প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

ক্ষণিকের অতিথি | আতঙ্কবাদ ও আতঙ্কগ্রস্ত

বাতায়ন / ক্ষণিকের অতিথি /সম্পাদকীয়/ ৩য় বর্ষ/৪৪তম সংখ্যা/২৩শে   ফাল্গুন ,   ১৪৩২ ক্ষণিকের অতিথি  |  সম্পাদকীয়     আতঙ্কবাদ ও আতঙ্কগ্রস্ত ...

Sunday, March 8, 2026

সেদিনের রাতের অতিথি | ডরোথী ভট্টাচার্য

বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪৪তম সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি | ছোটগল্প
ডরোথী ভট্টাচার্য
 
সেদিনের রাতের অতিথি

"ওরা দুজনেই বৌদিকে ধন্যবাদ জানাল। বাইরের ঘরে একটা খাট পাতাই থাকেবিল্টু আর নন্দিনী পাশের ঘর থেকে তোশকবালিশ এনে বিছানাটা গুছিয়ে দিয়ে ওদের বাথরুমে হাত-পা ধুয়ে শুয়ে পড়তে বলল। দুজনেই গায়ে কম্বল বিছিয়ে শুয়ে পড়ল।"

 
রাত প্রায় এগারোটা বাজে। ছেলেকে আজ কিছুতেই ঘুম পাড়াতে পারছে না নন্দিনী। একনাগাড়ে বকবক করে চলেছে। এত রাত হয়ে গেল তবু অবিনাশ এখনও বাড়ি ফিরছে না। ঘরের বাইরে এক চিলতে বারান্দায় কারা যেন চাপা স্বরে কথা বলে চলেছে। ছেলেকে বলল নন্দিনী,
-দেখ তো কারা যেন বাইরের বেঞ্চিতে বসে কথা বলে চলেছে।
বিল্টু জানালাটা টানটান করে জিজ্ঞাসা করল,
-কাকু তোমরা কারা? কোথা থেকে এসেছ?
দুজনের মধ্যে একজন বলে উঠল,
-আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি সোনা, এত রাত হয়ে যাওয়ায় আমরা এখন আর আমাদের জায়গায়
যেতে পারছি না। তাই তোমাদের বারান্দাটায় এসে বসেছি।
নন্দিনী কান খাড়া করে সবই শুনছিল এবার নড়েচড়ে জানলার কাছে নিজেই চলে এল।
-কে আপনারা? এখানেই বা এত রাতে বসে কথা বলছেন কেন? দাদা এখনো বাড়ি ফেরেননি, ওনার ফিরতে একটু রাত হয়।
-বৌদি কিছু মনে করবেন না, আমাদের গাড়িটা ভীষণ লেট করেছে, আমরা কীটনাশক বিক্রি করি। যেখানে আমাদের যাবার কথা রাত হয়েছে, রিক্সাওয়ালা ওপারে বাংলাদেশের বর্ডার বলে আর না নিয়ে গিয়ে কাছাকাছি নামিয়ে দিয়ে গেল। আমরা এখন কী করব জানতে চাওয়াতে বলল, ‘ওই যে দেখছেন আম গাছটার সামনের বাড়িটা, ও বাড়ির ভদ্রলোক খুব ভাল লোক, বিপদে পড়লে মানুষকে সাহায্য করেন, আপনারা ও বাড়ির বাইরের বারান্দার বেঞ্চটাতে গিয়ে এখন বসুন।
নন্দিনী বলল,
-ঠিক আছে, আপনারা এখন বসুন, দাদা আসলে সব কথা বলবেন।
ভিতর থেকে ছেলের গলার শোনা গেল,
-মা, কাকুদের ঠান্ডা লাগছে, কখন থেকে ওরা বসে আছে, ওদের বাইরের ঘরটায় ঢুকতে দাও না। বাবার আসতে তো অনেক দেরি হবে।
নন্দিনীর নিজেরও খুব অস্বস্তি হচ্ছে বিষয়টা নিয়ে, মাথার কাপড়টা টেনে ছেলেকে সাথে নিয়ে বাইরের দরজার খিল খুলে দিল, মনের ভিতর খানিকটা দ্বিধা নিয়ে। ওরা দুজনেই বৌদিকে ধন্যবাদ জানাল। বাইরের ঘরে একটা খাট পাতাই থাকে, বিল্টু আর নন্দিনী পাশের ঘর থেকে তোশক, বালিশ এনে বিছানাটা গুছিয়ে দিয়ে ওদের বাথরুমে হাত-পা ধুয়ে শুয়ে পড়তে বলল। দুজনেই গায়ে কম্বল বিছিয়ে শুয়ে পড়ল। উঃ ঠান্ডার হাত থেকে আপাতত কিছুটা মুক্তি পাওয়া গেল।
স্বামী এখনো বাড়ি না ফেরাতে নন্দিনী জড়তা মুক্ত হতে পারছে না। ওনারা এতক্ষণ ধরে না খেয়ে আছেন, খুব খারাপ লাগছে তাই দুবাটি মুড়ি আর পাটালি গুড় এনে ওদের খেতে দিল। বলল,
-চা করে আনব, খাবেন?
দু জনেই বলে উঠল,
-না না তার কোন দরকার নেই। আপনি অনেক করেছেন বৌদি। আমরাই এত রাতে আপনাকে বিব্রত করছি বলে খারাপ লাগছে।
পেটে অসম্ভব ক্ষিদে থাকা সত্ত্বেও ওরা দুজনের কেউই এক গাল মুড়িও খেতে পারল না। সবসময় এক আশঙ্কা ওদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে, বাড়ির কর্তা এসে এই অচেনা অজানা মানুষদের দেখে কী প্রতিক্রিয়া দেখাবেন।
রাত প্রায় ১২-৩০ টা। কে যেন গুণগুণ করে গান গাইতে গাইতে এগিয়ে আসছেন জুতোয় মচমচ আওয়াজ তুলে। বুঝতে বাকি রইল না ইনিই বাড়ির গৃহকর্তা। এসেই দরজায় কলিং বেল টিপলেন। ছেলে বাবা এসেছে বলে তাড়াতাড়ি করে দরজা খুলে দিল।
-তুই এখনও না ঘুমিয়ে জেগে আছিস কেন? একি বাইরের ঘরে বিছানায় এরা কারা?
অবিনাশবাবু পাড়ার ক্লাবের আসর থেকে ফিরতে রাত হয় বলে এইসময় হাতে টর্চ রাখেন। সোজা টর্চ জ্বালিয়ে বিছানার ভিতর আলো ফেললেন। সমর বরাবরই চুপচাপ। অমর মুখ খুলল,
-দাদা আমরা অনেক দূর থেকে আসছি, সেলসের কাজ করি আমাদের সাথে কীটনাশক ওষুধের জিনিসপত্র আছে, দেখলেই বুঝতে পারবেন। গাড়ি বিভ্রাট আর অসম্ভব লেট হওয়াতে যেখানে যাবার কথা ছিল যেতে পারিনি। অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় আশেপাশের লোকজন পরোপকারী বলে আপনার বাড়িটা দেখিয়ে দিল। রাতটুকু থাকার যদি একটা ব্যবস্থা করা যায় সেটা ভেবেই এখানে আসা। আমরা বাইরের বেঞ্চটাতেই বসেছিলাম। বিল্টু খুব ভাল ছেলে, ও বলাতে বৌদি দয়া করে আমাদের এখানে রাতে শোবার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আমাদের মতো মানুষের
এত রাতে হোটেল খোঁজা সম্ভব নয় বুঝতেই পারছেন।
বৌদি স্বামীকে ইশারা করে ভিতরের ঘরে নিয়ে গিয়ে সব কথা গুছিয়ে বললেন। হঠাৎ ভদ্রলোক বলে উঠলেন,
-আরে আমার ঘরে কী এমন জিনিস আছে যে ওনারা চুরি ডাকাতি করবেন? এই যে মশাইরা বাইরের ঘর ছেড়ে ভিতরের ঘরে আসুন তো।
-না না, আমাদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না। আমরা এখানেই বেশ ভাল আছি।
-কিছু খেতে খেতে দিয়েছ ওনাদের?
-হ্যাঁ, দিয়েছেন, বৌদি আতিথেয়তার কোন ত্রুটি করেননি। আমরাই ক্লান্ত শরীরে বিশেষ কিছু খেয়ে উঠতে পারিনি।
ভদ্রলোক বাথরুম থেকে হাত-পা ধুয়ে এসে বললেন,
-আজ তো পৌষ সংক্রান্তি। সকাল বেলায় দুধ, নারকেল, খেজুরের গুড় সব কিনে দিয়ে গেছি। পিঠে পুলি বানিয়েছ তো? নাও ওগুলো সব বের করে ওনাদের দাও, আমরাও খেয়ে নিই একসাথে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কাচের বড় ডিশে করে ওনার স্ত্রী পিঠে পুলি সাজিয়ে নিয়ে আসন পেতে ওনাদের খেতে দিল। সময় আর অমরের বিস্ময়ের ঘোর আর কাটে না,
-আজকের দিনেও এত উদার মনের মানুষ আছে?
খাওয়াদাওয়া শেষ হলে অবিনাশবাবুর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ওরা বাইরের ঘরে গিয়েই শুলো।
-এদিকে যখন এসেছেন তখন কালকের দিনটা থেকে যান-না।
-না দাদা, আমাদের কাল জরুরি কাজে বেরিয়ে যেতেই হবে। এবার রাত হয়েছে, আপনারাও বিশ্রাম করুন।
ওনারা শুভরাত্রি জানিয়ে মাঝের দরজা বন্ধ করে যে যার মতো শুয়ে পড়লেন।
 
এখন ভোর ৪টে বাজে। টর্চের আলো জ্বেলে একটা চিঠি লিখল অমর,
-আমরা মুক্তিযোদ্ধা, এখান থেকে বর্ডার পেরিয়ে বাংলাদেশে যাব। আমরা শুধু রাতের অতিথি হয়েও সারাজীবন আপনাদের উদার হৃদয়ের কথা মনে রাখব।
এবার বেরিয়ে যাবার পালা। ব্যাগ গুছিয়ে ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফোটার আগেই সদর দরজার খিল খুলে শিশির ভেজা ঘাসের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দুজনে পাড়ি জমাল সীমানার উদ্দেশ্যে।
 
~~000~~

No comments:

Post a Comment

ফিরতে হবে ঘরে~~~


Popular Top 9 (Last 7 days)