আর মামণি নয়, আজ থেকে
শুধু মা। আর তুই আমার মেয়ে। রান্না
করছিলাম যখন তোর খুব কষ্ট হচ্ছিল কিন্তু কী করব বল আজকের দিনে
তুই হাত পোড়াবি! আর বাবুর একটু শেখা দরকার। সারা জীবন ও বসে থাকবে
আর তুই ঘরে-বাইরে দুই সামলাবি। তোর শ্বশুর
আমায় কোনদিনই একটু সাহায্য করেনি। আমি খুব কষ্ট পেতাম। তাই চাইছিলাম আমার মেয়েটার
যেন কোন কষ্ট না হয়। এবার একটু হাসিমুখ কর। আর হ্যাঁ, একটু পরে
তোর জন্মদাত্রীও আসবে।
-কেমন
সারপ্রাইজ দিলাম? সিদ্ধার্থর
কথায় তনয়া হেসে ফেলে।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment