বাতায়ন/মাসিক/ধারাবাহিক
গল্প/৩য় বর্ষ/২০তম সংখ্যা/২০শে ভাদ্র,
১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
পারমিতা
চ্যাটার্জি
প্রতারক
[২য় পর্ব]
"তুমি তো কোনও অপরাধ করনি। ভালবেসেছিলে আমার কাছে সেটা কোনও অপরাধ নয় হ্যাঁ ভুল লোককে ভালবেসেছিলে, যে তোমাকে নিয়ে শুধু খেলা করেছে ভুলটা তার তোমার নয়।"
পূর্বানুবৃত্তি আনমনে বসে রূপা
ভাবে যৌবনের সেই আনন্দ আর খুশিতে ভরা দিনগুলির কথা কলেজ পালিয়ে সৌরভের সাথে সিনেমা, সিনেমা হলের আধো অন্ধকারে ওর স্পর্শ এখনও যেন গায়ে লেগে
আছে। তারপর…
রূপা ইউনিভারসিটিতে ভর্তি হয়ে গেল। দেখা গেল পড়শোনার চেয়ে সৌরভের সাথে সময় কাটানোটাই বেশি হয়ে যাচ্ছে। সৌরভ তার ক্লাসগুলো ঠিকই করছে কিন্তু রূপার ক্লাসের সময় সৌরভের অফ থাকলেই তাকে ডেকে নিচ্ছে। রূপা একদিন বলল সৌরভ তুমি চাকরি পেয়ে গেলেই আমি এই মিথ্যে বিয়েটা থেকে বেরিয়ে আসব আমরা বিয়ে করব। সৌরভ বলল,
-বিয়েটাই
জীবনের মূল লক্ষ্য নয় আসল হচ্ছে ভালবাসা। বিয়ে করলেই অনেক
বাঁধাধরা নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে ভালবাসাটাই হারিয়ে যাবে তার-চেয়ে এই বন্ধুত্বটাই আমরা উপভোগ করি।
এরমধ্যে সৌরভের ফাঁকা বাড়িতে তাদের বেশ
কয়েকবার শারীরিক মিলনও হয়েছে। সৌরভের উন্মাদনায় রূপা ভেসে
গেছে সব সামাজিক বাধা ভুলে। পরীক্ষার পর দেখা গেল সৌরভের ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট
হয়েছে। রূপা তাকে অভিনন্দন জানাতে গিয়ে সৌরভের পাশে তিতির
সেনকে দেখে অবাক হয়ে গেল। সৌরভ তিতিরের কাঁধে হাত দিয়ে বলল,
-তিতির এই যে
রূপা আমার খুব বন্ধু আর এই তিতির আমরা দুজনে একসাথে স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকায়
যাচ্ছি। তিতিরও খুব ভাল স্টুডেন্ট আমি তো মাঝে-মাঝে বিস্মিত হয়ে যাই ওর মেধা দেখে। ঠিক আছে চলি আজ
আবার হয়তো কোনওদিন দেখা হবে, ভাল থেক। জীবন একটাই সেখানে যেটা বেস্ট সেটাই বেছে
নিতে হয়।
রূপা কোনরকমে বলল,
-হ্যাঁ বুঝলাম
তবে একটু দেরিতে।
রূপার হাতে তখন ওর ফাস্ট ইয়ার
থেকে সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার রেজাল্ট অতি সাধারণ মানের। সে তো ঠিক করে
পড়াশোনাই করেনি। ভেসে বেরিয়েছে সৌরভের স্রোতে আজ হঠাৎ যেন
চোখের সামনে একটার পর একটা ঢেউ ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে সে তার স্বামীর সামনেই বা কী করে মুখ তুলে দাঁড়াবে? অনুতাপের আগুনে জ্বলে পুড়ে
যাচ্ছে। বাড়ি ফিরে খুবই মনমরা। শাশুড়ি
এসে বললেন,
-কী রে শুয়ে যে? শরীরটা ভাল তো?
সে হঠাৎ উঠে বসে শাশুড়িকে
জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে ফেলে বলল,
-মা আমার
রেজাল্টটা একদম ভাল হয়নি।
-ও এই কারণ ঠিক
আছে এবার হয়নি পরের বার হবে এখন ওঠো কিছু খাওয়াদাওয়া কর মুখটা তো শুকিয়ে গেছে।
রূপার মন তোলপাড় করছে এই
মানুষগুলোকে সে দিনের পর দিন প্রতারণা করে গেছে। উদয়ন আসার অপেক্ষায় থাকল, সব সত্যিটা ওকে বলতেই হবে তারপর যা হবে সে মাথা পেতে নেবে। রাতে উদয়ন
খাতা দেখতে বসেছিল, সে কাছে গিয়ে দাঁড়াল। মুখ তুলে হেসে উদয়ন বলল,
-কী খবর? রেজাল্ট ভাল হয়নি বলে মন খারাপ?
-আজ আমার
কয়েকটা কথা তোমায় বলার আছে। সব শুনে তুমি যা বলবে আমি মেনে
নেব।
উদয়ন অবাক হয়ে বলল,
-কী হল? তুমি কাঁদছ কেন?
রূপা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। উদয়নের বুকের
ওপর মাথা রেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে সমস্ত ঘটনা বলে গেল, তারপর তার অশ্রুসিক্ত চোখদুটো উদয়নের দিকে তুলে বলল,
-এবার তুমি যা
শাস্তি দেবে আমি মাথা পেতে নেব। আমি একটা প্রতারক তোমাদের
সবার সাথে প্রতারণা করে গেছি।
উদয়নে ওকে বুকের কাছে টেনে
এনে, ওর মুখটা তুলে ধরে বলল,
-ভুল তো
মানুষেরেই হয়, আমারও ভুল ছিল তুমি যে অনেকটা ছোট একটা
প্রাণচঞ্চল মেয়ে সেটা আমিও মাথায় রাখিনি। যতটা সময় তোমায়
দেওয়া উচিৎ ছিল। আমি দিতে পারিনি এবার থেকে পুরনো সব স্মৃতি ভুলে গিয়ে আমরা হাত ধরে আগামীর দিকে এগিয়ে যাব। কি পারবে না?
-তুমি আমায়
ক্ষমা করে দিলে?
-তুমি তো কোনও অপরাধ করনি। ভালবেসেছিলে আমার কাছে সেটা কোনও অপরাধ নয় হ্যাঁ ভুল লোককে ভালবেসেছিলে, যে তোমাকে
নিয়ে শুধু খেলা করেছে ভুলটা তার তোমার নয়।
-তুমি মানুষ নও
তুমি ভগবান।
-না রে পাগলি
আমি খুব খুব সাধারণ একটা মানুষ।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment