প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

তূয়া নূর সংখ্যা | জিরাফের গলা

বাতায়ন/ তূয়া নূর সংখ্যা/ সম্পাদকীয়/ ৩য় বর্ষ/ ৪০ তম সংখ্যা/ ২৪শে মাঘ,   ১৪৩২ তূয়া নূর সংখ্যা | সম্পাদকীয়   জিরাফের গলা "সম্পূর্ণ ভাবে ...

Friday, February 6, 2026

কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতার প্রতি বিনম্র আলোকপাত | হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়

বাতায়ন/তূয়া নূর সংখ্যা/প্রবন্ধ/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া নূর সংখ্যা | প্রবন্ধ
হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়
 
কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতার প্রতি বিনম্র আলোকপাত

"সত্যি তো যে দিকে তাকানো হয় শুধুই শামুখমানুষ কোথায়সত্যি রক্ত গরম হয়ে যায়... বিরাট গণতন্ত্রের এই দেশে কোথায় গণতন্ত্র আজ?"

 
শঙ্খ ঘোষ বাংলা কবিতার জ্যোতিষ্ক
ছিল নেই মাত্র এই,... আর সব ধ্যান ধান নষ্ট হয়ে যায়...
 
এভাবে শুরু করা যেতে পারে এই রচনা কেননা ...ছিল নেই মাত্র এই... শুধু এই কথাটুকুর মধ্যে কত কিছু যেন বলা আছে, কবিতা আমাদের সংহত হতে শেখায়। কবিতা কী, কবিতা কেন? এরকম অজস্র প্রশ্নের মাঝখানে দাঁডিয়ে বলা যেতে পারে নির্মাণে অচল বহুরৈখিক সচেতন প্রযাস, কেউ কেউ বলে চলেছেন কবিতাকে সাবজেক্টিভ থেকে অবজেক্টিভ করার কথা...কেউ কেউ আবার বলছে, art for art’s sake… কবিতা শুধু কবিতার জন্যেইঅন্যদিকে পরীক্ষানিরীক্ষাও চলছে সেখানে অজস্র বিশেষ্যকে ক্রিয়াপদীয করণের ঝুঁকি নেওয়ার সাহস দেখাচ্ছেন, নগরাযন শিল্পাযন ক্যানোনাযন সংকরায়ন ইত্যাদি টার্ম ব্যবহার হচ্ছে, হোক না তাতে কী? তাহলে প্রশ্ন একটাই কবি কি বাস্তব থেকে মুখ ঘুরিযে থাকবেন?
 
শঙ্খ ঘোষের উপরোক্ত কবিতাটি যতই ফিলজফিক্যাল হোক না কেন তিনি বাস্তবকে ফেলে দিতে পারেননি, গর্জে উঠেছে তার কলম সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছবি, না বলা কথা ঝাঁপিযে পড়ে তার কবিতার মধ্যে
 
হিমালয়ে গেঁথে থাকে তিন খন্ড ত্রিশূলের মুখ... শামুখ, শামুখ শুধু দেশজোড়া শামুখ শামুখ... ইযে তো পহেলা ঝাঁকি হ্যা... / হাওয়ায় হাওয়ায় ঝাঁকি... অক্ষরে অক্ষরে জাগুয়ার / স্বপ্নের ভারতবর্ষ স্বপ্নের ভেতরে অন্ধকার...
ছয় ডিসেম্বরের ছবি, দাঙ্গার ছবি মনে চলে আসে, উল্লাসে বলা সেই কথা যেন মূর্ত হয়ে ওঠে কবিতাজুড়ে শামুখ... শামুখ... সত্যি তো যে দিকে তাকানো হয় শুধুই শামুখ, মানুষ কোথায়? সত্যি রক্ত গরম হয়ে যায়... বিরাট গণতন্ত্রের এই দেশে কোথায় গণতন্ত্র আজ? সেখানে কবিতার জ্ঞানগর্ভ হাইপারলিঙ্ক কিংবা ডিসকোর্সের ডিকনস্ট্রাকসান অথবা অবিনির্মাণ সব একাকার হয়ে যায়... ছিন্ন হাত, ছিন্ন শরীরের অংশ, ছিন্নমাথা পড়ে থাকে যেন সর্বনাশ হয়ে...
 
পঞ্চাশের এই কবিই লিখছেন এক জাযগায়
...নারায়ণ নয়, আমি পেয়ে গেছি নারাযণী সেনা / যতদূর যেতে বলি যায় এরা, কখনো আসে না / ...
ভাবলেশহীন ধ্বংস হাতে ছুটে যায় / যদি বলি দিন এরা বলে দেয় দিন / যদি বলি রাত বলে রাত... শাসকের এই দম্ভ, এই বিবেককে পদদলিত করার হুঙ্কার ছেযে ফেলে সারাটা দেশ, মাস্তানবাহিনীর ছবি ফুটে ওঠে... যেখানে আমিই শেষ কথা... আমিই আসমুদ্র হিমাচল...
 
ছুরি বা কালো গগলস পরিহিত কযেকজনকে পাঠক দেখতে পাচ্ছেন, এই অন্ধ প্রভুত্ব... এই সব অনুগত ক্রীতদাসের দল এমন কিছু নেই যে করতে পারেনা তখন... শঙ্খ ঘোষ একাধারে কবি একাধারে প্রাবন্ধিক একাধারে চিন্তক, সেরার সেরা বাঙালি তিনি।
 
জীবন অন্তবিহীন সহস্ৰ মুখে বয়ে চলেছে তিনি এক জায়গায় লিখছেন,
...তুমি কি কবিতা পড়ো?
তুমি কি আমার কথা বোঝো?
ঘরের ভিতরে তুমি?
বাইরে একা বসে আছো রকে
কঠিন লেগেছে বড়ো? চেয়েছিলে আরো সোজাসুজি?
আমি যে তোমাকে পড়ি আমি যে তোমার কথা বুঝি।
 
পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ / শঙ্খ ঘোষ
 
পাঠকের একটা আগ্রহ জাগিয়ে রাখা, যেটাকে বলা যেতে পারে তৈরি হওয়াকবিতা কখনো কখনো অর্থ ছবিকে দেখিয়ে দেয়, কখনো দেয় না। কখনো আবার লুকিয়ে রেখে দেয় মনের গভীরে কোনও অদৃশ্যমান সিন্দুকে।
অবশ্যই তা খুলে যাবে একদিন।
 
...যে দূর দূরত্ব নয় তার কোরকের থেকে দেখি / আমাদের মোহগুলি সঞ্চিত অধীর অন্ধকারে / বীজ হয়ে বেঁচে থাকে / উৎসবে ব্যসনে দুখে শোকে / এ যদি না সত্য তবে কাকে আর সত্য বলে লোকে / ...
 
শঙ্খ ঘোষ
 
কথক বদলে যায় ঘটনা বদলায় না। কেননা বেশির ভাগ মানুষের ধারণা, যাদের কাছে নিজের মতই হলো শেষ কথা। আসলে ক্ষমতার সীমা ‌যখন বাড়তে থাকে তখনই শুরু হয় এই খেলা। সংবাদপত্রগুলো আমাদের যে সব খবর পরিবেশন করে তা থেকেও তার হাতে উঠে এসেছে কবিতা। নিষ্ঠুর, অধিকতর নিষ্ঠুর ঘটনা
...এই দেশে আমাদের জন্ম দিয়েছিলে বলে যেন কোনো দুঃখ কোরো না কখনো। ভেবে দেখো, আজ থেকে / একশ বছর আগে কোনো এক রাগী যুবা কবি / গল্প শেষে চিতার আগুন পাশে সাজিয়ে 'এবার বিশ হাজার টাকা পণ হাতে হাতে আদায়' লিখেই / ভেবেছিল মোক্ষম চাবুক। কারোই কাঁপেনি বুক / সেই থেকে বুকে হেঁটে এত দূরে এসেছি এখানে / আমরা তিন বোন আজ তোমার মুখের দিকে চেয়ে / চোখের পাথর দেখে বুঝে গেছি জীবনের মানে / হাতে তুলে দিই তাই তিন মুন্ড যৌতুকের মতো / আর যারা বর হয়ে দাঁড়াবে এ সামিয়ানাতলে / শেষের তর্পণে এসে নিজে তুমি তাদের হাঁ মুখে / শরীরের খন্ডগুলি গুঁজে দিয়ে বোলো / খা খা...' / আমাদের কথা ভেবে বিলাপ কোরো না তার ওপরে।...
 
তর্পণ / শঙ্খ ঘোষ
 
এই হলেন শঙ্খ ঘোষ। আমাদের অস্তিত্বকে এক নিমেষে, এক ঝটকায় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে পারেন এক নিমেষে। ডান বাম উচ্চ নীচ খুন ধর্ষণ জখম শাসক শোষিত রাজনীতি আদমসুমারি নারী পুরুষ সাদা কালো
একটাই প্রশ্ন... তুমি কোন দলে?...
 
কাজেই একথা বুঝতে পেরে গেছি নিশ্চয়কবিতার কোনো সংজ্ঞা হয় না। শব্দ অক্ষর দিয়ে হয়তো কবিতাকে গাঁথা হয় ঠিকই চিত্রকল্প উপমার মোড়কে তাকে সাজানো হয় ঠিক ছন্দ মাত্রা অনুপ্রাস উৎপ্রেক্ষা যমক ব্যবহার অব্যবহারের দোলা কাটিয়ে কবিতা আসলেই এগিয়ে চলে আপন খেয়ালে। যাকে বলা যেতে পারে: Spontaneous overflow of powerful feelings… কবি শঙ্খ ঘোষের প্রতিটি কবিতায় তার ছত্রে ছত্রে প্রমাণ পাওয়া যায়। তাই তাকে নির্দ্বিধায় বলা যায় তিনি কবিদের কবি।
 
আদিমলতাগুল্মময়... নামক কাব্যে তিনি যথার্থভাবেই বলেছেন, ...মানুষ তবুও তার ভালবাসা রেখে গেছে পায়ে... আজ থেকে… প্রায় আটচল্লিশ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল এই কাব্য।
ভালবাসার কথা যখন এলই তখন তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতার কথা মনে পড়ে। কবিতার নামটিও অসাধারণ। মালা ও পুনম
একটু পড়া যাক...
তোমার স্বাচ্ছন্দ্য দেখি দূর থেকে! রঞ্জনেরা খুন হলে তুমি বলো 'মরেনি ও আমার ভিতরে বেঁচে আছে / কাজের ভিতরে আছে, ধুলোর ভিতরে, পায়ে পায়ে।' লোকে বলে এ শুধু প্রতীক, জীবন জানেনি যারা, তারা বলে / কখনো দেখেনি তারা মালা বা পুনম? / তোমাকে দেখেনি কেউ? সেদিন বিকেলে / মাথা ধরেছিলো বলে / পৃথিবী অসার মনে হয়েছিল? দেখেনি কি সমস্ত ভারত আজ রক্তকরবীর ফুলে ভরে দেয় মালা বা পুনম?
 
তোমার স্বাচ্ছন্দ্য দেখি দূর থেকে
তোমার দর্প ও দেখি দূর থেকে
যে জল তোমার চোখে ছিল না কখনো আমি সেই জল ভরে রাখি ঘটে...
 
খুব অল্প পরিসরে কবিকে ধরা বাতুলতা মাত্র নিশ্চয়ই আবার সুযোগ পাব তাঁকে কেন্দ্র করে পুর্ণাঙ্গ আলোচনার
আধুনিক বাংলা কবিতার এই মহান পুরুষকে শতকোটি প্রণাম জানিযে শেষ করছি মেঘ ও বর্ষার এই সংকলন হেমন্ত শীতের এই ধারাভাষ্য... প্রতিবাদ ও ভালবাসার কবি শঙ্খ ঘোষের আলেখ্য। তার প্রতিটি রচনায় পাঠক হিসেবে আমরা খুঁজে পাই আমাদের শিকড়ের। আমাদের চিরকালীন অস্তিত্বকে।
 
~~০০~~

No comments:

Post a Comment

সূর্যাস্ত গঙ্গার বুকে


Popular Top 10 (Last 7 days)