ধারাবাহিক
গল্প
অর্পিতা
চক্রবর্তী
উত্তরাধিকারী
[৩য় পর্ব]
"আর তুমি বৃষ্টির কথা ভেবো না। ও আমাদের সন্তান ওকে আমি বোঝাব। ও ঠিক বুঝবে। তুমি আমাকে একটু সময় দাও আমি তোমাকে এই বন্ধন থেকে চিরতরে মুক্তি দেব।"
পূর্বানুবৃত্তি আজ থেকে চৌত্রিশ বছর আগে এই বাড়ির কূলবধূর গৃহপ্রবেশ হয়েছিল প্রমিলাদেবীর।
এরপর সুভাষ আর প্রমিলার ছোট্ট সুখের সংসার আলো করে এসেছিল বৃষ্টি। তারপর দিনগত
পাপক্ষয়ের ন্যায় কেটে গেল অনেকগুলো বছর। তারপর…
সেদিন রাতে প্রচন্ড ঝড়বৃষ্টি শুরু হল। সুভাষ সমস্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগকে উপেক্ষা করে বেরোবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। প্রমিলা বাধা দিতেই সুভাষ বলল,
-যেতে হবে কাজ আছে...
এরপর প্রমিলা একটু জেদ
দেখিয়ে সুভাষকে আটকাতে সক্ষম হলেও একটা ফোন ক্রমাগত আসতে লাগল। সুভাষ চেষ্টা করেও
ফোনটিকে উপেক্ষা করতে পারছিল না। প্রমিলা ফোনটিকে কেটে সুইচ অফ করে দিয়ে বলল,
-কী হয়েছে আজ আমাকে সব খুলে বলো। কে এই মহিলা?
সুভাষ কোনো ভনিতা না করেই
শুরু করল,
-ওর নাম নয়না।
প্রায় পাঁচ বছর আগে ওর বিবাহবিচ্ছেদ হয়। বর্তমানে আমার
অফিসে জয়েন করেছে।
-ওনার কোন
সন্তানাদি নেই?
-না ও একাই
থাকে নিউটাউনের একটা ফ্ল্যাটে।
-তুমি কি আজ
রাতে ওর কাছেই যাচ্ছিলে?
-না মানে একটা
কাজ ছিল।
প্রমিলা খুব স্পষ্ট ভাষায়
বলল,
-আমাদের যা
বয়স তাতে করে মিথ্যে কথাটা আর মানায় না। তুমি কি ওই মহিলার
প্রতি কোনভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছ?
আমার
কাছে কিছু লুকিও না সবটা খুলে বলো। আমি শুনতে চাই।
সুভাষ শুরু করল,
-প্রমিলা ইউ আর রাইট। আমার নয়নাকে খুব ভাল লাগে। আমি ওকে
ছেড়ে থাকতে পারব না। তুমি আমাকে ক্ষমা করো। আমি তোমার আর বৃষ্টির সাথে কোনো
অন্যায় করতে চাইনি। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি নিরুপায়। আমার পক্ষে আর কোনো মূল্যেই
এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। আমি শুধু ভাবছি বৃষ্টির কথা। ওকে কী করে বলব সবটুকু।
প্রমিলা এতক্ষণ প্রস্তরমূর্তি
হয়ে সবটুকু শুনছিল। ওর চোখদুটো স্থির হয়ে গেছে। একফোঁটা জলের চিহ্ন নেই সেখানে।
শান্ত স্থিতধী মধ্যবয়সি প্রমিলা সুভাষের কাঁধে হাত রেখে বলল,
-অনেক দিনের সম্পর্ক আমাদের। আমি তোমাকে সেই কলেজ জীবন থেকে
চিনি। তুমি কী পারো কী পারো না আমি সবটা জানি। আমি ভাবতেও পারছি
না তুমি এমন কিছু একটা করতে পারো। তবে যা করেছ বেশ করেছ। তোমার মুখ থেকে সব সত্যি
কথাগুলো শুনে ঠিক কী মনে হচ্ছে জানো? মনে হচ্ছে মানুষ চিনতে ঠকে গেলাম। তুমি শুধু আমাকে না তোমার
মেয়েটাকেও ঠকালে। তুমি কাল সকালেই আমার বাড়ি থেকে চলে যেও। তোমার মুখ দেখতেও আমার
গা গুলিয়ে উঠছে। আমি তোমার একমাত্র সন্তানের মা প্রমিলা সেনগুপ্ত আজ তার স্বামী
সুভাষ সেনগুপ্তকে সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্তি দিচ্ছি। তোমার সাথে ঝগড়া বা কথা
কাটাকাটি করার মতো প্রবৃত্তিও আজ আর আমার নেই। আমি তোমার দায় হয়ে সারাটা জীবন
কাটাতে পারব না। আর তুমি বৃষ্টির কথা ভেবো না। ও আমাদের সন্তান ওকে আমি বোঝাব। ও
ঠিক বুঝবে। তুমি আমাকে একটু সময় দাও আমি তোমাকে এই বন্ধন থেকে চিরতরে মুক্তি দেব।
তবে আজ রাতটা আমাদের, শুধুই আমাদের। তবে এ
রাত শুধুই ঘৃণার আর বিষাদের। কাল থেকে তুমি নয়নার কাছেই থাকবে। যদিও এ বাড়ি আইনত আমার
তবে তুমি না আসলেই আমি বেশি খুশি হব। শুধু একটাই অনুরোধ আমাদের যেন আর খুব বেশি
দেখা না হয়। তবে একটা শেষ দেখা অবশ্যই হবে আর সেটা হবে কোর্টে।
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment