বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪৮তম সংখ্যা/২০শে চৈত্র, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
মমিনুল পথিক
রমিজা
বেওয়া
[৫ম পর্ব]
"গোসল সেরে গায়ে-মাথায় সরিষার তেল চপচপে করে দিয়ে নতুন একটি শার্ট ও লুঙ্গি পরে সে। মনে হয় নতুন জামাই। রমিজাকে না জানিয়ে বাড়ি গিয়ে চমকে দেবে তাই। ইতোমধ্যে গত সপ্তাহে রমিজার জন্য ফুটপাতের সস্তা দোকান থেকে কিছু প্রসাধনী সামগ্রী কিনে রেখেছে সে।"
পূর্বানুবৃত্তি সগির আলীর সংসারে সদস্যের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। প্রথমে
খুব খুশি থাকলেও তাদের খাইখরচের ব্যাপারে চিন্তায় পড়ে যায়। কথা বলে খবিরের সঙ্গে। তারপর…
খবির আলীর পাঠানো টাকা দিয়ে
রমিজা পাঁচ ছেলে-মেয়ে নিয়ে এক বেলা আধা পেট ও একবেলা পেট পুরে খেতে পায়। তিন বেলা
কাকে বলে খবির আলীর সংসারে কেউ জানে না। বড় ছেলে তমিজ আলী কামলা দেওয়ার মতো বয়স
হলেও রমিজার ইচ্ছে ছেলেকে স্কুলে পাঠাবে। খাড়া রোদে উঠোনে
আজ একটু সকাল সকাল মেসে ফিরেছে
খবির আলী। শরীরটা খারাপ নাকি ভীমরতি ধরেছে সেও বুঝে উঠতে পারেনি। তবে অনুমানে আসে, বেলা এগারোটার সময় সনি সিনেমার সামনে থেকে দুইজন যাত্রী
উঠেছিল বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাওয়ার জন্য। তারা স্বামী-স্ত্রী কী প্রেমিক-প্রেমিকা
খবির আলীর ভাববার অবকাশ কই? তবে যেটুকু ভেবেছে
তাতে মনে হয় শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রীই এইরকম করে। রিক্সার সামনের দুটো লুকিং
গ্লাসে তাদের আপত্তিকর কর্মকান্ড সবই দেখেছে সে। বোটানিক্যাল গার্ডেনের গেটে
নামিয়ে দিয়ে সারাটিদিন তাদের দৃশ্যগুলো ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের মতো চোখজোড়ায় ভেসে ওঠে
তার। এই সব স্মৃতি মনে করতে করতে কখন যে অ্যাকসিডেন্ট করবে এই ভয়ে সন্ধের পর আর
গাড়ি চালায়নি।
রাতের খাবার খেয়ে আজ
তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়েছে খবির আলী। কিন্তু একেবারেই ঘুম আসে না তার। একাত-ওকাত করতেই
অনেক রাত গড়িয়ে যায়। একটি বিড়ির আগুন দিয়ে আর একটি বিড়ি ধরায়। সে যেন আজ চেইন
স্মোকার। রমিজার কথাও খুব মনে পড়ছে। ভাবতে ভাবতে মাঝে মাঝে তন্দ্রা আর মাঝে মাঝে
ঘুম। এভাবে গভীর ঘুমে ঢলে পড়ে সে। ঘুমের মধ্যে রমিজার কাছে পৌঁছে যায়।
সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে গোসল
করাটি বাধ্যতামূলক মনে করে খবির আলী। ঘুমের ঘোরে কী ঘটেছিল স্পষ্ট মনে নেই তার। গোসল সেরে গায়ে-মাথায় সরিষার তেল
চপচপে করে দিয়ে নতুন একটি শার্ট ও লুঙ্গি পরে সে। মনে হয় নতুন জামাই। রমিজাকে না
জানিয়ে বাড়ি গিয়ে চমকে দেবে তাই। ইতোমধ্যে গত সপ্তাহে রমিজার জন্য ফুটপাতের সস্তা
দোকান থেকে কিছু প্রসাধনী সামগ্রী কিনে রেখেছে সে। ছেলে-মেয়ের জন্যও অনেক কিছু
কিনেছে। তাইতো ঘাড়ে ঝুলানো ব্যাগটি যেন নয় মাসের পোয়াতির মতো দেখতে লাগে।
(৭)
সত্যিই বাড়িতে পৌঁছে সবাইকে
চমকে দেয় খবির আলী। যদিও পৌঁছতে অনেক রাত হয়েছিলো তার। বেশি ডাকতে হয়নি রমিজাকে।
দু-একটি ডাকেই টের পেয়েছে সে। স্বামীকে এত রাতে বাড়িতে পেয়ে খুশির ছটা যেন
বেড়ার ফাঁক গলিয়ে বাইরে যেতে লাগল। কুপির টিমটিমে আলো রমিজার কাছে দিনের আলোর মতো
মনে হতে লাগল। শরীরের শিরা-উপশিরায় এক রোমাঞ্চ আবেশ অনুভুত হতে লাগল। ছেলে-মেয়েরা
সব গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। অনেক দিন পর স্বামী-স্ত্রীর আলিঙ্গনে যেন বহু দিনের পিপাসিত
হৃদয়ের অভ্যন্তরে সুধাসম ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হতে লাগল।
পরদিন সকালে খবির আলীর ঢাকা
থেকে আসার খবর প্রতিবেশীর মাঝে ছড়িয়ে পড়ল। সেই সুযোগে কৌতুহলী কয়েকজন প্রতিবেশী এসে খবির আলীকে ঢাকা শহরের বর্ণনা করার জন্য অনুরোধ করল। খবির আলী এই
কমাসে যা দেখেছে তাই বর্ণনা করে তাদের তৃষ্ণা নিবারণ করতে লাগল।
-ঢাকা হইল অন্য
রকম শহর বাহে। তোমরা এ্যালা নিজ চক্ষে না দেখিলে বুঝবার পাবার নয়। ওই ঠিকোনা কাঁইও কাঁইওর জন্যি নোয়ায়। যে যার কামে সগায় ব্যস্ত।
অপলক চোখে খবির আলীর দিকে
চেয়ে থাকে সবাই। কেউবা মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝার ভান করে। খবির আলী নিজেকে বোদ্ধা মনে
করে। মনের ভেতরে খুশির ফোয়ারা উৎরে ওঠে। খবির আলী সারা গ্রামখানি এক নজর ঘুরে ফিরে
দেখতো লাগল। আগের দেখা আর এখনকার দেখার মধ্যে একটু পার্থক্য লক্ষ্য করা গেল।
এভাবেই কেটে গেল কয়েকটি দিন।
ছেলে-মেয়েদের এবং রমিজাকে সময় দেয় সে। তারপরও তার শূন্যতা কাটে না। মোট কথা ঢাকা শহর
তাকে চুম্বকের মতো টানতে লাগল। কামাইয়ের মোহ তাকে পেয়ে বসল। ফলে বেশিদিন বাড়িতে
থাকা হল না তার। সপ্তাহ-খানেক থেকেই স্ত্রী-সন্তানের মায়াজাল
ভেদ করে আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করে সে।
ঢাকায় পৌঁছে খবির আলী আরো
বেশি পরিশ্রম করে। কামাই করে নড়বড়ে ঘরটি ভাল করতে হবে। ছেলে-মেয়েদের লেখা-পড়া
করাবে। মেয়েটি বড় হচ্ছে বিয়া দিতে হবে। আস্থা আর সাহসের সুতা দিয়ে মনের ভেতরে অনেক
স্বপ্নের জাল বুনতে থাকে সে।
কয়েক মাস গড়িয়ে গেলেও বাড়ির
মায়া খবির আলীকে তেমন কাবু করতে পারেনি। কারণ, এখন তার চোখ খুলেছে। বাড়ির মায়া করলে স্ত্রী-সন্তানের মুখে ভাত জুটবে না। টাকা
ছাড়া দুনিয়াতে কেউ কাউকে চেনে না। এই দুনিয়াতে বিপদের বন্ধু কেউ নয়, ট্যাকা ছাড়া। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তার রিক্সার
যাত্রী হওয়ার সুবাদে কথাগুলো মনে রেখেছে সে। শুধু মনেই রাখেনি, নিজের জীবনের
সাথে মেখে নিতে চায় সে।
রমজান মাস। খবির আলী রোজা
রাখে না। রোজা রাখলে রিক্সা চালানো খুব কষ্ট হয়। পৌষের মেঘলা আকাশ। কনকনে হাড়
কাঁপানো শীত। সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি রিক্সা চালায় সে। তাইতো দুটো পয়সার মুখ দেখতে
পায়। কখনো বসে থাকে না। শুধু দুপুরে খেয়ে রিক্সার উপরেই একটু বিশ্রাম নেয়।
ঈদের ঢাকা। বিপণী-বিতানগুলো
অপরূপ রঙে সেজেছে। সকাল হতে মধ্যরাত অবধি কেনাকাটার ধুম পড়ে গেছে। ক্রেতাদের উপচে পড়া
ভিড়। বিশেষ করে নিউ মার্কেট, গাউছিয়া, চাঁদনী চক, ইষ্টার্ণ প্লাজা,
কর্ণফুলী
গার্ডেন সিটি, পীর ইয়ামেনী মার্কেট, আজিজ সুপার মার্কেট,
মৌচাক
মার্কেট, রাপা প্লাজাসহ গুলশান, বনানী ও উত্তরার বিভিন্ন অভিজাত বিপণী-বিতান ও ফুটপাতে
উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত সব শ্রেণির সমাগম ঘটেছে। ঢাকা শহর যেন পরিণত
হয়েছে কেনাকাটার শহরে।
রমজানের শেষ সপ্তাহ চলছে।
ইতোমধ্যে অধিকাংশ ঢাকাবাসী নাড়ির টানে নিজ নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করেছে। বাস, ট্রেন ও লঞ্চে তিল পরিমাণ জায়গা নেই। ঢাকা নতুন সাজে
সেজেছে। বর্ণিল নিয়ন সাইনে রাজপথগুলো রঙের খেলায় মেতে উঠেছে। খবির আলীও ফুরফুরে
মেজাজে রিক্সা চালায়। এ সময় তার যাত্রীর অভাব নেই। রিক্সার প্যাডেল মারে আর
বিলবোর্ডগুলোতে মনের আনন্দে তাকায়। তবুও মনের ভেতর কোথাও একটা আঘাত লাগে তার।
নিজের অজান্তেই আ-হা-হা করে ওঠে।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment