বাতায়ন/শারদ/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/২২তম সংখ্যা/১লা আশ্বিন, ১৪৩২
শারদ | ছোটগল্প
উৎপলেন্দু
পাল
সেই
পাগলটা
"উঁকি মেরে দেখলাম একটা রিকশাভ্যানের ওপর চাদর মোড়ানো একটা মৃতদেহ। মুখটা খোলা। আমার চিনতে ভুল হলো না, 'এ সেই পাগলটা'। তার দেহের পাশে একটা ঝোলা, যেটা আমিও দেখেছি কতবার।"
শহরের রাস্তায় রোজ দেখতাম পাগলটাকে। কী যেন বিড়বিড় করত, মাথা নাড়াত, অদ্ভুত সব মুখভঙ্গি করত। মাঝেমধ্যেই তাকে মদনমোহন মন্দির বা শনিমন্দিরের সামনে বসে থাকতে দেখতাম। ময়লা পোশাক, কাঁচাপাকা বাউন্ডুলে চুল অথচ একজোড়া অদ্ভুত শান্ত চোখ। যে যা দিত নিয়ে নিত তা টাকাপয়সা বা খাবার যাই হোক। অবশ্য অন্যান্য জায়গায় এমনকি নিষিদ্ধপল্লীর রাস্তায়ও হাঁটতে দেখেছি।
কত পাগল, কত ভিখারিকেই তো রোজ দেখি, কখনও কখনও কাউকে একটু আলাদারকম লাগে,
নজর
কাড়ে আবার ভুলেও যাই। ওকেও ভুলে গিয়েছিলাম যথারীতি। একদিন আমার মেয়ে আমাকে বলল,
-বাবা, একটা পাগলকে দেখলাম
দোকান থেকে কলম কিনছে। পাগল কলম দিয়ে কী করবে?
আমি হালকা চালে উত্তর দিলাম,
-দ্যাখ আদৌ সে পাগল কিনা! আজকাল কত ধরণের পাগল আছে, কার কী মতলব কে জানে?
তারপর সব ভুলেও গিয়েছিলাম।
কিন্ত গত রবিবার থানার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভিড় দেখে থামলাম। উঁকি মেরে দেখলাম একটা রিকশাভ্যানের ওপর চাদর মোড়ানো একটা
মৃতদেহ। মুখটা খোলা। আমার চিনতে ভুল হলো না, 'এ সেই পাগলটা'। তার দেহের পাশে
একটা ঝোলা, যেটা আমিও দেখেছি কতবার। একজন
পুলিশ কনস্টেবল ঝোলা থেকে একটা একটা করে জিনিস বের করছেন, আর একজন লিখে রাখছেন। একটা আধছেঁড়া ডায়েরি, একটা ভাঁজকরা দিস্তা খাতা বের হলো। একজন রসিকতা করে বলল,
-শিক্ষিত পাগল।
সবাই হোহো করে হাসতে লাগল।
কনস্টেবল খাতা খুললেন। ভেতরে পাতায় পাতায় কবিতা, তার কতগুলোয় অসংখ্য কাটাকুটি। ডায়েরিটা খুললেন, ওতেও পাতায় পাতায় কবিতা, ছবি, স্কেচ। একজন বলে উঠলেন,
-পাগলের কবিতা।
আর একজন,
-পাগলা কবি।
সবাই যথারীতি হোহো। আমি বললাম,
-স্যার, খাতা আর ডায়েরিটা
একটু পড়া যাবে?
উনি ধমক দিয়ে বললেন,
-এগুলো আমরা বাজেয়াপ্ত করেছি, কারও হাতে দেওয়া যাবে না। যান, এখানে ভিড় করবেন না।
আমি মাথা নিচু করে পিছু
হঠলাম। দু-এক পা এগোতেই কে যেন টিপ্পনি কাটল,
-এ ব্যাটা মনে হয় পাগলের সাগরেদ।
আর একজন,
-এ শালারও পাগল হবার সময় হয়েছে।
সবাই হোহো করে উঠল।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment