বাতায়ন/ঝড়/ছোটোগল্প/৩য় বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা
বৈশাখ, ১৪৩২
ঝড় | ছোটোগল্প
ডরোথী
ভট্টাচার্য
আমি
কবি
"আমি যে কবি, আমি যে শিল্পী, আমার তো মৃত্যু নেই। ওই ভোরের আকাশে, নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে, পাখিদের কলতানে, অরণ্যের সবুজে আমি বেঁচে আছি, বেঁচে থাকব।"
রাত বারোটা। সারাদিন বাদে কবিতার খাতাটা বিছানার মধ্যে নিয়ে এই সময়েই বসে অপর্ণা। শব্দের পর শব্দ সাজায়, ছন্দের পিঠে ছন্দ। বাঁ পাশে ছোট্ট কোলবালিশটা জড়িয়ে দু বছরের ছোট্ট খোকা, ডান পাশে স্বামী।
অপর্ণা মধ্যবিত্তের মেয়ে, যখন বিয়ে হয়েছিল তখন অনুপমের ভালো চাকরি ছিল।একমাথা
কোঁকড়া চুল, ঝকঝকে স্মার্ট যুবক। বিয়ের
দু বছরের মধ্যে ছেলে কোলে আসতে না আসতেই অত বড়ো কারখানায় লক আউট হয়ে গেল। বৃদ্ধ মা-বাবা, ছেলে বউ সবাইকে নিয়ে
সংসার মুখ থুবড়ে পড়ল। তাই তখন থেকে কোনদিন কাগজ দেওয়ার কাজ, কোনদিন রংয়ের কাজ,
কোনদিন
ইলেকট্রিকের কাজ সবরকম কাজ মিলিয়ে মিশিয়ে অনুপমের করতে হয়।
কঠিন বাস্তবের মধ্যে অপর্ণার
কবিতা লেখার নেশাকে সে কোনদিনই খুশি মনে নেয়নি। অপর্ণার রক্তে রয়েছে ঠাকুরদাদার
কবিতা লেখার, গান বাঁধার নেশা। এ নেশা তাকে
প্রতি মুহূর্তে তাড়া করে বেড়ায়। শাশুড়ির ফরমাসি সুক্ত রাঁধতে গিয়ে
কখনও নুন দিতে ভুলে যায়, ভুলে যায়
শ্বশুরমশাইয়ের পানে চুন দিতে। এগুলো তার নিত্যনৈমিত্তিক ভুল। প্রাত্যহিক সাংসারিক জীবনে
এ ভুলের কোন ক্ষমা নেই। তবুও দিনান্তে ওই কবিতার খাতা, যেখানে তার মন ডানা মেলতে পারে, ওখানেই সে শান্তি খুঁজে পায়।
একদিন অনুপম সবে কাজ থেকে
ফিরেছে, আগের রাত্রে লেখা একটা কবিতা
ওর চোখের সামনে এনে অপর্ণা বলে ওঠে,
"দেখ
তো, এই কবিতাটা কেমন হয়েছে?" মুহূর্তের মধ্যে অনুপম উত্তেজিত হয়ে
উঠল। টান মেরে অপর্ণার হাত থেকে কেড়ে নিল কবিতার খাতাটা। কুচি কুচি করে ছিঁড়ে
পাতাগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দিল গনগনে উনুনের আঁচের ভিতর। অপর্ণা চিৎকার করে উঠল। মুহূর্তের
মধ্যে চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল ওর কৈশোর-যৌবনের সমস্ত
অনুভূতির আঁচর কাটা খাতাখানা। ধপাস করে অপর্ণা বসে পড়ল
মাটির উপরে। মনে হল ওর দেহে প্রাণ নেই। ও যেন 'শব' হয়ে গেছে।
এই শব বইতে আসে না কোন শববাহকের
দল। তিলে তিলে নিজের প্রাণহীন দেহের ভার নিজেকে বইতে হয়। খোকা মা মা বলে হামা
দিতে দিতে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। ওকে দুহাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নেয় অপর্ণা। ওই ওর
বাঁচার একমাত্র অবলম্বন, ওর রক্ত মাংসে গড়া
কবিতা। আবার উঠতে হবে, বাসন মাজতে হবে, গ্যাস জ্বালাবার পয়সা নেই তাই উনুন ধরাতে হবে, শ্বশুর-শাশুড়ি-স্বামীকে খেতে
দিতে হবে, রাতের বিছানা পাততে
হবে, ওই মানুষটার পাশে শুতে হবে।
রাতে সবাই শুয়ে পড়ার পর জানালা
দিয়ে আকাশের দিকে তাকায় অপর্ণা। আকাশে গুটিকতক তারা দেখা যাচ্ছে। ওর চোখ
খুঁজে বেড়ায় স্বাতী নক্ষত্রকে, ওরই মতো জ্বলবার
ইচ্ছা কিন্তু অস্পষ্ট, ম্লান। না, কিছুতেই ঘুম আসছে না অপর্ণার। বুকের ভিতরে এক তীব্র যন্ত্রণায়
সারারাত ছটফট করে সে। খোকাকে বুকে জড়িয়ে আস্তে আস্তে ভোর রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়ল
সে।
সকাল হলো, জানলা দিয়ে সকালবেলার রোদ্দুর এসে পড়ল ওর চোখে মুখে। ধরফর
করে উঠে বসল বিছানার উপরে। পুবের আকাশটা কী সুন্দর দেখাচ্ছে! সারা
আকাশ জুড়ে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। বাগানের দোলনচাঁপা গাছের
ফুলগুলো কেমন বাতাসে গলাগলি করে দুলছে, কী সুন্দর তার গন্ধ!
আবার ছন্দ আসছে, মনে মনে সে ভাবল— আমি যে কবি, আমি যে শিল্পী,
আমার তো
মৃত্যু নেই। ওই ভোরের আকাশে, নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে, পাখিদের কলতানে,
অরণ্যের
সবুজে আমি বেঁচে আছি, বেঁচে থাকব।
সমাপ্ত

ভালো হয়েছে গল্প। গল্পের শুরু, বিস্তার ও শেষ পরিমিত আয়োজনে সার্থক হয়েছে।
ReplyDeleteসকালে গল্পটা পড়ে মনটা ফরফুরে হয়ে গেল। এরকম লেখা আরো চাই।
ReplyDelete