প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

তূয়া নূর সংখ্যা | জিরাফের গলা

বাতায়ন/ তূয়া নূর সংখ্যা/ সম্পাদকীয়/ ৩য় বর্ষ/ ৪০ তম সংখ্যা/ ২৪শে মাঘ,   ১৪৩২ তূয়া নূর সংখ্যা | সম্পাদকীয়   জিরাফের গলা "সম্পূর্ণ ভাবে ...

Friday, February 6, 2026

মুহূর্ত কথা | অদিতি চ্যাটার্জি

বাতায়ন/তূয়া নূর সংখ্যা/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া নূর সংখ্যা | ছোটগল্প
অদিতি চ্যাটার্জি
 
মুহূর্ত কথা

"মনের সামান্য ভাল লাগাও তো ভাগ করে নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল গৌতমের সাথেবরং ওরা নিজেদের চারপাশে ভিড় জমা করে যাচ্ছিল। সম্পর্কটাকে কি আরো একবার সুযোগ দেওয়া যায়! ভাবতে থাকে মিশা।"

 
শনি-রবিবার এই দুই ছুটির দিনে বিকেলে মিশা বাড়িতে থাকে না, বলা ভাল থাকতে ভালবাসে না। আজ ও ঠিক করেছে ট্রাম ডিপো থেকে বাসে করে সোজা চলে যাবে বাসন্তী দেবী কলেজের সামনে। ফুটপাতে জামা-কাপড়, কানের দুলের পসরা দেখবে মন দিয়ে। চাইলে ফ্লাই ওভারের নিচে দাঁড়িয়ে থেকে দেখবে দাবা খেলার খেলুড়িদের, যারা শহরের ক্যাকফোনিতেও বিচলিত না হয়ে নিজেদের ঘরের দিকে মন দিয়ে রাখেন অদ্ভুত সংযমে। চেষ্টা করে দেখবে নাকি মিশা একবার এই সংযমটা শেখার! চেষ্টা করে দেখলে হয়।
 
বিকেল সাড়ে পাঁচটা গড়িয়াহাট ক্রসিং নিয়ন আলোর গয়নায় সাজা এক সুন্দরী রমণী। মাঘ মাস আসছে সামনেই, বিখ্যাত সব শাড়ির দোকানে কী ভিড়! কাচের দরজার ওপার থেকে দেখা যায় গোলাপি রঙের বেনারসি গায়ে ফেলা এক তরুণী, পরম মমতায় হাত বোলাচ্ছে শাড়িটার গায়ে, কিন্তু মিশার কেন মনে হচ্ছে ও শাড়িতে না নিজের নতুন কোনো স্বপ্নের গায়ে আঙুল রাখছে। চোখটা কড়কড় করে আসে তাড়াতাড়ি সরে আসে ফুটপাতে ব্যাগের দোকানটার সামনে। একটা বটুয়া ওকে কিনতেই হবে এখুনি।
 
বহুদিন মিশা কোনো বই কেনেনি নিজের জন্য, একটু ইচ্ছা করল গোলপার্কের দিকে হাঁটার, কলকাতায় তো শীত খুব একটা পরে না, আজকাল খুব ঠান্ডা পড়েছে তাই সবাই কী সুন্দর সোয়েটার টুপিতে সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মিশা মনে করতে পারে না ওর ছোটবেলায় মা, কাকিমারা এত সুন্দর সোয়েটার পরেছেন, হুডি তো ওর বড় প্রিয়। ইদানীং মা-ও পরেন, ভালবেসেই পরেন। ভিড়টাকে দুহাত দিয়ে কাটাতে কাটাতে মিশা এগিয়ে চলল পুরোনো বই-র দোকানের দিকে, এই সময় নিজেকে ওর দক্ষ সাঁতারু মনে হয়। ফিক করে একটু হেসে নেয় ও। বই-র দোকানের কাছে আসতেই চোখে পড়ল সেই বিখ্যাত রোলের দোকানটা। মুচমুচে রোলের ভেতরে আলুর পুর, পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা, লেবু দেওয়া। আহ! ভাবতেই মুখের ভেতরটা লালা-সিক্ত হয়ে গেছে, টের পায় মিশা। নাহ্‌ আজ খাব না, সামনের রবিবার রাইদের সাথে বেরোনোর কথা আছে, সেদিন আসব রোল খেতে মনে মনে ঠিক করে নেয় মিশা। বরং ঠান্ডাটা বেশ লাগছে একটা কড়া কফির জন্য প্রাণটা আকুল হয়ে গেল! সামনে একটা ছোট ক্যাফের দিকে পা বাড়ায় মিশা।
 
গোলপার্ক-গড়িয়াহাট আগে রোলের জন্য পরিচিত ছিল এখন হয়েছে ক্যাফে, কফিতে চুমুক দিতে দিতে ভাবে ও। স্যান্ডউইচে কামড় দিতে গিয়ে খেয়াল হয় ওর সামনে যে যুগলে বসে আছে তাঁরা কী রকম এক মনে ফোন দেখে যাচ্ছে! আচ্ছা ওরা কি বিবাহিত? বোঝা যায় না। গৌতম আর মিশা যখন চুটিয়ে প্রেম করত সেই সময় ওদের কথা আর শেষ হত না, দেখা করে বাড়িতে গিয়েও কথা শুরু হত। চার বছরের বিবাহিত জীবনে ছুটির দিন ছাড়া বাকি দিনগুলোতে রাত আটটার জন্য অপেক্ষায় থাকত মিশা, না ভুল বলল গৌতমও অপেক্ষা করত, দুজনের কাজের পর আড্ডা শুরু হবে বলে। ছুটির দিনে কখনও চলে আসত কুমকুমরা ওদের দু কামরার ছিমছাম ফ্ল্যাটে, কখনো ওরা চলে যেত রাজাদের বাড়িতে। এখন তো রাজা কুমকুম এই নামগুলোকে আর মিশার ভাল লাগে না গৌতম! এখন মিশা তাঁর নিজের পৃথিবীটা আলাদা করে নিয়েছে। যেখানে গৌতম সরকারের কোনো জায়গা নেই। এক চুমুকে কফিটা শেষ করে গোগ্রাসে খায় স্যান্ডউইচ। বাড়ি ফিরতে হবে, নিজের ঘরটা কাজের জায়গা, আদখেচরা ডিজাইনটা দু'হাত দিয়ে ডাকছে। একদম ভাল লাগছে না আর এখানে।
 
একরাশ বিরক্তি নিয়ে কালীঘাট থেকে মেট্রোতে ওঠে ও, আজ শনিবার ভিড়টাও হয়েছে তেমন! কোনো মতে দাঁড়ানোর জায়গাটা পায়। সামনেই দাঁড়িয়েছে এক যুগল! উফ ছেলেটা কী বকতে পারে! কী এত বলছে কান রাখতে গিয়ে শোনে, বক্তিয়ার তার সঙ্গিনীকে বোঝাচ্ছেন তথ্য দিয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে কী নেই। মাথাটা গরম হয়ে যায় মিশার। মেয়েটাকে দ্যাখো গোটা দুনিয়া ভুলে এক দৃষ্টে মুখের দিকে তাকিয়ে আছে! ভাল লাগছে এইসব ফালতু কথা শুনতে! এটা ভাবতে ভাবতেই রবীন্দ্র সরোবরে চলে গেল। মিশা নামবে টালিগঞ্জে। ছেলেটাকে বলে,
-টালিগঞ্জে নামবেন?
-না।
একটু সরে যায় সেই বক্তিয়ার। মিশা এগিয়ে যায় গেটের কাছে। সঙ্গিনী মেয়েটাও গেটের দিকে ঘুরতে ঘুরতে একবার ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলে,
-সাবধানে যাস।
মিশা শোনে ছেলেটা বলছে,
-এটাই শুনতে চাইছিলাম।
চমকে ওঠে মিশা, মানেটা কী! এ তো অবান্তর  কথা, জ্ঞান দানের আড়ালে অপেক্ষায় ছিল ছোট্ট একটা সাধারণ কথা শোনার জন্য, তাও সেটা স্পষ্ট করে বন্ধুকে বলে দিল! ট্রেন আসতে আসতে প্ল্যাটফর্ম ছোঁয়। অন্যমনস্কের মতো নেমে পড়ে মিশা, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে থাকে দুজনকে। দরজাটা বন্ধ হওয়া অবধি ভিড় উপেক্ষা করে ওরা তাকিয়ে থাকে দুজনের দিকে আর মিশাও বেহায়ার মতো দেখে যায় ওদের।
 
মিশা ভাবতে থাকে এত পরিষ্কার করে কবে ও নিজে গৌতমের দিকে তাকিয়েছে? অবান্তর কথা, মনের সামান্য ভাল লাগাও তো ভাগ করে নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল গৌতমের সাথে, বরং ওরা নিজেদের চারপাশে ভিড় জমা করে যাচ্ছিল। সম্পর্কটাকে কি আরো একবার সুযোগ দেওয়া যায়! ভাবতে থাকে মিশা।
 
~~০০~~

No comments:

Post a Comment

সূর্যাস্ত গঙ্গার বুকে


Popular Top 10 (Last 7 days)