প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

তূয়া নূর সংখ্যা | জিরাফের গলা

বাতায়ন/ তূয়া নূর সংখ্যা/ সম্পাদকীয়/ ৩য় বর্ষ/ ৪০ তম সংখ্যা/ ২৪শে মাঘ,   ১৪৩২ তূয়া নূর সংখ্যা | সম্পাদকীয়   জিরাফের গলা "সম্পূর্ণ ভাবে ...

Friday, February 6, 2026

চন্দ্রময়ী দেবীর পীঠস্থান | জনা বন্দ্যোপাধ্যায়

বাতায়ন/তূয়া নূর সংখ্যা/ভ্রমণ/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া নূর সংখ্যা | ভ্রমণ
জনা বন্দ্যোপাধ্যায়
 
চন্দ্রময়ী দেবীর পীঠস্থান

"এই স্থানে প্রথম রামচন্দ্রের গুরু বশিষ্টদেবের আগমন ঘটে! তিনি এখানকার শিলাস্থলে পার্বতীর অপূর্ব অপ্সরা রূপ দর্শন করেছিলেন! সে রূপ দেখে মহামুনি বশিষ্ট অভিভূত হয়েছিলেন।"

 
বীরভূমের নলহাটি থেকে ঝাড়খন্ডের মালুটি যাওয়ার পথে চোখে পড়ে চন্দ্রময়ী দেবীর পীঠস্থান। জনশ্রুতি আছে এটি একটি অংশপীঠ! রাস্তার ওপর বড় সুদৃশ্য তোরণে চন্দ্রময়ী মাতার প্রবেশ দ্বার লেখা!
চন্দ্রময়ী মাতার প্রবেশদ্বারের তোরণ
ভেতরে খানিকটা এগিয়ে জঙ্গল ও টিলা
-পাথর ঘেরা বিস্তৃত জায়গায় আমাদের গাড়ি দাঁড়ায়! সুন্দর রং করা বাঁধানো সিঁড়ি উঠে গেছে দেখে বোঝা যায় যে, এই এলাকাটি পুরোপুরি টিলা-পাথর পরিবৃত ছিল! যখন বাঁধানো সিঁড়ি ছিল না, তখন বেশ দুর্গম পথ অতিক্রম করে পরে উঠতে হত! এ কাজ সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজ ছিল না! সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে দেখলাম চারিদিক বেশ নির্জন, আর একটু পরেই সন্ধে নেমে আসবে! শীতের প্রথমে হালকা ঠান্ডা হাওয়া বইছে!
টিলা পরিবৃত স্থান, যেখানে মন্দিরের সিঁড়ি শুরু হচ্ছে

আমি ও আমার স্বামী সিঁড়ি বেয়ে খানিকটা উঠে মা কালীর একটি বিরল মূর্তি দেখে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়িয়ে পড়লাম! একটি মাচার ওপর মহাপ্রেত শিবের কাঁধে ব্যাঘ্রচর্ম পরিহিতা মা কালী পদ্মাসনে উপবিষ্টা—এ রকম মূর্তি আগে দেখিনি! মহাপ্রেতের এই ধারণা লৌকিক বলে মনে হয়!
মহাপ্রেতের পৃষ্ঠদেশে কালীর অবস্থান
প্রেতেদের আধিপতি শিব এখানে বাহক রূপে দৃশ্যমান! শিব ও কালীর কত রকমের মহিমা যে বাংলায় ছড়িয়ে আছে তা অনেকেই জানেন! হয়তো কোনো উৎসব উপলক্ষ্যে এরকম শিব ও কালীর মূর্তি নিয়ে স্থানীয় মানুষজন সমারোহে শোভাযাত্রা বের করে বলে অনুমান করলাম! আরো কিছুটা উঠে মায়ের মন্দির দেখলাম
, যার স্থাপনা হয়েছিল বামদেবের হাতে!
বামদেব প্রতিষ্ঠিত কালী মন্দির
তবে স্থানটির অন্য মাহাত্ম্যও আছে! মন্দিরের তালা বন্ধ গর্ভগৃহের কোলাপসিবল গেট দিয়ে দক্ষিণা কালীর সুন্দর মূর্তি চোখে পড়ে। চারিপাশের শান্ত পরিবেশ দেখে মন্দিরের সামনে সুন্দর বাঁধানো নাট
-মণ্ডপে বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলাম! ভাবলাম সন্ধ্যারতির জন্য সন্ধে হলে মন্দির খোলা হবে!
 
একটু পরেই মন্দির সংলগ্ন আশ্রম থেকে একজন অল্প বয়স্ক বাঙালি সন্ন্যাসী বেরিয়ে এলেন, তাঁর থেকেই শুনলাম মন্দিরের পাশে গ্রিল ঘেরা অংশে যে বড় শিলাটি আছে, সেখানে পার্বতীর চোখের জ্যোতি পড়েছিল! তাই একে অংশপীঠ বলা হয়!
অংশপীঠে মায়ের পবিত্র শিলা
সাদা ধুতি
, সাদা ফতুয়া ও সাদা চাদর পরিহিত সন্ন্যাসী বেশ উৎসাহ নিয়ে অনেক গল্প শোনালেন। এই স্থানে প্রথম রামচন্দ্রের গুরু বশিষ্টদেবের আগমন ঘটে! তিনি এখানকার শিলাস্থলে পার্বতীর অপূর্ব অপ্সরা রূপ দর্শন করেছিলেন! সে রূপ দেখে মহামুনি বশিষ্ট অভিভূত হয়েছিলেন। সন্ন্যাসী বিশ্বাস করেন বশিষ্টদেবের মৃত্যু হয়নি। তিনি অমর! গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী কোথা থেকে এসেছেন বলেননি, তবে এই নির্জন সমাহিত স্থানে তিনি একাই থাকেন বুঝলাম! আরো তিন-চারজন ভক্তের সমাগম হয় সেই সময়! শেষ বিকেলে টিলা-পাথরের গাছগুলোতে অন্ধকার নেমে আসছে! মন্দিরের পাশ দিয়ে গিয়ে গ্রিলের গেট খুলে মায়ের পবিত্র মূল শিলাটি দেখলাম। একটি ঘেরা স্থানে সিঁদুর মাখানো প্রাচীন শিলাটি দেখে ভক্তি জাগে! সন্ন্যাসী বলেন স্থানীয় গ্রামবাসীরা চাঁদা তুলে এই স্থানে সুন্দর মন্দির নির্মাণে সহায়তা করেছেন!
মন্দিরের দিকে বাঁধানো সিঁড়ি উঠে গেছে
তিনি কথা প্রসঙ্গে আরো বলেন যে
, এই স্থানের কথা খুব বেশি প্রচার হয়নি! কিছু দূরে একটি নদী আছে! সুদূর অতীতে কোনো এক রোমান সাহেব এসেছিলেন, তিনি যে বইতে এখানকার কথা লিখেছিলেন, সেটি একজন স্থানীয় গ্রামবাসী হয়তো সংগ্রহ করেছিলেন। তবে তাঁর উত্তরসূরির কাছে বইটি আর নেই!
 
সন্ন্যাসীর মুখে অনেক কাহিনি শুনে একটা কথা বুঝলাম এই স্থান সাধনার জন্য আদর্শ ছিল বলেই বহু পূর্বে বশিষ্টদেব এবং পরবর্তী কালে বামদেব এসেছিলেন। তাঁদের পদধূলি ধন্য স্থানটি হৃদয় আবিষ্ট করে!
 
প্রচার বিহীন এই রকম অংশপীঠে ঘন্টাখানেক সময় অতিবাহিত করে সন্ন্যাসীর থেকে বিদায় নিয়ে পরম প্রশান্ত মনে ফিরে চললাম নিজেদের নির্দিষ্ট পথে! কিছু প্রশ্ন ও কৌতূহল জেগে রইল! রোমাঞ্চ ও ভক্তি মিশ্রিত নিভৃত স্থানটি যে ভীষণ ভাল লেগেছে এ কথা বলাই বাহুল্য!
 
~~০০০~~
 

No comments:

Post a Comment

সূর্যাস্ত গঙ্গার বুকে


Popular Top 10 (Last 7 days)