প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Sunday, March 8, 2026

বন টিয়ে | সঙ্ঘমিত্রা দাস

বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪৪তম সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি | ছোটগল্প
সঙ্ঘমিত্রা দাস
 
বন টিয়ে

"অতিথি সেদিন সৌভাগ্য সাথে করে নিয়ে এসেছিল ওর জন্য। এত বছর পরেও মাঝে মধ্যেই ছাদে গেলে দূর পুব আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে কাজল ওর সেই ছোট্ট বন টিয়েকে দেখার আশায়কিন্তু সে আর ফেরে না।"

 
কাজল সেনগুপ্ত আর পাঁচটা সাধারণ বাঙালি ছেলের মতো স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী কম্পিউটারের দুটো ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহারে পারদর্শী বছর ছাব্বিশের যুবক। তবুও সে আজ বেকার। যার স্বপ্ন ছিল অনেক কিন্তু এই চাকরির বাজারে বারবার হতাশ হয়েছে। তবু ভরসা ছাড়েনি। এক বুক আশা নিয়ে ভোরের সূর্যকে প্রণাম জানিয়ে রোজ বেরিয়ে পড়ে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষা কিংবা ওয়াক-ইন-ইন্টারভিউ দিতে। যে কোন সম্মানজনক চাকরি করতেই সে প্রস্তুত। বাবার আর এক বছর চাকরি আছে তারপর সংসারের দায়িত্ব তো তারই নেওয়া উচিত। তাই প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। সমাজের কটু কথা, প্রশ্ন বিব্রত করে বটে, তাই হয়তো আগের মতো আর মিশতে ইচ্ছে করে না, ঘরে পড়াশোনা নিয়ে আর বাইরে চাকরির চেষ্টায় বয়ে যাচ্ছে সময়। বিয়ে, অন্নপ্রাশন বা অন্য কোন আনন্দ অনুষ্ঠানে যাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। ঘরে মায়ের কাছে দুটো কথা বলে একটু শান্তি পায়। ভরসা জোগায় মা প্রতিদিন ওকে। ওর সবচেয়ে বড় শক্তি তিনি। সেই মায়ের মুখের হাসি ধরে রাখতে পরিশ্রমের কোন খামতি রাখে না কাজল। বন্ধুদের কেউ কেউ চাকরি পেয়ে দূরত্ব তৈরি করেছে, যারা এখনো ওর মতো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে সবাই কেমন গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে। বড় হবার সাথে সাথে সবটা কেমন বদলে গেছে চারদিকে।
আজও সকাল বেলায় ফাইল হাতে বেরিয়েছিল একটা ওয়াক-ইন-ইন্টারভিউ দিতে। এখন বেলা গড়িয়ে দুপুর। মাথার ওপর সূর্যটা আগুন ছড়িচ্ছে যেন। চা-বিস্কিট আর একটু ভেজানো ছোলা খেয়ে সেই যে সাতসকালে বেরিয়েছিল তারপর আর খাওয়া জোটেনি। ইন্টারভিউটাও বিশেষ জমল না। প্রফেশনাল প্রশ্নোত্তর পর্ব বেশ ভালই দিয়েছিল কিন্তু এইচ-আরের কায়দা মার্কা কথায় গেল ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে। নাইট শিফ্টে না করা যাবে না, এক্সট্রা টাইম কাজ করতে হবে জীবনে উন্নতি করতে গেলে কঠোর পরিশ্রম দরকার, এসব ট্যানস ট্যানস কথার উত্তর না দিলেই চুকে যেত কিন্তু ওই যে বেকার থাকলে সবার এক জ্ঞান দেবার প্রবতা। শুনে শুনে কান একেবারে পচে গেছে। এখানেও সেই এক কথায় আর নিজেকে সামলাতে পারেনি। তবে খুব যে কটু কথা বলে ফেলেছে তা তো নয়চাকরিটা দিন, দেখুন কাজের ব্যাপারে কোন অভিযোগ থাকে কি না? আগেই এসব শুনে আর কী করব বলুন’ ব্যস এটুকুই বলেছে।
মেট্রোর পাশে বাঁধানো জায়গাটায় বসে ব্যাগ থেকে জল বের করতে মনে পড়ল মা তো টিফিন দিয়েছিল। খুলে দেখল একটা স্যান্ডউইচ আর লাড্ডু রয়েছে। সত্যি মায়েরা কিছুতেই বদলায় না। ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছে লাড্ডুটা তো না দিলেও পারত। তা নয় ছেলেকে সব খাবারের পরে মিষ্টি মুখ করাতেই হবে। কিন্তু তাই বলে লাড্ডু। এই চাকরিটাও বোধহয় হল না, ওর ভাগ্যে লাড্ডুই আছে।
টিফিন খেতে খেতেই খেয়াল পড়ল বড় কালভার্টের পাশে সবুজ রঙের একটা পাখি চুপটি করে বসে আছে। অনেকটা টিয়াপাখির মতো দেখতে তবে ওর দেখা টিয়াপাখির মতো নয়, বেশ মোটাসোটা কিন্তু ছোট সাইজে। একদম চুপটি করে কোণা ঘেঁসে বসেছে, দেখে প্রথমে মাটির পুতুল মনে হয়েছিল কিন্তু চোখটা এদিক-ওদিক ঘুরছে, ভয় পাচ্ছে হয়তো পথের কুকুরগুলোকে দেখে। কাজল কাছে গিয়ে ধরার চেষ্টা করল, মনে হল ও কোন অসুবিধায় পড়ে বা আহত হয়ে উড়তে পারছে না। কোলে তুলে নিল পাখিটাকে। পাখিটিও চুপটি করে ওর কোলে বসে রইল, ওড়ার কোন চেষ্টা করল না। এভাবে উড়তে না পারলে সত্যি কুকুরের আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারবে না পাখিটা। কিন্তু বাইরে থেকে আঘাতের কোন চিহ্নও দেখা যাচ্ছে না। কাজল হাতের লাড্ডুর একটু পাখিটার মুখের কাছে ধরল কিন্তু পাখি খেল না কিছু। কী করবে ভেবে পেল না। পাখিটাকে এমন অবস্থায় ওখানেই ফেলে আসতে মন চাইল না। কোন উপায় না পেয়ে কাজল বাড়ি ফিরল পাখি কোলে।
বাড়িতে সোফার ওপর একটা পুরানো কাপড় পেতে বসিয়ে দিল পাখিটিকে। নেট সার্চ করে বের করল এও এক ধরনের বন্য টিয়ে। মা বাবা কাজল সবাই সারাদিন ব্যস্ত রইল সেদিন পাখির যত্নে। ছোলা ভেজানো, বাদাম, জল সবই চেষ্টা হল খাওয়ানোর কিন্তু সে কিছুই খায় না, ওড়ার চেষ্টাও করে না। দু-একবার বমি মতো করল দেখে মায়ের মনে হল হয়তো কিছু উল্টোপাল্টা খেয়ে ফেলেছে পাখিটা, সেই কারণেই ওর এই হাল। এভাবেই কেটে গেল। সন্ধেবেলা ঘরে এনে রাখল পাখিটিকে। ওর গলার ফোলা ভাবটা তখন অনেকটা কমেছে। শরীরটা একটু পাতলা হয়েছে। এখন বেশ সুন্দর একটি পাখির মতো দেখাচ্ছে, একটু জলও খেল বাটি থেকে। অতিথির কষ্টের কারণ খুঁজে না পেলেও তার যত্নের কোন খামতি রাখল না ওরা। কাজল রাতে ঘরে ওকে রেখে দরজা, জানলা বন্ধ করে দিল। হালকা আলোর নাইট ল্যাম্পটা জ্বালান রইল। ওর অতিথি চুপটি করে বসে রইল সোফার গদিতে। আর পিটপিট করে চারদিকে চাইতে থাকল। কিন্তু এখনো ওড়ার কোন চেষ্টা করল না। কাল সকালে দেখতে হবে ওর শরীর কেমন থাকে, উড়তে পারে কি না? ছোট মিষ্টি অতিথি বন টিয়ের আগমনে সকালের পরীক্ষার বিরক্তি একেবারে ভুলে গেল কাজল।
সকাল হতেই মাকে সঙ্গে নিয়ে ঘরের দরজা খুলল। পাখিটা উড়ছে। একবার আলমারির মাথায় আবার পরক্ষণেই বন্ধ জানলার পাশে উড়ে গিয়ে বসছে। বারবার বন্ধ জানলার কাচে ঠোঁট দিয়ে আঘাত করছে। কাল সম্ভবত কোন খাবার অতিরিক্ত খেয়েই ওর এমন হাল হয়েছিল। আজ সে সম্পূর্ণ সুস্থ। কাজল জানলাটা খুলে দিল। পাখিটি খোলা আকাশ দেখতেই জানলা গলে উড়ে গেল পুব আকাশে। কাজল তাকিয়ে থাকল একদৃষ্টে, যতদূর দেখা যায় চেয়ে রইল। হাত নেড়ে বিদায় জানাল। পাখি ফিরেও তাকাল না, একটা সময় পাখিটা চোখের আড়ালে চলে গেল। কাজল প্রার্থনা করল আবার যেন কোন একদিন ক্ষণিকের জন্য হলেও সে অতিথি হয়ে আসে। না আর কোনদিন ফেরেনি ওর ক্ষণিকের অতিথি।
ও হ্যাঁ, একটা কথা তো বলাই হয়নি। কাজল কিন্তু সেদিনের ইন্টারভিউতে পাশ করে গেছিল, এখন সেই কোম্পানিতেই সিনিয়র সুপারভাইজারের পোষ্টে চাকরি করছে। ওর অতিথি সেদিন সৌভাগ্য সাথে করে নিয়ে এসেছিল ওর জন্য। এত বছর পরেও মাঝে মধ্যেই ছাদে গেলে দূর পুব আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে কাজল ওর সেই ছোট্ট বন টিয়েকে দেখার আশায়, কিন্তু সে আর ফেরে না।
 
~~000~~

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)