বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/গদ্য/৩য় বর্ষ/৪৪তম সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি
| গদ্য
জয়শ্রী
সরকার
ক্ষণিকের
অতিথি
"আসলে, ক্ষণিকের অতিথি হয়েও আমরা অমরত্বের প্রত্যাশী। একমাত্র সৎকর্মই জীবনকে বরণীয় করে তুলতে পারে। তখন আর বিষাদ সুরে গাইতে হবে না 'দিনগুলো মোর সোনার খাঁচায় রইল না...!'"
'ক্ষণিকের অতিথি'
ছোট্ট
দুটো শব্দ জীবনটাকে যেন দার্শনিক করে তোলে। পুব আকাশে সূর্য ওঠা ভোর দেখে প্রতিদিন ঘুম
ভাঙে আমার। মিষ্টি রোদের স্নিগ্ধ আলো মনকে মাতিয়ে তোলে। বেলা বাড়ার সাথে সাথেই
ক্ষণিকের অতিথির মতো সেও চলে যায়। বেলা শেষে পশ্চিম আকাশ রাঙিয়ে দিয়ে রক্তিম
সূর্যটাও একসময় অস্তমিত হয়। হাজার চেষ্টা করেও সূর্যটাকে ধরে রাখা যায় না। এটাই
প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু, রবীন্দ্রনাথের 'মায়ার খেলা', শরৎচন্দ্রের 'শেষ প্রশ্ন', তারাশঙ্করের 'কবি' উপন্যাসের 'জীবন এত ছোট কেনে!'
ক্ষণিকের
অতিথি হয়েও চিরকালীন হয়ে ওঠে।
১৯৭০-এর ডিসেম্বরের এক কনকনে
ঠান্ডায় ঢাকা থেকে কয়েক ঘন্টার জন্য ক্ষণিকের অতিথির মতোই এসেছিলেন দিদা। পরের
বছর ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হন। দিদার সেই মুখটা আজও ভুলতে পারিনি। কত-না ভালবাসা
জড়িয়ে ছিল। যেন শীর্ণ শীতের শেষে সোহাগী বসন্ত। ক্ষণিকের হলেও চিরস্থায়ী দাগ
রেখে যায়। আমার উদাসী মন গেয়ে ওঠে 'যাওয়া তো নয়
যাওয়া...!'
বাঙালির বহু প্রতীক্ষিত
দুর্গোৎসবে ঘরের মেয়ে দুর্গা কয়েকটা দিনের জন্য আসে বাপের বাড়ি। চলে গেলেও
রেশটা থেকেই যায়। শীতের পর বসন্ত— সেও তো ক্ষণিকের অতিথি। ঊষর মরুভূমির বুকে
মরুদ্যানের মতোই মনের দরজায় কড়া নাড়ে। আনন্দে গুনগুনিয়ে উঠি, 'কিছু ক্ষণ আরো না হয় রহিতে কাছে'। কিন্তু হায়! আবার,
চলেও
যায়। মিলন ছলে যেন বিরহের জরিপ করে যায়। গেয়ে উঠি, 'মরি হায়, চলে যায়/বসন্তের দিন
চলে যায়...!' স্কুলজীবন থেকে বিদায়ের দিনে
বুকটা ভারী হয়ে উঠলেও মধুর স্মৃতিগুলো সারাজীবন থেকে যায়। তাই তো, জন্মান্তরে বিশ্বাসী জীবনানন্দকেও বলতে হয়েছে, 'আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে!' এভাবেই জীবনের নশ্বরতা এবং নতুনের বার্তা শুনিয়ে কবিগুরুও
বলেছেন, 'হারায় যা তা হারায় শুধু
চোখে...!'
আসলে, ক্ষণিকের অতিথি হয়েও আমরা অমরত্বের প্রত্যাশী। একমাত্র
সৎকর্মই জীবনকে বরণীয় করে তুলতে পারে। তখন আর বিষাদ সুরে গাইতে হবে না 'দিনগুলো মোর সোনার খাঁচায় রইল না...!'
~~000~~

No comments:
Post a Comment