বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪৪তম
সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি
| ছোটগল্প
শিউলী
ব্যানার্জী মুখার্জী
ইলিশ
মাছের পাতুরি
"কুহু একটা প্লেটে নিজের হাতে রান্না করে আনা ইলিশ মাছর পাতুরি ঠাকুমার মুখে তুলে নিজে বাকিটুকু যেই মুখে দিয়েছে ঠাকুমার শরীর ঠান্ডা হল। মনে হল শেষ নিঃশ্বাস পড়ল ঠাকুমার।"
রমলাকান্তবাবুর একমাত্র মেয়ে
কুহু। কুহু সেই ছোট্ট বেলা থেকে ঠাকুমার খুব আদরের। ঠাকুমা কাছে থাকলে কুহুর আর
কাউকেই তেমন প্রয়োজন হয় না। কুহু আর কুহুর ঠাকুমা একে অপরের প্রাণের সঙ্গী।
কুহু ঠাকুমার খুব খেয়াল রাখে অন্যদিকে কুহু যখন কলেজে যায় ঠাকুমা ঠিক কুহুর পছন্দ
মতো টিফিন কলেজের ব্যাগে ভরে দেয়,
হাতখরচের
অল্প একটু টাকাপয়সাও কুহুর হাতে দেয়। কুহুর ঠাকুমা যে জিনিসগুলো খেতে ভালবাসে কুহু
ওর বাবাকে দিয়ে সব কিছু কিনে আনায় বাজার থেকে। দাদু যতদিন বেঁচে ছিল ঠাকুমা ভীষণ মাছ মাংস
খেতে ভালবাসত তার মধ্যে ঠাকুমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল ইলিশ মাছের পাতুরি। বাজারে ইলিশ
মাছ যখন খুব বেশি আমদানি হত তখন কুহুর দাদু, ঠাকুমার জন্য প্রায়ই ইলিশ মাছ কিনে আনত। ঠাকুমা-দাদু দুজনেই ইলিশ পাতুরি ভীষণ পছন্দ করত আর ঠাকুমা যত্ন করে রান্নাও করত। কতবার ঠাকুমা কুহুকে কাঁটা
ছাড়িয়ে ইলিশ মাছ খাইয়ে দিয়েছে। কিন্তু গত আট বছর হোল কুহুর দাদু মারা গেছে
ব্রাহ্মণ ঘরের বিধবা তাই ঠাকুমা,
মাছ
মাংস পিঁয়াজ রসুন কিছুই আর খাওয়া তো দূর ছোঁয় না পর্যন্ত। ঠাকুমা শখের কতকিছু বাদ
দিয়ে দিয়েছে দাদু মারা যাবার পর। কুহু ঠাকুমাকে বলে ঠাকুমা এসব কষ্ট কেন কর, ঠাকুমা বলে ব্রাহ্মণ ঘরের বিধবা আমি, স্বামী চলে গেলে আর ওসব খেতে আছে রে। কুহুর কষ্ট হয় ও যেন
ঠাকুমার কথাগুলো মেনে নিতে পারে না। সেবার বড়দিনের সময় বাড়িতে সবাই কেক খেল
যেহেতু কেক ডিম দিয়ে তৈরি ঠাকুমা কিছুতেই তা খেল না। ঠাকুমা দুপুরে একবেলা ভাত ও
রাতে রুটি খায় কোনভাবে দুবেলা ভাত খাওয়া যাবে না এক বসাতেই নিরামিষ ভাতটুকু খায়
শুধু। কুহু দেখে সব, তবে ঠাকুমার জন্য
মাঝে মাঝে সে নিরামিষ রান্না করে দেয়। ঠাকুমার বেশ কিছুদিন ধরে শরীর খুব অসুস্থ
ঠাকুমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কুহু ঠাকুমার মুখ-চোখের অবস্থা
দেখে বুঝল দু-দুবার স্ট্রোক হওয়া
সত্বেও ঠাকুমা রেহায় পেয়েছে এবার আর হয়তো ঠাকুমা বাঁচবে না। ঠাকুমা যে ক্ষণিকের অতিথি। ডাক্তার জবাব দিয়েছে ঘন্টা-খানেক আগেই।
হয়তো ঠাকুমা আর ক্ষণিক সময়ের অতিথি এটা ভেবেই কুহুর মনটা
কেঁদে ওঠে। অস্থির হয়ে কুহু ঠাকুমার বেডের পাশে বসে ঠাকুমার হাতটা বুকের কাছে
চেপে ধরে। কুহু জিজ্ঞাসা করে,
-ও ঠাকুমা কিছু
খেতে ইচ্ছে করছে তুমি বলো-না আমি আনব।
কুহু এই আট বছরে ইলিশ মাছের
পাতুরি খায়নি ঠাকুমা খায় না বলে। ঠাকুমা কুহুকে কাছে ডেকে ইশারা করে খুব
ক্ষীণ গলায় বলে,
-দিদি... ভাই...।
কুহুর মনের শেষ ইচ্ছা ছিল
ঠাকুমা খেলে সে আবার ইলিশ মাছের পাতুরি খাবে। মনের মধ্যে একটা সংকোচ কাজ করছিল তার, তবুও দীর্ঘদিনের বয়ে চলা ব্রাহ্মণ ঘরের একটা কঠোর প্রথাকে
ভেঙে সে সাহস করে বলেই বসে,
-ও… ঠাকুমা
তুমি আজ আমার সাথে একটু ইলিশ মাছের পাতুরি ভাত দিয়ে শেষবারের মতো মুখে দেব গো…
কুহু কাঁদছে ঠাকুমা দেখছে, সেভাবে কিছু বলতে পারছে না। দু চোখে জল। কুহুকে সে
কিছুতেই কষ্ট দিতে চায় না। ক্ষীণ কন্ঠে বলে,
-যা দিদিভাই
নিয়ে আয়, উপরওয়ালার কাছে পরে জবাবদিহি
করব না হয়।
কুহু একটা প্লেটে নিজের হাতে
রান্না করে আনা ইলিশ মাছর পাতুরি ঠাকুমার মুখে তুলে নিজে বাকিটুকু যেই মুখে দিয়েছে
ঠাকুমার শরীর ঠান্ডা হল। মনে হল শেষ নিঃশ্বাস পড়ল ঠাকুমার। কুহুর কষ্ট হচ্ছে তবুও
সে ভাবল ঠাকুমা শুধু মাত্র তাকে ভালবেসে জীবনের শেষ মুহূর্তে দীর্ঘদিনের প্রতিজ্ঞা
ও নিয়ম ভাঙতে পেরেছে। নিঃশব্দে ততক্ষণে কুহুর চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে...
~~000~~

No comments:
Post a Comment