বাতায়ন/ডিভোর্স/ধারাবাহিক
গল্প/৩য় বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৯ই শ্রাবণ, ১৪৩২
ডিভোর্স
| ধারাবাহিক
গল্প
ডঃ নিতাই
ভট্টাচার্য
ডিভোর্স
প্রসঙ্গে হরিলাল
[১ম পর্ব]
"এখন বিবাহবিচ্ছেদের পর সেই একই মানুষ কেমন বদলে গেছে! দিব্যি ওয়ান এইট্টি ডিগ্রি পাল্টি! এক্কেবারে ঝাড়া হাত-পা। নো টেনসন।"
ডিভোর্স মানে, "দিল কে
ভ্রমর করে পুকার..."
লেখার শুরুটা প্রথমে এইভাবেই করেছিল হরিলাল, অনেক ভাবনাচিন্তা করে। যদিও হরিলাল ভেবেই লেখে সব কিছু। বলায় একটু ভুল হয়ে গেল। সামান্য সংশোধনের প্রয়োজন আছে। শুধু ভেবে লেখে না, পড়েও লেখে হরিলাল। সোশ্যাল মিডিয়াতে চোখ রাখে সর্বক্ষণ। পড়াশোনা সেখানেই। তবে সমস্যা হলো অপরের লেখা পড়ে ভাবা, আর নিজের চোখের দেখার তফাৎ তো থাকেই। সেটা আজ পরিষ্কার হলো। ভাগ্যিস!
আগেই বলেছি হরিলাল নেটিজেন।
নেট পাড়ার সবাই রেসপেক্ট করে। সেটা অবশ্য এমনি এমনি হয়নি। রীতিমতো মেহনত করে
আগুন ঝরানো লেখা নাগাড়ে লিখে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের জায়গা পাক্কা করেছে
হরিলাল। হরিলালের লেখা সহজ সরল সুন্দর সরেস স্বাভাবিক সাবলীল সুললিত সহজবোধ্য সমাজ
বদলকারী বাস্তববাদী মানব কল্যাণকারী এবং, এবং অবশ্যই একটা
ইউনিক ফিলোসফি আছে। আর সেই কারণেই হরিলাল আজ নেটিজেন। সমাজের সবদিকে তীক্ষ্ম
দৃষ্টি। কোথাও অন্যায় অবিচার বা অধঃপতন দেখলেই গর্জে ওঠে হরিলাল, অবশ্যই ফেসবুকের পাতায়। যেমন কিছুদিন আগেই পরকীয়া নিয়ে গেল গেল রব
উঠেছিল চারিদিকে। সেই নিয়ে পড়বার মতো ধারাবাহিক লিখে বেশ
সুনাম অর্জন করেছে হরিলাল। পরকীয়া কী, কেন, কোথায়, কীভাবে আসে, থেকে যায়
কীভাবে, চলে যায় কবে, পরিণতি কী সমস্ত কিছুর দুরন্ত এনালাইসিস করেছিল। সেই
ধারাবাহিক যখন মধ্য গগনে ঝলমলরত ঠিক সেইসময় হাজার হাজার যুবকযুবতী চাকরি হারায়,
পথে নামে তারা। সামাজিক বিপর্যয়। হরিলাল বসে থাকে কী করে! নেটিজেন সে, তার একটা রেসপনসিবিলিটি রয়েছে।
কাজেই তাদের কথাও হরিলাল পরকীয়ার ধারাবাহিক কাহিনিতে নিয়ে
আসে। কাজটা সহজ ছিল না মোটেই। কোথায় পরকীয়া আর কোথায় চাকরি চলে যাওয়া! কোথায়
ঘর ছেড়ে ঘরণীকে লুকিয়ে বাইরে প্রেম শান্তি পাবার ভীষণ
প্রয়াস আর কোথায় জীবনে পার্মানেন্ট অশান্তি! একটা উত্তরমেরু তো আর একটা
দক্ষিণমেরু। হরিলাল দুটো সম্পূর্ণ পৃথক বিষয়কে এক সুতোয় গেঁথেছিল দারুণ নিপুণভাবে। ওই যে বললাম ভাবনার ইউনিকনেস। সেটা হরিলালের আছে। চাকরি
যাওয়া আর পরকীয়া দুটোই সমাজের জন্য বিপদবাহী। কাজেই সেই অ্যাঙ্গেল থেকে...। সকলে তারিফ করেছিল, লিখেছে বটে হরিলাল।
ভেবেছে বটে হরিলাল। ভাবিয়েছে সবাইকে সেই হরিলাল। এরই মধ্যে বিভিন্ন ই-ম্যাগাজিনের
সম্পাদক মশাইরা হরিলালের সঙ্গে কন্টাক্ট রেখে চলা শুরু করে যাতে হরিলালের মূল্যবান
আর্টিকেল বা স্টোরি তাদের ম্যাগাজিনে আত্মপ্রকাশ করে। হরিলাল চেষ্টা করে সাধ্যমতো। চাকরি সামলে স্ত্রীর সন্দেহের তীক্ষ্ম নজর উপেক্ষা করে লেখালিখি করে।
কদিন ধরেই সোশ্যাল মিডিয়াতে চোখে পড়ে "ডিভোর্স" নিয়ে কিছু লিখুন,
ম্যাগাজিনে লেখা চাওয়ার বিজ্ঞাপন আর কী।
তারপর এক সম্পাদক অনুরোধ করেন কিছু লিখুন হরিলালবাবু, আপনি
না লিখলে...। সেখান থেকেই "ডিভোর্স" ব্যাপারটা ভাবায় হরিলালকে। কীভাবে একটা মডার্ণ আর্টিকেল প্রডিউস করা যায়! ভাবে
আর ভাবে। একদিন অফিসে সেই নিয়ে অতনুবাবুর সঙ্গে কথা হয়। অতনুবাবুর ডিভোর্স
হয়েছে সদ্য। মানে আগের স্ত্রীর থেকে পার্মানেন্ট ছাড়পত্র পেয়েছেন রিসেন্টলি।
কয়েকমাস আগেও মুখটা কেমন দ্বিতীয়ার চাঁদের মতো বাঁকা হয়ে
থাকত সারাদিন। রসকষহীন পাথর। মুখে কথা নেই। মেজাজ সপ্তমে। পিয়োন হারুদাকে উঠতে বসতে মেজাজ নিত অতনুবাবু। এখন বিবাহবিচ্ছেদের পর সেই একই
মানুষ কেমন বদলে গেছে! দিব্যি ওয়ান এইট্টি ডিগ্রি পাল্টি!
এক্কেবারে ঝাড়া হাত-পা। নো টেনসন। নো ঝুটঝামেলা। নতুন করে
টোপর পরেছে আবার। এখন নাকি ওনলি মজা এন্ড মস্তি। চোখে খুশি।
বুকে প্রেম। মুখে গান। "দিলকে ভ্রমর করে পুকার পেয়ার কি...।" মাঝে মাঝে
হরিলালকে বলে "হরিলাল ডিভোর্সটা আমার লাইফটাকে-ই চেঞ্জ করে দিলো রে! নয়তো
মরেই যেতাম। জীবন যে সুন্দর এখন বুঝছি।" বোঝো!
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment