প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Monday, September 15, 2025

শরতের আকাশে ছায়ার ডাক | নিষাদ আফসারী

বাতায়ন/শারদ/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/২২তম সংখ্যা/১লা আশ্বিন, ১৪৩২
শারদ | ছোটগল্প
নিষাদ আফসারী
 
শরতের আকাশে ছায়ার ডাক
[রহস্যময় গল্প]

"সকালে গ্রাম জেগে উঠতেই নদীর ধারে মেলে একজোড়া লাল চুড়ি আর কিছু ভেজা শিউলি ফুল। অর্পিতার বাবা-মা কেঁদে অস্থিরআর বৃদ্ধ পূজারি কপালে হাত দিয়ে বললেন..."


শরতের শেষ বিকেল। মাঠে কাশফুল হাওয়া দুলছে, কিন্তু সেই হাওয়া যেন ঠান্ডা নয়, বরং অদ্ভুত ভারী। অর্পিতা মণ্ডপের দিকে হাঁটছে, দূর থেকে ঢাকের শব্দ শোনা যাচ্ছে, তবু তার মনে হচ্ছে তালে তালে কারো নিঃশ্বাস পড়ছে কানের কাছে। পথে শিউলি গাছের নিচে এসে থামতেই গন্ধটা কেমন যেন বদলে গেল, মিষ্টি গন্ধের ভেতর ধুপে পোড়া কিছুর গন্ধ মিশে গেছে।

 
মণ্ডপে পৌঁছেই অর্পিতা দেখতে পেল প্রতিমার চোখে এক বিন্দু লাল রঙ— যেন রক্ত। সে ভাবল, হয়তো আলো-ছায়ার খেলা, কিন্তু মনে হল প্রতিমার চোখ তার দিকে তাকিয়েই আছে। মণ্ডপে সবাই হাসিখুশি, আলো ঝলমলে, তবু কোথাও একটা ফাঁকা জায়গায়, প্রতিমার ছায়া পড়ছে না, যেন ছায়াটা অন্যদিকে চলে গেছে। অর্পিতা হঠাৎই শুনতে পেল কারো ফিফিশ,
-দেখো না পেছনে… মায়ের পায়ে কারা দাঁড়িয়ে ঘোর…
সে ঘুরে তাকাতেই শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলপ্রতিমার পায়ের কাছে দাঁড়ানো একদল মানুষ, যাদের চোখ নেই, মুখ নেই… শুধু শূন্য কালো গর্ত, আর ঠোঁট নড়ছে ফিফি স্বরে।
 
 
গ্রামের পুরনো কাহিনি
 
এই গ্রামে শারদীয়া উৎসব এলেই পুরনো এক কাহিনি মাথা তোলে। বছর কুড়ি আগে, অষ্টমীর রাতেই এক মেয়ের মৃত্যু হয়েছিল নদীর ধারে। বলা হয়, সে প্রেমে প্রতারিত হয়ে আত্মহত্যা করেছিল। তারপর থেকে তার আত্মা প্রতিবছর শারদীয়া উৎসবের অষ্টমীর রাতে ফিরে আসে, কাউকে নিজের মতো কষ্টে টেনে নিতে।
বৃদ্ধ পূজারি বহুবার সতর্ক করেছেন,
-অষ্টমীর রাত নদীর ধার দিয়ে যেও না। সেই রাতে ছায়ারা ডাকে।
অর্পিতা এসব বিশ্বাস করত না। হাসতে হাসতেই সে বলত,
-আমি তো এসব মানি না ঠাকুরদা।
 
 
অষ্টমীর রাতের ডাক
 
অষ্টমীর রাতে মণ্ডপে ঢাক বাজছে, ধুপ-ধুনোর গন্ধে ভরে আছে চারপাশ। অর্পিতা নাচে মগ্ন, জনতার চোখ তার দিকে। নাচ থামতেই সে বলল,
-একটু হাওয়া খেয়ে আসি।
সে চলে গেল নদীর দিকে। কাশবনের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো পড়ছে নদীর জলে, আর জলের ওপরে ভাসছে সাদা ফুল। হঠাৎ, দূরে দাঁড়ানো এক সাদা শাড়ি পরা নারী তাকে হাতের ইশারায় ডাকল, মুখে অদ্ভুত হাসি, চোখে গভীর দুঃখ।
-এসো…
অর্পিতা যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে গেল। সেই রাতে আর কেউ তাকে ফিরে আসতে দেখেনি।
 
 
পরদিনের ভয়
 
সকালে গ্রাম জেগে উঠতেই নদীর ধারে মেলে একজোড়া লাল চুড়ি আর কিছু ভেজা শিউলি ফুল। অর্পিতার বাবা-মা কেঁদে অস্থির, আর বৃদ্ধ পূজারি কপালে হাত দিয়ে বললেন,
-আমি জানতাম… ছায়ার ডাক থেকে কেউ রক্ষা পায় না।
 
 
বছর পর…
 
বছর কেটে গেল। আবার শারদীয়া এল। আনন্দের মাঝেও গ্রামের মানুষ অর্পিতার কথা মনে করল। এবারের পূজায় দেখা গেল এক অপরিচিত মেয়েকে, সাদা শাড়ি, চুলে শিউলি ফুল, আর চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। অষ্টমীর রাতে মণ্ডপে ভিড় জমেছে, ঢাক বাজছে। হঠাৎই মেয়েটি চুপচাপ এসে প্রতিমার পায়ের কাছে দাঁড়াল। ঢাক থেমে গেল। তার ঠোঁটে হালকা হাসি,
-ঋণ শোধ হয়েছে… এবার আমি মুক্ত।
মেয়েটি ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেল। প্রতিমার চোখে চিকচিক করছে এক ফোঁটা জল, আর পায়ের কাছে পড়ে আছে একগুচ্ছ শিউলি আর অর্পিতার লাল চুড়ি।
 
 
শেষ কথা
 
লোকেরা বুঝল অর্পিতা আর সেই পুরনো কাহিনির মৃত মেয়ের আত্মা একে অপরের অসমাপ্ত গল্প পূর্ণ করেছে।
অর্পিতা তাকে মুক্তি দিয়েছে, আর নিজেও মুক্ত হয়েছে। সেদিন থেকে, প্রতি শারদীয়ায় দেবীর পায়ের কাছে রাখা হয় এক থালা শিউলি আর লাল চুড়ি, যেন ছায়ার ডাক আর কোন জীবন কেড়ে নিতে না পারে।
 
 
শেষ লাইন
 
শরতের আকাশে সাদা ফুল ঝরে পড়ে, কিন্তু সব গল্প ঝরে যায় না, কিছু থেকে যায় হাওয়ার ফিশফিশে, আর কাশবনের ছায়ায়…
 
সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)