প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Thursday, September 11, 2025

উমা [২য় পর্ব] | শুভব্রত ব্যানার্জী

বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/২তম সংখ্যা/৩রা আশ্বিন, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
শুভব্রত ব্যানার্জী
 
উমা
[২য় পর্ব]

"মা দুর্গা গণেশ ঠাকুরকে দরজায় পাহারায় রেখে স্নান করতে ঢুকেছিলেন আর বলে দিয়েছিলেন কেউ এলে যেন দরজা না ছাড়েন। মা দুর্গা স্নানে ঢুকেছেনগণেশ ঠাকুর পাহারায় আছেন এমন সময় বাবা শিব আসেন মা দুর্গার কাছে কিন্তু গণেশ ঠাকুর জানেন না যে শিব ঠাকুর তাঁর বাবা আর শিব ঠাকুরও জানেন না যে গণেশ ঠাকুর তাঁর ছেলে।"


পূর্বানুবৃত্তি দশমীর দিন প্রতিমা বরণ করার প্রাক মুহূর্ত থেকে উমা নিখোঁজ। উমার মা, গোবিন্দনগর জমিদার বাড়ির বড়বৌ অহনা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। উমাকে সবাই নানারকম পোশাক কিনে দিয়েছে। অহনা নিজে বাজারে গিয়ে সাজের জিনিসপত্র কিনে এনেছে। সব আছে পড়ে, শুধু যে পরার সে-ই নিখোঁজ। তারপর…

হঠাৎ সরযুবালা ঘরের মধ্যে ঢুকে চিৎকার করে অহনার চারধারের ভিড়টাকে বাইরে বের করে দিয়ে সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিয়ে অহনার পাশে বসে তাঁর গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন,

-দোষ তোদেরও কম নয় বৌ। একরত্তি মেয়েটাকে খুব লাই দিয়েছিলি। দিন নেই, রাত নেই শুধু ধিং ধিং করে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে, যার তার সাথে পাকাপাকা কথা বলছে। একটু তো শাসন করবি।
অহনা কেঁদে বলেন,
-ও তো বাড়ির বাইরে কোথাও কোনদিন যায় না। ঘোরাঘুরি, খেলাধুলা সব বাড়িতেই করে। এই পুজো কটা দিনই শুধু একটু ছটফট করেছে তাছাড়া সে তো খুব শান্ত স্বভাবের মেয়ে।
-যাই বলিস আর তাই বলিস আমার ব্রজর মতো ছেলে ভূ-ভারতে আর দুটো পাবি না। কত সব জানে, কিন্তু দেখ চুপটি করে বসে থাকে। উমার মতো হলে মেরে তার ঠ্যাং ভেঙে দিতাম।
অহনা আরো জোরে কেঁদে বলে,
-তাই দেব গো দিদি, তোমরা তাকে আমার কাছে এনে দাও। দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখব তাকে।
সরযুবালা একটু অস্বস্তিতে পড়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি বলে,
-দড়ি দিয়ে আর বেঁধে রাখতে হবে না। আসবে, আসবে। আর নেহাত যদি ফিরে না আসে তবে আমার ব্রজকে আমি তোকে দিয়ে দেব।
অহনা চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন,
-এমন কথা বলো-না গো দিদি। আমার অন্য কাউকে চা না, আমার মেয়েকে আমার কাছে ফিরিয়ে এনে দাও।
সরযুবালা মনে মনে বলেএমন সুন্দর ছেলেকে দিতে চাইলাম, পছন্দ হলো না। দেখ সে আর ফিরে আসে কি না।
অহনাকে চিৎকার করে কাঁদতে দেখে মনে মনে বলেন একটা পুঁচকে মেয়ের জন্যে আদিখ্যেতা দেখলে বাঁচি না বলে মুখ বেঁকিয়ে সরযুবালা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
 
উমার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সত্যেনকেও মাঝে মাঝে হিমসিম খেতে হয়। অনেক সময় ছোটবেলায় শোনা পৌরাণিক কাহিনিগুলো ঝালিয়ে নিতে হয় নতুন করে।
-দাদু, মা দুর্গার দুই মেয়ে দুই ছেলে?
-না গো দিদিমনি, মা দুর্গার শুধু দুই ছেলে। বড়ছেলে কার্তিক ঠাকুর আর ছোটছেলে গণেশ ঠাকুর।
-ও। তবে লক্ষ্মী ঠাকুর আর সরস্বতী ঠাকুর!
-মা দুর্গা যখন কৈলাশ থেকে মর্তে মানে আমাদের পৃথিবীতে আসেন তখন সাথে করে আনন্দ, ধন-সম্পদ, বিদ্যাবুদ্ধি, খুশি সবকিছু নিয়ে আসেন পৃথিবীর লোকেদের জন্যে। তাই মা দুর্গার সাথে লক্ষ্মী ঠাকুর ও সরস্বতী ঠাকুর আসেন।
- আচ্ছা।
সত্যেন পাল যেদিন ঠাকুরের চোখ আঁকছে সেদিন উমার প্রশ্ন,
-দাদু, মা দুর্গার চোখ দুটো এত বড় বড় আর রাগী রাগী কেন করেছ?
-মা দুর্গা তো মহিষাসুরের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন, তাই মা দুর্গা খুব রেগেছিলেন। সেই জন্যে মা দুর্গার চোখ দুটো বড় বড় আর রাগী রাগী।
-যুদ্ধ তো সেই কবে হয়েছে, আমার জন্মাবার কত্ত আগে। এখন তো মা দুর্গা বাপের বাড়ি বেড়াতে আসছেন, তাহলে এখন কেন চোখগুলো এত বড় আর রাগী করেছ?
সত্যেন কৃত্রিম অপ্রস্তুতের ভান করে বলে,
-ঠিক বলেছ গো দিদিমণি, এটা তো খেয়াল করিনি। এবারটা থাক, আঁকা হয়ে গেছে আর তো কিছু করা যাবে না তবে পরের বার থেকে ঠিকঠাক আঁকব।
-হুঁ, তাই করো।
উমার যত কৌতূহল গণেশ ঠাকুরকে দেখে। থাকতে না পেরে একদিন সত্যেনকে বলে,
-দাদু, সব ঠাকুরের মুখ ঠাকুরের মতো তবে গণেশ ঠাকুরের মুখ কেন হাতির মতো!
-জানো তো দিদিমণি, গণেশ ঠাকুর হলেন মা দুর্গার সবচেয়ে প্রিয় পুত্র। তিনি সবসময় মায়ের সব কথা শুনতেন। একবার হয়েছিল কী, মা দুর্গা গণেশ ঠাকুরকে দরজায় পাহারায় রেখে স্নান করতে ঢুকেছিলেন আর বলে দিয়েছিলেন কেউ এলে যেন দরজা না ছাড়েন। মা দুর্গা স্নানে ঢুকেছেন, গণেশ ঠাকুর পাহারায় আছেন এমন সময় বাবা শিব আসেন মা দুর্গার কাছে কিন্তু গণেশ ঠাকুর জানেন না যে শিব ঠাকুর তাঁর বাবা আর শিব ঠাকুরও জানেন না যে গণেশ ঠাকুর তাঁর ছেলে। শিব ঠাকুর যতবার তাঁকে দরজা ছেড়ে দিয়ে ভেতরে যেতে দিতে বলেন গণেশ ঠাকুর কিন্তু কিছুতেই দরজা ছাড়েন না। শিব ঠাকুর তখন প্রচণ্ড রেগে গিয়ে তাঁর হাতের ত্রিশূল যাকে পিনাক বলা হয় সেটা ছুঁড়ে গণেশ ঠাকুরের দেহ থেকে মাথাটা কেটে ফেলেন। বাইরে গোলমাল শুনে মা দুর্গা বেরিয়ে এসে ওই দৃশ্য দেখে খুব কান্নাকাটি করতে থাকেন ও শিব ঠাকুরকে ছেলের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে বলেন। সব দেবতারাও এসে হাজির হন। কিন্তু কোন দেবতাই কিছু করতে পারেন না কারণ প্রাণ দান করার ক্ষমতা একমাত্র শিব ঠাকুরের আছে। এদিকে শিব ঠাকুরের ত্রিশূলে কিছু কাটা গেলে সেটা আর কখন জোড়া লাগে না। তাই গণেশ ঠাকুরের মাথা আর শরীরে লাগানো যাবে না। শিব ঠাকুর তাঁর অনুচরদের আদেশ দেন যে উত্তর দিশায় গিয়ে প্রথমে যাকে দেখতে পাবে তার মাথা কেটে এনে গণেশ ঠাকুরের দেহে স্থাপন করলে তিনি তাঁর প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারবেন। সাথে সাথে নন্দী, ভৃঙ্গি, শিব ঠাকুরের যত অনুচর ছিলেন সবাই উত্তর দিশায় খুঁজতে বেরিয়ে যান। খুঁজতে খুঁজতে উত্তর দিশায় প্রথমে তাঁরা একটা সাদা হাতির বাচ্চা দেখতে পেয়ে তার মাথাটি কেটে এনে শিব ঠাকুরের হাতে দিলে তিনি সেটি গণেশ ঠাকুরের দেহে স্থাপন করে প্রাণ ফিরিয়ে দেন। সেই থেকে গণেশ ঠাকুরের মুখটা হাতির মতো। তাই তো গণেশ ঠাকুরের আরেক নাম গজানন।
 
ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)