প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Thursday, September 11, 2025

বাতাসে শরতের গন্ধ ও মন কেমনের টান [৩য় পর্ব] | যাদব দাস

বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/২তম সংখ্যা/১০ই আশ্বিন, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
যাদব দাস
 
বাতাসে শরতের গন্ধ ও মন কেমনের টান
[৩য় পর্ব]

"পিকলু চল। কত সুন্দর মেলা বসেছে এবার। ওই অঞ্জনার ধারে। কত সুন্দর সুন্দর বাঁশি। পিকলু চল। মস্ত বাড়িটার উঁচু পাঁচিল ডিঙিয়ে মাঠ বন পেরিয়ে মন ছুটে চলল পিকলুর।"


পূর্বানুবৃত্তি পিকলু শুনেছে তার এক কাকা আছে দূরে কোন শহরে, কিন্তু দেখেনি। মায়ের কথায় সে প্রণাম করে কাকাকেতাদের বাড়িতে দুর্গাপূজা। পিকলুর বাবা নারা ফিরল মাঠ থেকে। ওদের বলল, সপ্তাখানেক আগে যেন অবশ্যই যায়। আর পুজোর নতুন পোশাক দেবে তারাই। কেনাকাটা করার দরকার নেই। তারপর…
 

কিন্তু রাজা আর তিন্নি কোথায় গেল? ওদের দেখা নেই। পিকলুর মন কি বাঁধন জানে? যতক্ষণ না ওদের বলতে পারছে কথাটা ততক্ষণ কিছুতেই নিস্তার নেই মনের। আকাশকে জানিয়েছে, বাতাসকেও। নদী জেনেছে, পথঘাট, গাছপালা, মাঠ জল কারও জানতে বাকি নেই।

 কিন্তু যাদের না জানালে পিকলুর বিরাম নেই, সেই রাজা আর তিন্নি কোথায় উধাও হল আজ? পিকলু ছুটে গেল মণ্ডপে। কানাই পাল কাঠামো বাঁধছে। ওই তো ওখানেই তিন্নি। ওই তো রাজা। পিকলুকে ডাকেনি কেন ওরা? ওরা কী তবে জেনে গেছে এবার পুজোয় পিকলু যাবে কাকার বাড়ি? তাই কী ওদের অভিমান? পিকলু ছুটে গেল ওদের কাছে। রাজার হাতে একগোছা দড়ি। তিন্নির কাছে দুটো-তিনটে সরু কাঠের টুকরো। নিশ্চয় ওরা চেয়ে নিয়েছে। ওরা তো তাই করে পিকলু, রাজা, তিন্নি আরও কত কচিকাঁচা। এই যে একটু দড়ি, দুটো কাঠের টুকরো, একটু বিচুলি কিংবা একটা তুলি না একটু রং প্রতিমাশিল্পীর কাছে এগিয়ে দেওয়া এটা যে কচি মনে কী আনন্দই নিয়ে আসে তা প্রকাশের ভাষা পৃথিবীর কোন কলমের বোধকরি নে। পিকলু ওদের পাশে গিয়ে অভিমানী স্বরে বলে,
-তোরা ডাকলি না কেন আমাকে? আমার কাকার বাড়ির পুজোতে যাব বলে ডাকিসনি তাই না?
-তোর কাকার বাড়িতে পুজো জানব কী করে? আমরা তো ভেবেছি তুই মণ্ডপেই। তাই ডাকিনি
বলল তিন্নি।
-তুই থাকবি না পুজোতে পিকলু? আমাদের মজাই নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু তুই বলিসনি তো যে তোর কাকার বাড়িতে পুজো
রাজা বলে।
-কাকা তো বললই কালকে। বিকেলে এসেছিল। তোদের খুঁজছি তো সেই জন্যেই
পিকলু বলে। পিকলুর আনন্দে ওরা যোগ দিল না। বরং শরতের নির্মল স্বচ্ছ আকাশে কোথা থেকে ভেসে এল ধূসর মেঘের ভেলা। রৌদ্দজ্জ্বল প্রকৃতি যেমন ধূসর মেঘের চাদর গায়ে নিস্তেজ অবসন্ন মনে জড়িয়ে নেয় একবুক বিষাদ, ওদেরও তাই। ওরা মণ্ডপ ছেড়ে ছুটে গেল কোন দিকে কে জানে? পিকলুর মনেও কষ্ট। তবু সেই কষ্ট ছাপিয়ে আনন্দের এমন জোয়ার বইছে ওর মনে যে ইচ্ছে হল এখনই বাসে চেপে চলে যায় কাকার বাড়িতে। কত স্বপ্ন ওর চোখে জড়ো হয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। সেই মস্ত বাড়ি। সারা বাড়িতে ছুটছে পিকলু। মা ডেকে ডেকে হয়রান। কাকা এখানে নিয়ে যাচ্ছে ওখানে নিয়ে যাচ্ছে। কত কী কিনে দিচ্ছে সে। পিকলুর মন আর এখানে নেই।
 
শরৎ মানেই ভোরের শিশির। শরৎ নিয়ে আসে শিউলির জোয়ার। বরফ পাহাড়ের মতো একটা উজার করা আকাশ দিগ্‌দিগন্তে মেলে দেয় ডানা। ভোরের গন্ধ বাতাসে বেরিয়ে পিকলুর মন সেই আকাশ, শিশির আর শিউলির টানে আকুল। নারা গতরাতেই বলে রেখেছিল ভোরের আলো ফুটলেই রওনা দেবে। অনেকটা পথ। তবে সপ্তাহখানেক আগে আর যাওয়া হলো না ওদের। ভূপেশ হয়তো রাগ করবে। করাটা স্বাভাবিক। বাড়িতে তো মাত্র দুজন। ছেলেটা বিদেশে। দুজনের এতসব সামাল দিতে হিমসিম খেতে হবে। মা দুর্গার আবাহন, কত তার নিয়ম, কত তার নিষ্ঠা, আর একদিনের তো ব্যাপার না, ষষ্ঠী ধরে পাঁচদিন। কিন্তু সে-ই বা কী করবে? ধান তোলা ঝাড়াই বাছাই, বস্তাবন্দি করে গুছিয়ে রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। সংসারের সাতসতেরো সেরে বেরোনো। খুশির সীমা নেই পিকলুর। বাসের জানালা দিয়ে উন্মুক্ত আকাশের নীচে বৃহৎ প্রকৃতির রূপ রস দুচোখে ধরে যেন সদ্য ডানা মেলা পাখির মতো উড়ছিল তার মন। কতদিন ট্রেন চড়েনি। সেই কবে মামাবাড়ি যাওয়ার সময় চড়েছিল।
 
একের পর এক স্বপ্নের ভিড় মনে। অবশেষে বাস ট্রেনের পর্ব শেষে পৌঁছালো ওরা। মস্ত বাড়ি। সামনে বেশ খানিকটা উঠোন। সেখানেই প্যান্ডেল। পিকলুর মন খারাপ। স্বপ্ন ছিল নতুন জামা গায়ে চড়িয়ে ঢাক কাঁসর-ঘণ্টার ঐক্যতানে প্রতিমা নিয়ে আসবে, বাজি পোড়াবে আরও কত কত কী, কিন্তু প্রতিমা মণ্ডপে প্রতিষ্ঠিত। পূরণ হলো না। তবু মনের উড়ান কী মাটি পা? কাকা নতুন জামা দিল, একটা না, একজোড়া জামা, একজোড়া প্যান্ট। বাজির প্যাকেট। আর কী চাপিকলুর?
 
যদি এখানেই শেষ হয় গল্পের পথচলা তবে কি মন্দ হবে? মিলনাত্মক গল্পের ক্লাইম্যাক্সে যেমন দেখা যায় হারিয়ে যাওয়া চরিত্রগুলো খুঁজে পায় একে অপরকে এবং এক আনন্দঘন পরিবেশে গল্পও খুঁজে পায় নিজের পথ। ভূপেশ ও নারা দুই ভাই ও তাদের পরিবার কেমন মেতে উঠেছে উৎসবে। ওই তো অঞ্জু। ওর পাশেই ইতি, সম্পর্কে দুই জা। আবার ওদিকে নারা ও ভূপেশ। মণ্ডপে ঢাক বাজাচ্ছে পিকলু। সপ্তমীর সন্ধে সাক্ষী এই মহামিলনের। কিন্তু গল্প হয়েও এ যেন গল্প নয়। মিলনের মাধুর্যের মধ্যেই যে লুকিয়ে থাকবে বেদনার ধূসর রং কে জানত? ধূসর মেঘের ছায়ায় ঢেকে গেল পিকলুর মন। আজ তো সপ্তমী। আজ এমন হওয়ার তো কথা নয়। কী হলো ওর? ভূপেশ বলল,
-মনখারাপ করে বসে আছিস কেন?
নারা জিজ্ঞেস করে,
-কী হলো বাবু?
অঞ্জু বুকের কাছে টেনে নেয়,
-আয় বাবা আজকের দিনে মনখারাপ করতে নেই।
কাকি বাটিতে একটা রাজভোগ এনে বলল,
-পিকলু এটা খা।
তবু পিকলু উদাস। পিকলুর ভাল্লাগছে না। পাঁচিলঘেরা দেহাতি বাড়িটা যেদিন প্রথম দেখল স্বপ্নের রাজপ্রাসাদ মনে হয়েছিল ওর। যেন এই রাজবাড়ির রাজকুমার সে। কিন্তু এখন আর নিজেকে রাজকুমার মনে হচ্ছে না ওর।
-মা, বাড়ি চলো
উদাসমনা পিকলুর আর্তি। সপ্তমী তিথি বিদায় নেয়নি এখনও। পঞ্জিকা মতে, আজ রাত ১১.৪৩ গতে সপ্তমী অবসান্তে অষ্টমীর সূচনা। করপুটে পুষ্প নিয়ে প্রণতি সহকারে মায়ের অঞ্জলি দিয়ে আর কিছু না ছেলেটার জন্যে আশীর্বাদ প্রার্থনা করবে অঞ্জু। মায়ের কাছে এই তো চাওয়া। কিন্তু ছেলেটা এমন উদাস মনমরা যে হয়তো সাধ অপূর্ণই থেকে যাবে অঞ্জুর। ভূপেশ বোঝায়,
-কালকে কত লোক আসবে। দেখবি কেমন মজা হয়।
তবু পিকলুর মন ছন্নছাড়া। রাত গভীর নয়। তবু শুয়ে পড়ল সে। মাঝরাতে কারা যেন ওকে ডাকল। স্পষ্ট শুনল। ফিফিশিয়ে বলছে,
-পিকলু চল। কত সুন্দর মেলা বসেছে এবার। ওই অঞ্জনার ধারে। কত সুন্দর সুন্দর বাঁশি। পিকলু চল। মস্ত বাড়িটার উঁচু পাঁচিল ডিঙিয়ে মাঠ বন পেরিয়ে মন ছুটে চলল পিকলুর।
 
সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)