বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪৪তম
সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি
| ধারাবাহিক গল্প
মমিনুল পথিক
রমিজা
বেওয়া
[১ম পর্ব]
"অতিরিক্ত বিড়ি খাওয়াতে এবং সময়মতো খাবার না খাওয়ায় পেটে আলসার হয়েছে। জরুরিভিত্তিতে অপারেশন না করালে রোগীকে বাঁচানো যাবে না। স্বামীকে বাঁচানোর জন্যে জোসনা বানু পাগল প্রায়।"
(১)
-তোরা মরবার
পাস না। তোরা মরলি মুই বাচোং। খালি খাওয়া খাওয়া করিস। কডে থাকি তোমাক মুই এতগুলা
খাবার দিম। তোমার বাপটা তো মরি যায়া বাঁচি গেল্, এ্যালা মোর হইচে যত জ্বালা। আল্লাহ তুই মোক অহম কর আল্লাহ, মোক অহম কর। ক্যাংকরি এতগুলা ছাওয়া-পোয়াক মুই এ্যালা
বাঁচাম। না খায়া ছাওয়া-পোয়াগুলা মোর শুকি বাতা নাগিল। আল্লাহ্ মোর কপালত তুই এতই
দুক্কু থুছিলু।
এভাবে গগণবিদারী বিলাপ করতে
করতে বুক চাপড়ায় রমিজা বেওয়া। অভাব অনটনের সংসারেই মানুষ ব্রহ্মপুত্র পাড়ের
নদী-সিকস্তি হযরতপুর গ্রামের খবির আলী। ছোটকালেই মা মারা যায় তার। বছর ঘুরতে না
ঘুরতেই বাপ আর একটি বিয়া করে সৎমা ঘরে আনে। কথায় বলে, ‘মা মরলে বাপ হয় তাউই। খবিরের বেলাও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।
মাস খানেক যেতে না যেতেই
স্বামীর কান ভারি করতে থাকে স্ত্রী জরিমন। একদিন রাতের খাবার খেয়ে গালভর্তি
ছাঁচিপান চিবিয়ে পিক ফেলতে ফেলতে বলে,
-এই যে তোমরা শুনছেন ক্যানে খবিরের বাপ, মুই এ্যাকনা তোমাক কথা কবার চাঁং।
-কী কথা কবু ক।
দাঁতের ফাঁকে লেগে থাকা
খাবারগুলো ম্যাচের কাঠি দিয়ে খিলাল করতে করতে বলে হাঁপানি রোগী সগির আলী।
-তোমরা শোনেন
ক্যানে, তোমার বুড়া ছাওয়াটা তো খালি
বসি বসি ভাত গিলবার নাগজে, ক্যান তোমরা অক কোন
কামত নাগাবার পান না?
-আরে তুই
এ্যালা মোক কী কস। অগনা ছোট ছাওয়া কী
কাম করবার পায়?
স্ত্রীর উপর বড় চোখে তাকিয়ে
থাকে।
-তোমার কাছত
অগনা ছোট হবার পায়, মুই তো এ্যালা দেখোঁ, তিন থালি ভাত
একদন্ডতে খায়া ফ্যালে, তাক মুই বোঝো না।
-তুই এখন নিন
যা তো জরিমন। মোক নিন ধরছে। মুই এ্যালা বিহান বেলা উঠি নামাজ খান পড়ি কামত
যাম।
-হ, মুই ভাল্ কতা কইলেই তো তোমার চামত নাগে। তোমরা বাপ-ছাওয়া
মোক পাগলা করি ছাড়বেন।
বকতেই থাকে জরিমন।
-জরিমন, মোর আগ তুলিস না কয়া দিনু। আর একবার যদি মোর খবিরের কতা
কইছিস তাহালে তোক এ্যালা ধরলা পার করিম।
ভয়ে আর কোনো কথা বলেনি জরিমন।
চুপ করে শুধু কুপিটা নিভিয়ে শুয়ে পড়ে।
ভোরে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে
মসজিদ থেকে বেরিয়ে গুনগুন করে জিকির করতে করতে সগির আলী চাটাইয়ের ঘরটির দরজায় এসে
গলা ছাড়িয়ে ডাক দেয়,
-বাবা খবির, খবির আলী, তুই এ্যালাই উঠিসনাই বা।
পোকায় খাওয়া তামাটে দাঁতগুলো
চুলার ছাই দিয়ে মাজতে মাজতে খিঁচিয়ে ওঠে জরিমন,
-ছাওয়ালের জন্যি এ্যাখেবারে দরদ উথলে উঠিল। ক্যান একখান
কঞ্চি দিয়া ডাং দিবার পান না?
-জরিমন তুই
চিল্লাস না। অ খবির তুই এ্যালাই উঠিস না?
আবার ডাকতে থাকে। কাঁচা ঘুমটি
ভেঙে গিয়ে খবির আলী রাগে চেঁচিয়ে ওঠে,
-মোক তোমরা কী কন আব্বা। মুই না এ্যালায় ঘুমানু।
-সারারাত
কুণ্ঠি গেছিলু?
মাথা হতে টুপিটা খুলতে খুলতে
রাগের মাথায় বলে।
-উত্তর পাড়াত
এ্যাকনা ড্রামা দেকপার গেছিনু।
তালি দেওয়া তৈলাক্ত কাঁথাটি
ভাল করে গায়ে জড়িয়ে আবার শুয়ে পড়ে।
-দেখলেন তোমরা, তোমার ছাওয়া নায়ক হইবে।
খেঁকিয়ে ওঠে জরিমন।
-জরিমন, তুই চুপ থাক। ওই খবির ওঠ-রে, উঠবু না। তোক মুই এ্যালা ডাংগাইম। ওই শালার ব্যাটা খবির ওঠ।
বলে একটি লাঠি দিয়ে দরজায়
সজোরে আঘাত করতে থাকে সগির আলী। লাঠির আঘাত শুনে তাড়াতাড়ি উঠে জবুথবু হয়ে দরজা
খুলে দেখে বাপ ভয়ংকর বাঘের মতো দাঁড়িয়ে। হাই তুলতে তুলতে বলে,
-কন, তোমরা মোক কী কইবেন কন।
-তোক মুই কী কম। এ্যালা মোর সাতত চল,
কামত
যাওয়া নাগবি।
লাঠি ফেলে ঘরের দিকে যায়। বাপের
কথা মতো কামলা দিতে যায় খবির আলী।
(২)
বছর-খানেক পর
জরিমনের কোল ভরে একটি ছেলে আসে। সগীর আলীর মাথায় যেন বজ্রপাত হয়। এক কাঠা আবাদি জমি নেই তার। অন্যের জমিতে কামলা দিয়ে কোনো মতে
একবেলা-আধবেলা খেয়ে বেঁচে আছে। তার উপর আবার উটকো ঝামেলা। গেল বছর বাড়ির ভিটেটির
পাঁচ কাঠা জমি বিক্রি করেছে একমাত্র মেয়েটির যৌতুকের টাকা পরিশোধ করার জন্য। জামাই
মেয়েকে রেখে গিয়ে বলেছিল,
-ট্যাকা নিয়ে আসলে মোর বাড়িত উঠবু, নাইলে মোর সাথে তোর হবার নয়, এ্যালা মোর শ্যাষ কথা।
শরীরটা আজ ভাল না থাকায় কামলা
দিতে যায়নি খবির আলী। তবুও বসে নেই সে। মাঠ থেকে বকনা বাছুরটি চড়িয়ে নিয়ে
পাশের ডোবা থেকে গোসল করে এনেছে। সাথে এক বস্তা ঘাসও কেটেছে। বকনা বাছুরটিকে খুব যত্ন করে সে। ওটা তার মায়ের শেষ চিহ্ন। তার জন্ম হওয়ার সময়
তার নানী আদর করে নাতির জন্যে একটা বকনা বাছুর কিনে দিয়েছিল।
সেটাকে বড় করার পর অনেকগুলো গোরু হয়েছিল তাদের। কিন্তু আর
শেষ রক্ষা হয়নি। এক সময় তার বাপের কঠিন ব্যাধি ধরা পড়ে। এক্স-রে করার পর ডাক্তার
বলেছিলেন,
-অতিরিক্ত বিড়ি খাওয়াতে এবং সময়মতো খাবার না খাওয়ায় পেটে
আলসার হয়েছে। জরুরিভিত্তিতে অপারেশন না করালে রোগীকে বাঁচানো যাবে না। স্বামীকে
বাঁচানোর জন্যে জোসনা বানু পাগল প্রায়। কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে মায়ের দেওয়া গোরুর বংশধরগুলো একদিন বাজারে বিক্রি করে। শুধু তার আদরের বকনা বাছুরটি
‘বুড়ি’কে রেখেছিল।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment