বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪৪তম
সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি
| ধারাবাহিক গল্প
বীথিকা ঘোষ
ক্ষণিকের অতিথি
[১ম পর্ব]
"কোথা থেকে মুরগির ডাক কানে এল, নাহ্ আর শুয়ে থাকলে চলবে না গাত্রত্থান করি সকালের কাজগুলো সেরে ফেলি, বাচ্চাগুলোকে খেতে দিতে হবে!"
অরুণা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে
ছিল, সঙ্গে কোল ঘেঁষে তার ছোট ছেলে
ঘুমিয়ে আছে। জীবনের অজস্র ঘটনার ছবি চোখের পর্দার ওপর প্রতিফলিত হয়েই সরে সরে
যাচ্ছে, তার জীবনটা এমন কেন হল? এ দেশে এসে ওনার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না, এতদিন পর্যন্ত তবু একরকম ছিল কিন্তু আজকাল তো বিছানা থেকে
উঠতেই পারছেন না; চাকরি করবেন কী করে? অফিসে যেতে পারছেন না দেখে হেড-অফিস-বাবু স্যালারি বন্ধ করে দিয়েছেন। আমি জানি উনি বদমায়েশি করে এটা করেছেন, পাশের বাড়িতেই থাকেন, কোম্পানি থেকে এটা করতেই পারে না। দাদা, বড়দিকে জানাতেই ওরা বুদ্ধি পরামর্শ করে আমাকে জানায়
কোলকাতায় অনেক ভাল ভাল হসপিটাল আছে। তাছাড়া দিদির ছেলে পরিতোষ সেও ডাক্তার কোলকাতা
মেডিকেল কলেজের, ওনাকে নিয়ে গেলে
চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়ে যাবে কিন্তু বাচ্চাদের কোথায় কার কাছে রেখে যাব ভাবতে
ভাবতেই সকাল হয়ে যায়।
-কোথা থেকে
মুরগির ডাক কানে এল, নাহ্ আর শুয়ে
থাকলে চলবে না গাত্রত্থান করি সকালের কাজগুলো সেরে ফেলি, বাচ্চাগুলোকে খেতে দিতে হবে! তারপর ছোট ছেলেকে তুলে খাওয়াতে
হবে। দু’ বছরের বাচ্চা এখনো হাঁটতে শেখেনি, পা দুটোতে জোর নেই ডাক্তারবাবু আশ্বাস
দিচ্ছেন ছেলে হাঁটতে পারবে একটু সময় লাগবে;
সব
বাচ্চা একরকম হয় না। উনান ধরিয়ে চায়ের জল বসালাম, বড় মেয়ে চেঁচিয়ে বলল,
-মা কানুদা এসেছে, আমরা পড়তে বসলাম।
-চায়ের পাত্রে
আরও এক কাপ জল দিয়ে দিলাম।
-এই ছেলেটা খুব
ভাল নাম কানু, দেশের বাড়ি থেকে
এসেছে চাকরির সন্ধানে। ওর জেঠু এই বাগানের ম্যানেজার, বিশাল বাংলো নিয়ে থাকেন তবুও ভাইয়ের ছেলেকে
থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন মেস বাড়িতে। চাকরির আশায় এসেছে কিন্তু এখনো চাকরি
পায়নি, কয়েকটা বাড়ির বাচ্চাদের পড়ায়; আমার বাচ্চা দুটোকেও পড়ায়, ওদের খুব স্নেহ করে। কানু আমার অনেক উপকার করে থাকে, তাছাড়া সাংসারিক বুদ্ধি পরামর্শও করে থাকি, উনি ভাল থাকলে আমার কোন কিছু নিয়ে ভাবতে হয় না কিন্তু এবার
যে অনেক দিন ধরে অসুস্থ। আমিও যতটা সম্ভব ওঁর উপকার করার চেষ্টা করি, বেশির ভাগ দিন রাতের খাবার এখানেই খায়। চা দিতে গিয়ে বললাম
পড়ানো হয়ে গেলে একটু শুনে যেও।
-আচ্ছা কাকিমা!
-অনেক ভেবে
দেখলাম এখানকার জলবায়ু ওর সহ্য হচ্ছে না, তার মধ্যে এখন যে অবস্থা; বড়দির প্রস্তাব মেনে
নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কানু এলে বললাম,
মোড়াটা
টেনে নিয়ে বসো একটা বুদ্ধি দাও তো এখানকার চিকিৎসায় তো কিছুতেই ভাল হচ্ছেন না, বড়দির প্রস্তাব মেনে নেওয়াই ঠিক করলাম।
-ঠিক কথা
ভেবেছেন কাকিমা, কাকু দিন দিন রোগা
হয়ে যাচ্ছেন। কোলকাতায় অনেক ডাক্তার পাবেন,
তাছাড়া
আপনার আত্মীয়স্বজন আছেন, চিকিৎসার কোন অসুবিধা
হবে না বলেই মনে হয়!
-দেখো আমার
যাওয়া তো সম্ভব হচ্ছে না তাই দাদার পরামর্শ এখান থেকে ওনাকে প্লেনে পাঠিয়ে দিতে।
মানে এখান থেকে তুলে দেব দাদা নামিয়ে নেবে, দাদা থাকে ব্যারাকপুরে সুতরাং দমদম থেকে নামিয়ে নিতে দাদার অসুবিধা হবে না, তবে থাকবে কালীঘাটে বড়দির বাড়িতে তাই বলছিলাম কী এখন টাকার জোগাড় করতে হবে। অরুণা আঁচলের গিঁট
খুলে সোনার হার বের করে বলেন এটা বিক্রি করে দিতে পারবে?
-একদম বিক্রি
করে দেবেন, আমি বলছি কী কাকু এই
কোম্পানিতে চাকরি করেন। কোম্পানিরই উচিত সব ব্যবস্থা করে দেওয়া।
-কোম্পানিকে কে
বলতে যাবে?
-আপনি ডাক্তার
বাবুকে বলুন, উনি দেখতে আসেন তো; তখন খুলে বলবেন। কাকুর স্যালারি বন্ধ করে দিয়েছে সেটাও
বলবেন, আমি যতদূর জানি পার্মানেন্ট
স্টাফের মাইনা বন্ধ করতে পারেন না।
সব শুনে ডাক্তার বাবু বলেন,
-ভাল প্রস্তাব আমি অফিসে কথা
বলে দেখি, মনে হয় সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে!
-হ্যাঁ
কোম্পানির থেকে সব ব্যবস্থা করে দিলেন একেবারে টিকিট কেটে প্লেনে উঠিয়ে দেওয়া
পর্যন্ত সব। এমনকি চিকিৎসা বাবদ টাকাও স্যাংশান করে দিলেন, দু' মাসের স্যালারি তো
দিলেনই, মাস মাইনাও চালু
হয়ে গেল। এসব কানুর বুদ্ধিতে এত সব হল, কোলকাতায় যাচ্ছে শুনে সম্পর্কে মাসির ছেলে নিতাই বেশ বড় এক প্যাকেট চাপাতি এনে
দিয়ে মুখে বলল ‘কোলকাতার লোক খুব খুশি হবে,
একেবারে
চা বাগানের সলিড চাপাতি খায় বড় মাসি,
মামারা!
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment