প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Wednesday, September 10, 2025

উমা [৩য় পর্ব] | শুভব্রত ব্যানার্জী

বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/২তম সংখ্যা/১০ই আশ্বিন, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
শুভব্রত ব্যানার্জী
 
উমা
[৩য় পর্ব]

"চন্দ্রকান্তবাবুর চিৎকার শুনে সবাই প্রতিমার পেছনে গিয়ে দেখেন হাত-পা-মুখ বাঁধা অবস্থায় উমাকে প্রতিমার কাঠামোর সাথে কে বেঁধে রেখেছে।"


পূর্বানুবৃত্তি সত্যেন ঠাকুর তৈরির সময় উমার কৌতূহলের উত্তরে বলেন, শিব ঠাকুরের রাগে তাঁর হাতের ত্রিশূল যাকে পিনাক বলা হয় সেটা ছুঁড়ে গণেশ ঠাকুরের দেহ থেকে মাথাটা কেটে ফেলেন। মা দুর্গা এবং সব দেবতারা শিব ঠাকুরকে গণেশের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে বলেন। তারপর…

জমিদারগিন্নি মন্দিরাদেবী সেই যে বিকেল থেকে মা দুর্গার প্রতিমার দিকে তাকিয়ে বসে আছেন তো বসেই আছেন। একবারের জন্যেও ওঠেননি। শুধু বিড়বিড় করে কিছু বলে যাচ্ছেন। আর মাঝে মাঝে 'মা, মা গো কোন অপরাধের শাস্তি দিচ্ছিস মা! ক্ষমা কর মা। ফিরিয়ে দে মা আমার দিদিভাইকে।' বলে কাঁদছেন। চোখের জলে যে শাড়ির আঁচল ভিজে গেছে, কোন হুঁশ নেই সে দিকে। হঠাৎ সরযুবালা এসে বলেন,

-ও মা, এবার ওঠো শরীর খারাপ করবে যে। একে তো পুজো'দিন এত চাপ গেল, তার ওপর... ওঠো ওঠো মুখে-চোখে জল দিয়ে একটু চা-টা কিছু খাও।
হঠাৎ গণেশ ঠাকুরের হাত থেকে লাড্ডুটা পড়ে যেতে দেখে জমিদারগিন্নি চমকে ওঠেন। সরযুবালা দুইগালে হাত দিয়ে বলেন,
-কী সর্বনেশে কাণ্ড গো মা! গণেশ ঠাকুর তাঁর প্রিয় লাড্ডু ফেলে দিলেন, এ যে ঘোর অমঙ্গল গো মা। কী বিপদ ঘনিয়ে আসছে কে জানে!
মন্দিরাদেবী তাঁর এই মুখরা মেয়েকে খুব ভাল করেই চেনেন তাই ইশারায় তাঁকে চুপ করতে বলেন। কিন্তু চুপ থাকলে তো সরযুবালার চলবে না। তাঁকে যে তাঁর মনের কথাটা বলতেই হবে আর এটাই চরম সুযোগ মনে করে তিনি আবার বলেন,
-আমি চুপ করলেই কি সব ঠিক হবে? এই যে বাড়ির এতগুলো লোক পুরো বাড়িটা তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়ালো, পেয়েছে তাকে? বাড়িতে থাকলে তো পেয়েই যেত। ও আর আসবে না। ওর মায়া ত্যাগ করে বড়দাকে বলো আমার ব্রজকে দত্তক নিতে।
হঠাৎ মন্দিরাদেবী তাঁর দিকে ঘুরে এত এত লোকের মাঝে সজোরে এক চড় মারেন সরযুবালার গালে। সরযুবালা ছিটকে পড়ে। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই হতভম্ব হয়ে যায়। এত লোকের সামনে এই অপমান সহ্য করতে না পেরে সরযুবালা কাঁদতে কাঁদতে ছুটে বেরিয়ে যান মন্দির থেকে।
পুরোহিতমশাই জমিদারবাবুর কাছে গিয়ে বলেন,
-বাবু, এবার যে মা'কে বরণ করে বিসর্জন করতে না নিয়ে গেলেই নয়। হাতে আর একদম সময় নেই।
-যান, মা'কে নিয়ে যান। বাড়ির কার মনমেজাজ ভাল নেই। গ্রামের মেয়েদের বলুন মা'কে বরণ করতে। দিদিভাইকে যদি না খুঁজে পাওয়া যায় তবে এবছরই হয়তো আমার বাড়িতে মায়ের শেষ পুজো।
কেঁপে ওঠে মায়ের শোলার সাজ। এমন দৃশ্য দেখে অমঙ্গলের আশঙ্কায় সবাই 'জয় মা, জয় মা' বলে চিৎকার করে ওঠে। কারোর মন ভাল নেই। জমিদার বাড়ির দুঃখ যেন তাদেরও গ্রাস করেছে। গ্রামের দু-চারজন বৌ তাড়াতাড়ি মা'কে বরণ করে পান-পাতায় মুখ মুছিয়ে মিষ্টি মুখ করিয়ে বিদায় জানালেন। গ্রামের ছেলেদের সাথে জমিদার বাড়ির ছোটছেলে চন্দ্রকান্ত প্রতিমা তুলতে গিয়ে চিৎকার করে ওঠেন,
-উমা!
চন্দ্রকান্তবাবুর চিৎকার শুনে সবাই প্রতিমার পেছনে গিয়ে দেখেন হাত-পা-মুখ বাঁধা অবস্থায় উমাকে প্রতিমার কাঠামোর সাথে কে বেঁধে রেখেছে। জমিদার অতীন্দ্র মোহন চৌধুরী ছুটে গিয়ে উমার মুখের বাঁধনটা খুলে দিলে 'পিসো' বলেই উমা অজ্ঞান হয়ে যায়। বড়ছেলে সূর্যনারায়ন ভিড় সরিয়ে উমাকে কোলে নিয়ে মা দুর্গার সামনে এনে শুইয়ে দেন। হাওয়া প্রবেশের জন্যে ভিড়টা নিজে থেকেই একটু দূরে সরে যায়। জমিদারবাবু চিৎকার করেন,
-ওরে, কেউ একজন অমিয় ডাক্তারকে ডাক আর দেখিস গোবিন্দ যেন পালাতে না পারে।
চালে গণ্ডগোল হয়েছে বুঝতে পেরে গোবিন্দ ভিড়ের মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে পালাবার চেষ্টা করলে গ্রামের লোক তাকে ধরে জমিদারবাবুর কাছে নিয়ে এলে তিনি বলেন,
-এটার মুখ-হাত-পা বেঁধে গাছের সাথে বেঁধে রাখ। দিদিভাইয়ের জ্ঞান ফিরুক তারপর এর ব্যবস্থা করছি।
সরযুবালা ছুটে এসে জমিদারবাবুর পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলেন,
-বাবা, ও যে তোমার জামাই। লোভের বশবর্তী হয়ে অন্যায় করে ফেলেছি। এবারের মতো আমাদের ক্ষমা করে দাও।
-আমার মেয়ে, জামাই কেউ নেই। মা দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের সাথে সাথে তারাও যেন আমাদের জীবন থেকে বিসর্জন হয়ে যায়।
 
সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)