বাতায়ন/মাসিক/ধারাবাহিক
গল্প/৩য় বর্ষ/১৯তম সংখ্যা/১৩ই ভাদ্র,
১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
অরূপ কুমার
দেব
রহমতের
কেরামতি
[১ম পর্ব]
"সে আমার লগেই থাকে। তিন বছর ধইরা আছে। তার ডরে আমি রাইতে কুনুখানে যাইবার পারি না। দেখেন আশেপাশের দুকানে কাস্টমারের ভিড়, কিন্তু আমার দুকানে একখান মাছিও বয় না।"
অপেক্ষা করা বড় খারাপ জিনিস, অনেকক্ষণ বসে থেকে হাঁপিয়ে গেছে বছর ত্রিশের সঞ্জয় বড়ুয়া। কিছু খেতে পারলে ভাল হত। তাই সে চায়ের খোঁজ করে আর সামনে একটা দোকান দেখতে পায়।
চায়ের দোকানে
চায়ে চুমুক দিয়ে চমকে ওঠে। তবে তার চমকে ওঠার কারণ চায়ের উত্তাপ নয়,
চা তো
গরমই হবে। চমকে ওঠে চায়ের স্বাদে। এই হাইওয়ের ছাপড়া চায়ের দোকানের চা যে এতটা
ভাল হবে তা ছিল কল্পনার অতীত।
চায়ের কারিগরের দিকে দৃষ্টি
ফেরায় সঞ্জয়। পরনের শার্টটি পুরোনো হলেও বেশ পরিষ্কার করে কাচা। সে
ভাবে— প্রচণ্ড গরমে আমি দরদর করে
ঘামছি, অথচ এই লোক দিব্যি চুলোর পাশে
বসে চা বানাচ্ছে। চোখে-মুখে বিরক্তির কোনও ছাপ নেই। শরীরে নেই এক ফোটা ঘামের আভাস।
চমৎকার চায়ের স্বাদ নিতে-নিতে সঞ্জয়ের
মনের সকল বিরক্তি ধীরে-ধীরে কেটে যেতে থাকে। বিরক্ত হওয়ার
অবশ্য যথেষ্ট কারণ আছে। গুয়াহাটি-বরপেটা রোড হাইওয়ের পাশে এই
ছাপড়া দোকানে সে বসে আছে টানা একঘন্টা ধরে। তাকে নিতে যার আসার কথা তার কোনও পাত্তা নেই। বারবার মোবাইলে ফোন করে শুনতে পাচ্ছে, ‘আপনি কল করি থকা ব্যাক্তিজনে বর্তমান কোনও কোলর উত্তর দিয়া
নাই। অনুগ্রহ করি কিছু হময় পিছত পুনর চেষ্টা করক।’ এদিকে গরমে শরীর ভাজা-ভাজা।
সঞ্জয়ের আমেরিকা প্রবাসী
মামার শখ হয়েছে বরপেটা রোডে কিছু জমি কিনে বাগানবাড়ি বানাবেন। সেই জমি দেখতেই আসা।
কিন্তু জমির দালাল দোলোয়ারের কোনও পাত্তা নেই। অথচ কাল
রাতেও কথা হয়েছে যে এখানের বাসস্ট্যান্ডে সে সঞ্জয়ের জন্য মোটর সাইকেল নিয়ে
অপেক্ষা করবে। মোটর সাইকেল তো দূরের কথা, এই প্রখর রৌদ্রে কোনও সাইকেলেরও দেখা নেই।
কবজি উলটে ঘড়ি দেখে সঞ্জয়। আর পনেরো মিনিট, এর মধ্যে দেলোয়ার না এলে টাটা-বাইবাই। এই
জায়গায় আর থাকবে না সঞ্জয়। সময় কাটানোর জন্য সে চায়ের দোকানির
সঙ্গে আলাপ জুড়ে দেয়।
-ভাই কী এই এলাকার মানুষ?
মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় দোকানি।
-তাহলে তো আপনি দেলোয়ারকে চিনেন?
এবারও ইতিবাচক ভঙ্গিতে মাথা
নাড়ে। বোঝা গেল চা বিক্রেতা আলোচনায় আগ্রহী নয়। কিন্তু সময় তো কাটাতে হবে! তাই চা
বিক্রেতার নিরুৎসাহ উপেক্ষা করে এক তরফা আলাপ চালিয়ে যায় সঞ্জয়।
-আমাকে নিতে
তার আসার কথা, আর মোবাইলও ধরছে না।
এবার তার দিকে চোখ তুলে তাকায়
চা বিক্রেতা। তারপর বলে,
-দেলোয়ারের তো হুন্ডা একছিডেন হইছে। হেয় আইতে পারবো না।
খবরটা শুনে চমকে ওঠে সঞ্জয়। ওহহো…!
তাহলে তো বসে থেকে লাভ নেই। পরের বাস বা অটো যাই হোক, সেটাই ধরতে হবে। অটো হলে হাওলি গিয়ে বাস ধরে নিলেই হবে। আড়ামোড়া ভেঙে
উঠে দাঁড়ায় সঞ্জয়। মানিব্যাগ বের করে চায়ের দাম চুকায়। খুচরা টাকা ফেরত দিতে-দিতে চায়ের দোকানি বলে,
-ভাইজান কী গুয়াহাটিতে থাকেন?
-হ্যাঁ।
-অখনই চইলা যাইবেন?
তার প্রশ্নে একটু অবাক হয়
সঞ্জয়। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। আলটপকা এই প্রশ্নের জন্যই হয়তো একটু লজ্জিত বোধ
করে দোকানি। দাঁত বের করে একটু বিব্রত হাসি দিয়ে বলে,
-আপনের হাতে সময় থাকলে একটু বসেন।
-কেন কিছু বলতে চান আমাকে?
এবার বেশ অবাক হয় সঞ্জয়। জানা
নেই শোনা নেই এই চায়ের দোকানির কী কথা থাকতে পারে তার সঙ্গে? সেই সঙ্গে বেশ একটু কৌতুহলও বোধ করে। শোনাই যাক না কী বলতে
চায় এই অপরিচিত দোকানি! আরেক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে জুত হয়ে বসে।
-বলেন কী কথা।
বেশ উদার ভঙ্গিতে বলে
সে।
-সবার আগে
আপনার নামটা বলেন। নাম জানা না থাকলে আলাপ করে আরাম পাই না।
-আলম।
এক কথায় তার প্রশ্নের জবাব
দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে আলম। মনে-মনে কথাগুলো সাজিয়ে নেয়। কিংবা গল্পটি কোথা
থেকে শুরু করবে তা ঠিক করে নেয়। একটু পর গলা ঝেড়ে বলতে শুরু করে।
-সে আমার লগেই থাকে। তিন বছর ধইরা আছে। তার ডরে আমি রাইতে
কুনুখানে যাইবার পারি না। দেখেন আশেপাশের দুকানে কাস্টমারের ভিড়, কিন্তু আমার দুকানে একখান মাছিও বয় না। গেরামের লোকজন আমার
লগে মিশে না। আমি বাই একরকম এক ঘইরা।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment