বাতায়ন/তূয়া
নূর সংখ্যা/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া
নূর সংখ্যা | ধারাবাহিক গল্প
সুরঞ্জন ঘোষ
হতভাগ্য
[১ম পর্ব]
"আপনারা কালই হাজারিবাগ স্টেশন চলে আসুন। স্টেশনে দু-একজন নিত্যযাত্রীর কাছে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম পাগলটা আজ মাসখানেক হল এখানে এসেছে। এমনিতে খুবই ভাল মনে হয় বেশ লেখা পড়া জানা।"
আমি জরিপ বিভাগের একজন কর্মী।
কর্মস্থল বিহারের হাজারিবাগ। কয়েক দিনের ছুটিতে কলকাতায় বাড়ি ফিরব বলে স্টেশনে বসে
আছি। ট্রেন আসতে এখনও বেশ বাকি আছে। এমন সময় দেখি একটা পাগল গোছের লোক আমার সামনে
দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। এক করুণ আর্তি নিয়ে— ‘একটু আগুন হবে, আগুন?’ দেখলাম তার মুখে একটা বিড়ি, পরনে একটা ঢিলেঢালা আধ-ময়লা পাঞ্জাবি,
মাথায়
বাহারি ঝাঁকড়া চুল, কাঁধের ছেঁড়া ঝোলা
ব্যাগ থেকে দু-একটা রবীন্দ্র উপন্যাসের অংশ বিশেষ দেখা যাচ্ছে। আমি অতশত না ভেবে পকেট
থেকে একটা দেশলাই বের করে ধরিয়ে দিলাম। একটা আশ্চর্য তৃপ্তির হাসি দিয়ে পাগলটি
চলে গেল। যাওয়ার সময় কয়েক বার পিছু ফিরে আমার দিকে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল।
প্রথমত সেভাবে খেয়াল করিনি কিন্তু ও চলে যাওয়ার পর কেমন যেন মনে হল ওই চোখ আমার
খুব চেনা। হাসিটাও।
মনে পড়ল ২০০৪ সালের ইংরেজি
এমএ ব্যাচের কবি কবি চেহারার
শঙ্করের কথা। সেও রবীন্দ্র প্রেমী ছিল। আমাদের ব্যাচেরই নবনীতাকে সে পাগলের মতো ভালবাসত, ভালবাসত নবনীতাও। আমরা কয়েকজন ছিলাম ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমি
চাকরি পাওয়ার পর নানা ব্যস্ততায় প্রথম দিককার মতো অতটা যোগাযোগ নেই। কিন্তু এই
চোখ এই হাসি আমার খুব চেনা। অবিকল শঙ্করের মতো। আমার পুরোনো ডায়েরিতে শঙ্করের বাড়ির ফোন নম্বর খুঁজে পেলাম। ফোন লাগতেই বললাম,
-কী রে টুসকি?
টুসকি শঙ্করের ছোট বোন। যখনই
ফোন করতাম ও-ই এসে আগে আগে ফোন ধরত। তাই ভাবলাম টুসকিই হবে। কিন্তু ওপার থেকে
উত্তর এলো,
-টুসকির তো বিয়ে হয়ে গেছে।
আপনি কে বলছেন?
বুঝলাম উত্তরকারীনি মাসিমা।
শঙ্করের মা।
-আমি পরেশনাথ, চিনতে পারছেন?
-হ্যাঁ, পরেশ মানে- তুমি তো
আমার শঙ্করের সাথেই পড়তে, না?
মাসিমা আমাকে সহজেই চিনতে
পারলেন। শঙ্করের কথা জিজ্ঞেস করতেই হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠলেন,
-বাবা, আমার শঙ্কর আজ পাঁচ বছর হল কোথায় যে চলে গেল! কোথায় আছে, কেমন আছে, বেঁচে আছে কিনা
কিচ্ছু জানি না।
জানতে পারলাম, যে নবনীতাকে
সে প্রাণের চেয়েও বেশি ভাবত, ভালবাসত উজাড় করে, সেই নবনীতার বড়লোক বাবা একপ্রকার জোর করেই তার পাঁজর
ছিঁড়ে ভালবাসার ফোটা ফুল তাদের মতো বড় ঘরে, বড় বরে নিবেদন করেছেন। প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছাড়া
নিবেদিতারও কিছু করার ছিল না। ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয়কে দিয়ে চেষ্টাও সে করেছিল কিন্তু
তার বাবার টাকা ও প্রভাবের কাছে প্রশাসনও নির্বিকার হয়ে পড়ে। তার ফোনটা পর্যন্ত
কেড়ে নেওয়া হয়। সেই হিতৈষী আত্মীয়ের মুখে শুনেছেন। পরে যখন শঙ্করকে নবনীতা সব
জানায় ততদিনে তার বিয়ে হয়ে গেছে। জলের মাছকে ডাঙায় তুললে যেমন মাছ বাঁচে না, শঙ্করও তেমনি দিনে দিনে একেবারে নির্জীবের মতো হয়ে পড়ে।
ফিরে ফিরে শুধু একটা কথাই বলত,
-ভাগ্যের কাছে ভালবাসা বড়
নয় মা। নিয়তিই বড়।
আমার খেয়াল হল পাগলটা
বিড়বিড় করে অমন একটা কিছু বলছিল। তারপর একদিন রাতে সে উধাও হয়ে যায়। আমাকে
বললেন,
-বাবা দেখো না, ওকে খুঁজে পাওয়া যায় কিনা!
আমি বললাম,
-মাসিমা আমি শঙ্করকে পেয়েছি।
আপনারা কালই হাজারিবাগ স্টেশন চলে আসুন। স্টেশনে দু-একজন
নিত্যযাত্রীর কাছে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম পাগলটা আজ মাসখানেক হল এখানে এসেছে।
এমনিতে খুবই ভাল মনে হয় বেশ লেখা পড়া জানা। আমার স্থির বিশ্বাস জন্মাল ও শঙ্কর
ছাড়া কেউ নয়। সেই বিশ্বাস থেকেই শঙ্করের মাকে বললাম শঙ্করকে পেয়েছি। সেদিন আর
বাড়ি ফেরা হল না। আমি কোয়ার্টারেই ফিরে গেলাম।
কিছুক্ষণের মধ্যে একটা অচেনা
নম্বর থেকে ফোন এল। ফোন ওঠাতেই একজন মহিলা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
-আমি মাধুরী বলছি পরেশদা।
আসল নামটা মনে ছিল না তাই
বুঝতেই পারিনি আমাদের ছোট্ট টুসকি এতদিনে মাধুরী হয়ে উঠেছে। আমি
বললাম,
-বলুন।
-আমায় চিনতে পারছ না, পরেশদা? আমি টুসকি-
ও বলল।
-ও— টুসকি? কেমন আছিস বোন?
তারপর উভয়ের কুশল বিনিময় ও
প্রাসঙ্গিক কিছু কথা হল এবং মাসিমার সঙ্গে যেসব কথা হল তার সূত্র ধরে শঙ্করের কথা
উঠল। সম্ভবত মায়ের কাছে সব শুনে আমাকে ফোন করেছে। বললাম,
-তোরা কালই হাজারিবাগ চলে আয়।
যত তাড়াতাড়ি পারিস।
-আচ্ছা।
বলে ও ফোন কাটল।
সেদিন রাতে আমার ঘুম হল না।
একদিকে আমার নিখোঁজ হয়ে যাওয়া পুরোনো বন্ধুকে তার প্রিয়জনদের কাছে তুলে দেওয়ার
আনন্দ, অন্যদিকে সত্যি যদি সে আমাদের
শঙ্কর না হয় তাহলে শঙ্করের মা, বোন ও আপনজনদের কাছে কী একটা
বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ব! তাদেরও মনের অবস্থা কী হবে সেটা ভেবে
আমি অস্থির হয়ে পড়লাম। আমি আস্তিক মানুষ। মনে মনে ভগবানকে বলতে থাকলাম,
-ঠাকুর ও-ই যেন আমাদের শঙ্কর
হয়, ঠাকুর!
এরই মধ্যে আমার সহধর্মিনীর
ফোন। গলায় একরাশ অভিমানের সুর আমি কেন একবারও ফোন করিনি। আমাকে কিছু মাত্র বলার
ফুরসত না দিয়ে যা কিছু বলল তার অভিমান,
দাবি, অনুযোগ, কল্পনা ও সন্দেহ সকলই ছিল যা আমি
ভালবাসার বাহ্যিক প্রকাশ বলে মেনে নিতে অভ্যাস করে ফেলেছি। আমার মুখে সব শুনে
মহারাণীর অভিমানের সুর যেন নিমেষেই বিস্ময়ের সাথে আনন্দ মিশে হয়ে গেল এক
বিলম্বিত আশাবরী।
-বলছি তোমার না-হয় আস্তে দেরিই হোক তবু শঙ্করদাকে ওদের কাছে তুলে দিয়ে তবে এস।
প্রমিতা যেন শেষ কথাটা বলতে
বলতে কয়েকবার নাক টানল বুঝলাম ও কাঁদছে। বলল,
-তুমি না-হয় ওদের
নিয়ে আমাদের বাড়িতেই এস। তোমার মুখে শঙ্করদার কথা অনেক শুনেছি একবার দেখতে ইচ্ছে
করছে।
-আচ্ছা দেখছি।
বলে আমি ফোন কেটে দিলাম। অপেক্ষার
সময় যেন কাটতেই চায় না। মনে হল নবনীতাকে অনলাইন কল করি। করলামও তাই। নিবেদিতাকে
এত সহজে পেয়ে যাব ভাবিনি।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment