বাতায়ন/তূয়া
নূর সংখ্যা/পর্যালোচনা/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া
নূর সংখ্যা | পর্যালোচনা
কবিতা— স্বপ্ননদী
কবি— শুভ্রকান্তি
মজুমদার
পর্যালোচক— প্রদীপ কুমার দে
"নদীর প্রবাহের সাথে জীবনের আবেগ, প্রাপ্তি এবং বিচ্ছেদের যে তুলনা কবি করেছেন, তা সত্যিই হৃদয়স্পর্শী। বিষণ্ণতার ছবি দিয়ে খুব সুন্দর কাব্য।"
[কবিকে না-জেনে শুধু কবিতার শরীর ও শিরোনামের ভিত্তিতে এই পর্যালোচনা]
আপন খেয়ালে, নদীর কাছে বসে থাকতাম বলে
নদী
আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, দিয়েছিল যাবতীয় সুখ
তারপর
সব সুখ শেষ হয়ে গেলে
নদী তার
নিজের পথ ধরে চলে গিয়েছিল।
হয়েছিল
পরাঙ্মুখ
আমার সমস্ত রং এখন ফিকে
নদী এখন
আর ফিরেও তাকায় না
অনেক
ডেকেছি তাকে বারংবার…
সে
বলেছে, এমন নাকি হয় আকছার
অনেক
পেয়েছে সে, আর কিছু চায় না
একবার
ফিরে গেলে নাকি, আর আসা যায় না!
নদী যে
পথ ধরে চলে গিয়েছিল
এখন আমি
সেই পথে তাকিয়ে থাকি…
ভাবি, যদি কিছু আরো থাকে বাকি
স্বপ্নের
নদী ফিরে গেছে তার কাছে
আসলে সে
ছিল যার কাছে বেঁচে।
প্রথমেই স্বীকার করে জানাই
কবিতাটিকে নিয়ে আমার মনের কথা প্রকাশের বড় সুবিধা এই যে যখন আমি জানি না কবির নাম
বা পরিচয়, তখন আমার ক্ষদ্র বুদ্ধি
প্রয়োগ করার এই বুঝি-বা এক বিরাট সুবিধা।
'স্বপ্ননদী' কবিতাটি পড়ে
আত্মচিন্তার গভীরে ডুব দিলাম মণিমুক্তার খোঁজে যদি কিছু পাই, আশায় নিরাশ হলাম না যখন কাব্যটির এক অনন্য মনন আমাকে
আচ্ছন্ন করে দিল, কলম তুলে নিলাম আমার
সামান্য ক্ষমতার বাহাদুরি করতেই।
নদীর প্রবাহের সাথে জীবনের
আবেগ, প্রাপ্তি এবং বিচ্ছেদের যে
তুলনা কবি করেছেন, তা সত্যিই
হৃদয়স্পর্শী। বিষণ্ণতার ছবি দিয়ে খুব সুন্দর কাব্য।
কবিতাটিতে কয়েকটি দিক খুব
স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যা আমার ভাষায়...
‘নদী তার নিজের পথ ধরে চলে গিয়েছিল’—এই পঙ্ক্তিটি জীবনের এক অমোঘ সত্য। সময় বা মানুষ যখন চলে যায়, তখন তারা নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে চলে। শুরুতে ভালবাসার রূপকে
এই নদীর যে অকৃপণ দান এবং সুখে ভাসিয়ে নেওয়া—তা জীবনের সেই সুন্দর সময়ের কথা মনে
করিয়ে দেয় যখন সবকিছু নিজের অনুকূলে থাকে।
এটাই আমাদের মোহ!
‘এমন নাকি হয় আকছার’—এই উদাসীনতাটুকু যন্ত্রণাকে আরও গভীর করে
তোলে।
‘বারংবার’ ডাকার পরেও যখন উত্তর মেলে না, তখন সেই শূন্যতা খুব ভারী হয়ে ওঠে। এসব আমাদের অসহায় মনের
কথা!
‘স্বপ্নের নদী ফিরে গেছে তার কাছে / আসলে সে ছিল
যার কাছে বেঁচে’—এই পঙ্ক্তিগুলো
বুঝিয়ে দেয় যে আমরা যা নিজের ভাবি,
তা হয়তো
সবসময় আমাদের ছিলই না; তার গন্তব্য বা
অস্তিত্ব অন্য কোথাও নিহিত ছিল। সব মিলিয়ে কবির শব্দচয়ন এবং ছন্দের বিন্যাস বেশ
সহজ অথচ গভীর। বিশেষ করে ‘পরাঙ্মুখ’ এবং ‘আকছার’ শব্দগুলোর ব্যবহার কবিতায় একটি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
কবি কি এই কবিতাটি কোনো বিশেষ
অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে লিখেছেন,
‘আমার সমস্ত রং এখন ফিকে’
নাকি এটি নিছকই একটি কাল্পনিক
অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ?
শেষের দুটি লাইন চমৎকার, এটা আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি।
আর একটা বন্ধু কবি লিখলেন,
ReplyDeleteশুভ্রকান্তি মজুমদারের ‘স্বপ্ননদী’ কবিতাটি সরল ভাষায় গভীর বিষণ্ণতা ও জীবনানুভূতি তুলে ধরে। নদীর প্রবাহকে প্রিয় মুহূর্ত, প্রাপ্তি এবং বিচ্ছেদের রূপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা পাঠককে স্বপ্ন, আশা এবং শূন্যতার অনুভূতিতে নিয়ে যায়।
পর্যালোচক প্রদীপ কুমার দে ঠিক বলেছেন, কবিতার শক্তি সহজ শব্দ চয়ন, ছন্দ ও রূপকের সুনিপুণ ব্যবহারে। "নদী তার নিজের পথ ধরে চলে গিয়েছিল" বা "স্বপ্নের নদী ফিরে গেছে তার কাছে" মতো লাইন গুলো জীবনের অমোঘ সত্যকে স্পর্শ করে। বিষণ্ণতা, শূন্যতার অনুভূতি এবং সময়ের অপ্রত্যাশিত গতির চিত্র খুবই স্পষ্ট।
সংক্ষেপে, এটি জীবনের অপ্রত্যাশিত বিচ্ছেদ এবং স্মৃতির প্রতি নীরব শ্রদ্ধাকে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলা এক মননশীল কাব্য।