ধারাবাহিক
গল্প
শাশ্বত বোস
খেজুর
সন্ন্যাসী
[২য় পর্ব]
"গাজনের দলটা বারোমাস্যা কোজাগরী চাঁদটাকে বুকে করে, একটা মুণ্ডহীন শবশরীরকে নিয়ে সমানে নেচে চলেছে। আর ওদের মাথায় শুয়ে মহাদেব দুলছেন তামাম পৃথিবীর দোলাচলের ঠিক বিপরীতে।"
পূর্বানুবৃত্তি নয়ানপোঁতার
চড়কের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। এখানকার চড়কে সন্ন্যাসীদের সকলেই প্রায় মুসলিম।
গাজীপীরের দরগা যেখানে এই চড়ক ভাঙা উৎসব হয়, সেটা আসলে গাজী মৈনুদ্দিনের কবর। তবু এই চড়কের দিনে হিন্দু মুসলিম মিলে মিশে
এক হয়ে যায়। গৃহারম্ভ, গৃহপ্রবেশ, অন্নপ্রাশন, ব্যবসা-বাণিজ্যের
শুভারম্ভ, বিদেশযাত্রা এমনকি স্বদেশ
প্রত্যাগমনের শুভ মুহূর্তে গাজীপীরকে শিরনি দেওয়া হয়। তারপর…
ওদিকে তখন তাণ্ডব নাচন
চলছে! মহাদেবের চেলা ভূতেদের সাজে সারাশরীর দুলিয়ে ভয়ংকর সব
অঙ্গভঙ্গি করে নাচ শুরু করেছে কিছু সন্ন্যাসী। এরই মধ্যে একজন বালাজোড়া খেজুর
গাছের মধ্যে চিহ্নিত গাছটির এবড়োখেবড়ো শরীরের আঁশ ছাড়িয়ে, তার ঋজু কাণ্ডটিকে নগ্ন করছে ক্রমশ। তারপর সেখানে দুধ
ঘি মধু গঙ্গাজল মাখানো চলবে বেশ কিছুক্ষণ।
দলের মেয়ে বৌয়েরা অপেক্ষা করছে হাতে ডাব
দুধ গঙ্গাজল নিয়ে। ফল ভাঙা গাছটাকে পুজো করে লালচি বাঁধা হবে লাল সুতো দিয়ে। তারপর
সব সন্ন্যাসীরা গাছটাকে গোল হয়ে ঘিরে বসে কিছুক্ষণ মহাদেবের
নাম-গান করবে আর সমানে মাটিতে মাথা কুটবে, নাক ঘষবে। এই মাটি এখন রিক্ত-শুষ্ক-রুক্ষ্ম! আল্লাহতালা মেহেরবানী করলে, মহাদেবের কৃপা বর্ষিত হলে এই মাটির উদাস বুকে ফের আর্দ্রতা
ফিরে আসবে। জলের অতলে ডুব দিয়ে এ মাটি নরম হবে। প্রতি বছর এইরকম একটা খেজুর গাছেই
ফুটে ওঠে বিশেষ লক্ষণ। প্রধান সন্ন্যাসী ঝাঁপের ঠিক আগেরদিন রাতে স্বপ্নাদেশ পান। আজ
এই গাছ থেকেই ঝাঁপ হবে। মাথায় করে দেল নিয়ে এসে গাছের শরীরে স্পর্শ করিয়ে বিড়বিড়
করে মন্ত্র পড়তে থাকেন মূল সন্ন্যাসী। এবার ঘোর লাগবে তাঁর। মুখের কাছে কান নিয়ে
গেলে শোনা যাবে গ্রামের বিভিন্ন ঘরের সব না জানা গোপন কথা। মোহাব্বুল আজ এই ঝাঁপসন্ন্যাসীদের
মধ্যে অন্যতম একজন। আরো চারজনের সাথে সেও উঠে পড়বে খেজুর গাছের গা বেয়ে, কাঁটার কামড়কে উপেক্ষা করে। ঝাঁপ শেষে অপরিপক্ক খেজুরফল এনে
মাটিতে না ছুঁইয়ে ওরা এনে দেবে সেইসব মায়েদের যাঁরা সন্তান অভীষ্টে চাতক সাজেন বছর
বছর ধরে, যেসব বৌয়ের সংসারে নিত্য অনটন
লেগেই থাকে। পীড়িতের কষ্ট লাঘবের নিমিত্তেই তো এই সাধনভজন। গতকাল রাতেই হাজরা
চালানের সময় গুরু ওর কানে দিয়েছেন দেহ বশীকরণের মন্ত্র,
“কালী কালী বিকটে কালী।
আয়কালী জয়কালী ক্ষয়কালী।।
শ্মশানকালী মশানকালী।
অন্ধকালী নৃত্যকালী।।
জরাকালী ভদ্রকালী।
নেংটাকালী ঘুঁটেকালী।।
দশদিকে দশকালী।
কামাখ্যা ভুবনের কালী।।
আয় কয়জন শ্মশানেতে যাই।
মড়ার মাংস চিবিয়ে খাই।।
খড়্গহস্ত রুধীধারা মুণ্ডুমালা গলে।
মুকুট ঠেকেছে মা তোর গগনমণ্ডলে।।
শত শত মুণ্ড কেটে তুমি যাও ঘর।
শত শত মুণ্ড কেটে আমায় দাও বর।।
আমার এই বালা ভক্ত ছেড়ে।
যদি অন্য দিকে যাস।।
দোহাই লাগে নেড়াকালী।
চণ্ডী কালভৈরবের মাথা খাস।।”
তারপর হাতে উদ্ধত খড়্গ নিয়ে
ঢাকের তালে তালে চলেছে উদ্দাম নৃত্য। মোহাব্বুলের পাশবদ্ধ শরীরে তখন খেলা করে
গিয়েছে এক নিয়ন্ত্রণহীন তামসিক উদ্বেলতা। এই মন্ত্র শরীরে প্রবেশ করলে আর কোন সার
থাকে না। মহাদেবের কোলে সেঁধিয়ে যাওয়া যায় অনায়াসে। নিজের শরীর, রক্ত-চামড়া-মাংস জুড়ে লেখা হয়ে যায় ভোলানাথের চরণে
সমর্পিত ‘সেবা’। অবশেষে সময় আসবে,
ফিরোজা
রঙের আকাশটা ছিঁড়ে পরওয়ারদিগার-এর ওয়াস্তে বেদ ও বিধির নীলাভ সংগীত ভেসে
আসবে, নিঃসীম দিগন্তে ফুটে উঠবে
পড়ন্ত সূর্যের রং।
গুরুর আদেশ পেয়ে বালার পা
ছুঁয়ে ওরা একে একে গাছটার গা বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে। মগডালের আগের দিকে পৌঁছে একে
অন্যের পিঠে বাঁধা বেতের দড়ি ধরে টান দেয়। ওপরের দিকের পাতাগুলোকে জড়ো করে জড়িয়ে বেঁধে
ফেলে। গাছটাকে এবারে দেখতে লাগে ঠিক জটাধারী মহেশ্বরের মতো!
সেই জটার চারপাশে ওরা সাড়েসাতপাক ঘোরে নটরাজের নৃত্যের ছন্দে। এইবার মাথা নীচে পা
ওপরে করে সটান দাঁড়িয়ে পরে মোহাব্বুল! দুটো চোখ তার বন্ধ। এখন ইষ্ট জপের সময়।
আলোকিত উদ্ভাসে মধুকর ডিঙায় ভেসে মহাদেব কিংবা গাজীপীরের
নির্দেশ পাবার অপেক্ষা শুধু। প্রতিবার এই সময়টায় ও মালিকের আদেশ পায়। সেই আদেশ ও
ছড়িয়ে দেয় গ্রামের জনমানসে। কয়েক পুরুষ ধরে ওরা এই খেজুরসন্ন্যাস করে আসছে। এ ওদের
মাটির ফরজ!
গাছের গোড়ার দিক থেকে ভেসে
আসা বাজনাটা এতক্ষণ তলার বাতাসে ঘূর্ণীর মতো ধাক্কা খেতে খেতে ওপরের দিকে ধীর লয়ে উঠে
আসছিল। ক্রমশ মোলায়েম হয়ে আসা আওয়াজটায় মোহাব্বুলের কান যেন সয়ে গেছিল। হঠাৎ যেন ভয়ংকর সুন্দর শব্দে গর্জে উঠল সেটা। মাথার ভিতরটা যেন গুলিয়ে উঠল ওর। মাথা
ফুঁড়ে যেন বেরিয়ে আসতে চাইল সোনালি রঙের ব্রম্ভকমল। ওর স্থির
চোখের মণিবন্ধে তখন ভেসে উঠেছে দাউদাউ আগুনের ছবি! ওর
বাপঠাকুরদার ভিটে জ্বলছে, জ্বলছে
ঘর-বাড়ি-পুকুর। এমনকি ঝাঁপের গাছটাকেও উদাসীন সে আগুন ভারসাম্যহীন লকলকে জিভ নিয়ে
তলার দিক থেকে গিলে খেতে শুরু করেছে যেন। সেই বিদ্রোহী অগ্নিশিখায় সন্ন্যাসী পুড়ছে, গাজীপীরের মাজার পুড়ছে, পুড়ছে গ্রামের ঘরে ঘরে পূজিতা গৃহলক্ষ্মী। মোহাব্বুলের চোখজোড়া আচমকাই খুলে
যায়। টাল সামলাতে না পেরে খেজুর গাছের মগডাল থেকে সজোরে নীচে পড়ে যায় ও। হইহই
করে ওঠে নিচে জড়ো হয়ে থাকা লোকগুলো। মোহাব্বুলের মুখ থেকে তখন
গলগলিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে!
নতুন ওয়াকফ বিল পাস হয়েছে
মোটে চারদিনও হয়নি। এরই মধ্যে গাছপালা মাটি আকাশ এসব জায়গা জুড়ে যেন একটা স্তব্ধ
হাওয়া, নির্দিষ্ট লাগাম হারিয়ে
বেসামাল হয়ে পড়ে উন্মাদনা আর উন্মাদ মুখের স্থূল জ্যামিতি এঁকে দিয়েছে, নয়ানপোঁতার নিশ্চুপ জংলা শরীরটা জুড়ে! যেন একটা চাপা
ক্ষোভের আগুন ফুটে উঠেছে পথে ঘাটে গোত্তা খাওয়া ঘোলাটে বাতাস বেয়ে। কেউ যেন সেই
হাওয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছে নতুন আইনে গাজী সাহেবের মাজার, মুসলিমদের কবরস্থান, মাজার লাগোয়া নামাজ
পড়ার জায়গা এইসব ওয়াকফ করা জমি, হিন্দুদের সরকার
ক্রোক করে নেবে।
“এতদিনকার মাটি, আমাদের দাদা পরদাদার জমিন, আমাদের ইবাদতের মাটি লিয়ে লেবে? যান থাকতে তা হতি দিব
নি। আমরা লড়ব! ঈমানের ফরজে আমরা লড়ব! কেয়ামতের আগে অবধি লড়ব! যান কবুল করি লড়ব!”
মসজিদের ইমাম ভরাজনসভায়
প্রকাশ্য দিবালোকে যুদ্ধের কথা ঘোষণা করেন সদর্পে! কিন্তু যুদ্ধ কার বিপক্ষে? এ লড়াই হাওয়ার সাথে লড়াই বইতো কিছু নয়! এ গ্রামের ইসলামিক
ধর্মীয় ভাবাবেগ আর রাষ্ট্রের ফরমানের মাঝের জটিল বর্গক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে খিদের
নামাবলী গায়ে জড়িয়ে, হিন্দু-মুসলিম, বাস্তুভিটে, জমি-ঈমান, পূর্বপুরুষ এসব হিসেব কষতে থাকে ডোবার ধারের ঝাঁপের সেই
নিঃসঙ্গ খেজুর গাছটা। গাজীপীরের চারচালা দরগা দাঙ্গার আগুনে মারাত্মকভাবে
ক্ষতিগ্রস্ত হয়! ঘর ঘর সেই আগুন ছড়াতে থাকে। ক্ষমতা ধর্মের পোশাক পরে সেই আগুনে ঘি
ঢালে শুধু। হিন্দু মহিলাদের সম্ভ্রমে হাত পরে এবার!
সাজানো শস্যক্ষেত অন্ধকারের
কালোর ভেতর পুড়ে মহাকরুণার মতো নির্জন শ্মশান হয়ে যায়! সেই চিতার ভস্ম মেখে যেন নতুনভাবে
শুরু হয় তাণ্ডব, চড়ক, গাজন, ঝাঁপ। ক্রমশ তা
থিতিয়ে গিয়ে শান্ত ধীর এক আলোকবর্তিকার রূপ নেয়। কোমর ভেঙে বিছানায় মিশে যাওয়া
মোহাব্বুলের শরীরটা তখন শেষবারের মতো ধুকপুকিয়ে ওঠে মাধুকরী স্বপ্নের ছন্দে।
দুচোখ বুজে একটা স্নিগ্ধ দুপুরে সে দেখতে পায় মুহম্মদ আর মহাদেব যেন এক শরীরে মিলে
মিশে অর্ধনারীশ্বর! পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া গাজীপীরের দরগার দুয়ারে পড়ে থাকা এক রাশ জমান্তরকে ছাই ভেবে ভুল করে সারা শরীরে মেখে, গাজনের দলটা বারোমাস্যা কোজাগরী চাঁদটাকে বুকে করে, একটা মুণ্ডহীন শবশরীরকে নিয়ে সমানে নেচে চলেছে। আর ওদের
মাথায় শুয়ে মহাদেব দুলছেন তামাম পৃথিবীর দোলাচলের ঠিক বিপরীতে।
“হরগৌরী প্রাণনাথ, মাথার উপরে জগন্নাথ,
এইবার
উদ্ধার করো শিব শিব শিব হে!!”
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment