বাতায়ন/নৃপেন
চক্রবর্তী সংখ্যা/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/২৮ সংখ্যা/১৪ই কার্ত্তিক,
১৪৩২
নৃপেন চক্রবর্তী
সংখ্যা |
ছোটগল্প
অর্পিতা
চক্রবর্তী
ইচ্ছেডানা
"সন্ধ্যারতির পর ধুনুচি নাচ, গানের লড়াই এসব নিয়েই কেটে যেত দিনগুলো। আনন্দ তখন কোন অংশে কম ছিল না অথচ আজকাল সবটাই কেমন যেন দেখনদারির পর্যায়ে চলে গেছে।"
আসন্ন দুর্গোৎসব উপলক্ষে সেজে
উঠেছে চৌধুরী পাড়া। ৭৫তম বর্ষের পুজোয় এবার এদের থিম "অন্বেষণ"।
কিন্তু কীসের অন্বেষণ তা এখনই বোঝা যাচ্ছে না। তবে শোনা যাচ্ছে প্রত্যেক বাড়ি থেকে পুরনো বোতল, মগ, বালতি এসব সংগ্রহ করা হবে। অখিলেশ কর্মকার এ পাড়ার ঐকতান অ্যাপার্টমেন্টে
একাই থাকেন। স্ত্রী বিয়োগের পর উনি ছেলের সাথে তাদের বোঝা হয়ে থাকতে চাননি। যদিও
এই বিষয়ে ছেলের সাথে ওনার মতবিরোধ লেগেই আছে।
আজ রবিবার। পাড়ার ছেলেরা বেরিয়ে পড়েছে
চাঁদা সংগ্রহের কাজে। ওদের অবশ্য অখিলেশ কাকার কাছে একটা বিশেষ দাবি আছে,
-কাকা আপনাকে
এবার আমাদের পুজো কমিটিতে থাকতে হবে।
কিন্তু কাকার এই বিষয়ে
বেজায় আপত্তি আছে। তিনি থাকবেন ঠিকই তবে কোন পদ অলংকৃত করবেন না।
-বেশ তবে তাই
হোক।
আপাতত কাকা প্রতি রবিবার
মন্ডপে যাবেন এবং সমস্ত কাজ তদারকি করবেন। তবে কাজটা মন্দের উপর ভাল। কোন বাড়তি
বোঝা নেই। পাড়ার ঘোতনা, ছোটন, নোটন সবাই মিলে প্রত্যেক বাড়ি থেকে পুরোন জিনিস সংগ্রহ
করছে। যদিও প্যান্ডেল যেভাবে হয় সেভাবেই হচ্ছে। তবে ওইসব বাতিল করা
সামগ্ৰী দিয়ে ওরা ভিতরের নকশা তৈরি করেছে। বেঁচে থাকতে গেলে সবকিছুরই প্রয়োজন
আছে আর ওদের প্রচেষ্টা ওইসব ভাঙাচোরা জিনিস দিয়ে একটা বিরাট
কিছু গড়ে তোলার। না বিষয়টা একটু খটমট হলেও মন্দের ভাল।
সেদিন ছিল রবিবার, কাকাবাবু চলেছেন মন্ডপ পরিদর্শনে। মদ্যপান, ধূমপান, ঝিঙ্কুনাকুড় নাচ
নিয়ে মেতে আছে পাড়ার ছোকরারা। অখিলেশবাবু মন্ডপে ঢুকতে গিয়েও ঢুকতে পারলেন না।
সোজা চলে আসলেন নিজের ঘরে। ছেলেকে ফোনে জানালেন সবটুকু। এরপর প্রায় তিন সপ্তাহ
উনি আর ও মুখো হননি। এরপর হঠাৎ করেই একদিন পাড়ার ছেলেরা ওনার বাড়িতে এসে হাজির।
-কাকাবাবু আপনি
কি অসুস্থ? মন্ডপে আসছেন না যে।
-না না, আমি দিব্য আছি। আমি গিয়েছিলাম তো কিন্তু তোমরা একটু বেশি
রকম ব্যস্ত ছিলে তাই দেখতে পাওনি। আর তাছাড়া অত জোরে গান আমি আর নিতে পারি না, বুকে কষ্ট হয়। আসলে কী জান-তো আমাদের মতো
মানুষের প্রয়োজন বোধহয় শেষ। তবে তোমরা এগিয়ে যাও। নতুন কিছু সৃষ্টি করো। আমার
আর্শীবাদ রইল তোমাদের সাথে।
অবশ্য চলে যাওয়ার আগে ওরা
সকলেই বারংবার ক্ষমা চাইল কাকার কাছে। তবে দোষ বোধহয় ওদের নয়, দোষ এই গোটা সমাজের। ছোটবেলা থেকে একটি শিশু যা দেখে বড়
হয় তাই দিয়ে গড়ে ওঠে তার ভবিষ্যৎ।
আজ কাকাবাবুর খুব মনে পড়ছে
ছোটবেলার কথা। ওনাদের দেশের বাড়িতে দুর্গাপুজো হত। বাড়িতে ঠাকুর বানানো হত।
পুজোর দিনগুলো বাড়িটা লোকে লোকারণ্য হয়ে থাকত। ঢাকের বাদ্যি, শাঁখ, উলু এসব নিয়ে মেতে
থাকত গোটা পরিবার। সারাদিন পুজোর কাজ করতে করতেই সময় কেটে যেত। সন্ধ্যারতির পর
ধুনুচি নাচ, গানের লড়াই এসব নিয়েই কেটে
যেত দিনগুলো। আনন্দ তখন কোন অংশে কম ছিল না অথচ আজকাল সবটাই কেমন যেন দেখনদারির
পর্যায়ে চলে গেছে।
হঠাৎ করেই অখিলেশবাবুর
কলিংবেলটা বেজে উঠল। রামেশ্বর মুখার্জী এসেছেন। উনি এই পুজো কমিটির সহ সভাপতি। তবে
এ বছরই ওনার শেষ বছর। আর ভাল লাগছে না। আসলে এই বয়সে এত গুরুদায়িত্ব আর ভাল লাগে
না। তাছাড়া আজকালকার ছেলেছোকরাদের সাথে ওনার ঠিক খাপ খায় না।
অনেকদিন পরে পাড়ার দুই
গুরুজন বসেছেন আলাপচারিতায়। একের পর এক স্মৃতির পাতাগুলো যেন চোখের সামনে ভিড়
করছে। বাড়ি ভর্তি আত্মীয় সমাগম, খাওয়াদাওয়া, মা ঠাকুমার হাতের সুস্বাদু রান্নাবান্না। মহাষ্টমীর অঞ্জলি, বিজয়া দশমীতে সিঁদুর খেলা এই সব নিয়ে কেটে যেত দিনগুলো। মুখার্জীদা
একটু ঠাট্টার সুরেই বললেন,
-তা আজকাল বুঝি এসব হয়না দাদা?
-হয় মুখার্জী
আজও সব হয় শুধু আনন্দটা যেন কোথাও ফিকে হয়ে গিয়েছে। ফটোসেশন, থিম, রিল এসব কঠিন কঠিন
শব্দগুলো কেড়ে নিয়েছে অনেককিছু। আজ উৎসব আছে কিন্তু আনন্দ নেই বা হয়তো আছে তবে
আমাদের মতো মানুষ আর তাকে উপভোগ করতে পারে না।
-এই অখিলেশ, তোমার মনে আছে পুজো বোনাস পেয়ে আমরা একটা লিস্ট করতাম।
তারপর স্বপরিবারে যেতাম কেনাকাটা করতে।
-মনে আছে দাদা, সব মনে আছে। আমরা আবার গ্ৰাম থেকে শহরে আসতাম। ফর্দ মিলিয়ে
জিনিস কিনতাম। আর আজকাল ঘরে বসে বসেই সব এসে যাচ্ছে। সারা বছর ধরে চলছে কেনাকাটা।
তবে সময়ের মজা অসময়ে হলে ঠিক কতটা মজা হয় তা সত্যিই আমার অন্তত জানা নেই। যাক
আজ তাহলে উঠি, আবার দেখা হবে।
মুখার্জীদা চলে গেলেন। শূন্য ঘরে
একাকী কাকাবাবু ফোন ঘোরাল ছেলেকে,
-জানিস তো বাবু
এবারের পুজোটা তোর সাথেই কাটাব ঠিক করেছি। আমি আসছি খুব শিগগিরই।
-বাবা তুমি
এসেছ আমি কিন্তু খুব খুশি হয়েছি। এবার বলো তো আমাদের পাড়ার পুজোর
"অন্বেষণ" কতদূর?
-জানি-না রে, আসার সময় দেখলাম
প্যান্ডেল শেষের পথে। ভালই হবে নিশ্চয়ই। তবে আমার মনে হয় ভালর অত্যাধুনিক
সংজ্ঞাটির মধ্যে চাকচিক্য বাহুল্য সব আছে নেই শুধু প্রাণের ছোঁয়া। আমাদের পাড়ার
ছেলেগুলো খুব খাটছে। সেরার সেরা হবে হয়তো আমাদের প্যান্ডেল। প্রতিমাও শুনেছি খুব
ভাল হবে।
-আচ্ছা বাবা
তুমি সব ছেড়ে চলে এলে আমার কাছে। তবে আমার কিন্তু বেশ লাগছে বিষয়টা কিন্তু তোমার
কেমন লাগছে বললে না তো?
-আমারও খুব ভাল
লাগছে। আসলে উৎসব মানে কী জানিস বাবু? উৎসব মানে শুধু থিম নাচ গান নয়, যে-কোনো উৎসব পূর্ণতা পায় তার আপনজনদের সাথে, তার পরিবারের সাথে। আজ আমার মনটা খুব ভাল লাগছে। মনের খুশির
চেয়ে বড় উৎসব আর কিছু হয় না রে। যেখানে মনের খুশি নেই সেখানে উৎসব বিলাসিতা
মাত্র।
কথায় কথায় রাত কেটে ভোর হতে
চলল। ভোরের আকাশে তখন ভেসে আসছে আগমনির সেই চেনা সুর,
বাজল তোমার আলোর বেনু,
মাতল রে ভুবন,
আজ প্রভাতে...
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment