বাতায়ন/তূয়া
নূর সংখ্যা/প্রবন্ধ/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া
নূর সংখ্যা | প্রবন্ধ
পারমিতা
চ্যাটার্জি
সমাজ
সংস্কারক বিদ্যাসাগর
"যে নারী খোলা উঠোনে বা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকতে পারত না, এমনকি জানলায় দাঁড়ানো নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়ত সেই নারীরা বইখাতা হাতে দলে দলে স্কুলে যেতে আরম্ভ করল।"
দিঘিও নও ঝিলের জলও নও শান্ত নদীও
তুমি নও তুমি হলে সমাজের পঙ্কিলতা দূর করে নারীকে খোলা আকাশের নীচে নিয়ে এনে তাদের হাতে খাতাবই তুলে দিয়ে শৃঙ্খল মুক্ত করেছ। তুমি
এক দুরন্ত দামাল ঢেউ ভাঙা সাগর, যে সময়ে নির্যাতনের আবর্তনে
নারীকে বন্দি করে দেওয়া হত বিয়ে নামক এক কঠিন কারাগারে, তুমি সেই কারাগারের দরজা কঠোর হাতে ভেঙে দিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে যুদ্ধ
করে গেছ তৎকালীন সমাজপতিদের সাথে। মুক্ত
করেছ নারীকে কঠোর বৈধব্য পালনের শাসন থেকে। ছ’ বছরের বিধবা
শিশুকন্যা বৈশাখ-জৈষ্ঠ্যের প্রচণ্ড গরমে এক ফোঁটা জল না পেয়ে
মৃত্যু বরণ করেছে। জননীর মমতায় যদি কন্যাকে জল দিয়ে দেন পাষণ্ড পিতা মৃত প্রায়
শিশুকন্যাকে বন্ধ করে রাখেন ঘরের মধ্যে, পরের দিন হতভাগ্য
শিশুকন্যাটির মৃতদেহ বের করা হয় বদ্ধ ঘরের অন্তরাল থেকে। বৈধব্যের
এই নিষ্ঠুরতা কোমল প্রাণ বিদ্যাসাগরকে আঘাত করে প্রবল ভাবে।
বিধবাবিবাহ প্রচলনের জন্য
হিন্দু নিষ্ঠুর সমাজপতিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তখনকার ওই জঘন্য পঙ্কিল সমাজে সমাজপতিদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে
বিধবাবিবাহ আইন প্রচলন করা বড় সহজ পন্থা ছিল না। বিদ্যাসাগর বহু যুক্তি তর্ক খাড়া
করে প্রায় তাঁর কর্ম সিদ্ধ করে এনেছিলেন তবুও তা দৃঢ় করতে তৎকালীন গভর্নর লর্ড ডালহৌসির
সাহায্যে আইন করে বিধবাবিবাহ আইন প্রচলন করেন। করেন বাল্যবিবাহ রোধ, বিবাহ নামক কারাগারের পরিবর্তে নারীর হাতে তুলে দেন বইখাতা। শিক্ষার
আলোকে নিয়ে এসে নারীকে মুক্তি দেন অসীম আকাশের নীচে। যে নারী
খোলা উঠোনে বা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকতে পারত না, এমনকি জানলায় দাঁড়ানো নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়ত সেই নারীরা বইখাতা হাতে দলে
দলে স্কুলে যেতে আরম্ভ করল।
কলকাতায় প্রথম মহিলা স্কুল
প্রতিষ্ঠা করেন ড্রিংক ওয়াটার বেথুনের সহায়তায় বেথুন স্কুল। গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে বেথুনের সহায়তায় বিদ্যাসাগর প্রায় কুড়িটি মডেল স্কুল
মেয়েদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন। বহুবিবাহ নামক এক প্রথা যা
কুলীন ব্রাহ্মণদের এক ব্যাবসা বলা চলে সেই নারকীয় বহুবিবাহ প্রথাকে বন্ধ করে এক যুগান্তকারী আলোড়নের সৃষ্টি করে বাংলার সমাজ ব্যবস্থার সম্পূর্ণ রূপ
পরিবর্তন করেন বিদ্যাসাগর। আজকের নারী যে জায়গায় এসেছে তার প্রথম দরজাটা খুলেছিলেন
বিদ্যাসাগর। নারীমুক্তির জনক বিদ্যাসাগর প্রত্যেক নারীর কাছে ঈশ্বর।
~~০০~~

No comments:
Post a Comment