বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪৯তম সংখ্যা/২৭শে চৈত্র, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
মমিনুল পথিক
রমিজা
বেওয়া
[৬ষ্ঠ পর্ব]
"মোর বাপ ঈদত আসবার নাগজে, মোর জন্যি একখান নাল জামা কিনি আনবে। মুই ঈদ করিম, তাই নয় মা। এই বলে মায়ের থুতনি ধরে টেনে তোলে খোকা। মা রমিজা ছেলের খুশিতে নিজেও লজ্জায় আঁচলে মুখ ঢেকে স্বামীর জন্যে প্রহর গোনে।"
পূর্বানুবৃত্তি সংসারের সুরাহার জন্যে খবির আলী ঢাকায় রিকশা চালানো শুরু করে। বাড়িতে টাকা পাঠায়।
রমিজা পাঁচ ছেলে-মেয়ে নিয়ে এক বেলা আধা পেট ও একবেলা পেট পুরে খেতে
পায়। তারপর…
গোটা রমজান মাসটিতে খবির আলী
ভাল পয়সা কামিয়েছে। রোজার শেষ দিকে গুলিস্তান হকার্স মার্কেট থেকে সবার জন্য কাপড়
কিনেছে সে। সৎমা জরিমন ও সৎভাই আদর আলীও বাদ যায়নি। তার কথা,
-মোর মা ও ভাইতো,
এ্যালা
মুই না দিলে কাঁয় দিবে? মোর নিজের মাও ভাই
থাকলে তো উয়াদেরকেও দেওয়া নাগত।
বাড়িতে ছোট ছেলেটির অনেক আশা,
-মোর বাপ ঈদত আসবার নাগজে, মোর জন্যি একখান নাল জামা কিনি আনবে। মুই ঈদ করিম, তাই নয় মা।
এই বলে মায়ের থুতনি ধরে টেনে
তোলে খোকা। মা রমিজা ছেলের খুশিতে নিজেও লজ্জায় আঁচলে মুখ ঢেকে স্বামীর জন্যে
প্রহর গোনে।
(৮)
ঈদের ছুটিতে আজ গ্রামের বাড়ি
যাবে খবির আলী। খুব ভোরে ওঠেছে সে। মেসের বুয়ার ছুটি, তাই পলিথিন ব্যাগে রাখা একটু চিড়া ভিজে খেয়ে নেয়। ব্যাগ
আগের রাতেই গুছিয়ে রেখেছিল। খালেকসহ এলাকার বেশ ক’জন রওনা করে।
গাবতলী এসে গাড়ির টিকেট
কাউন্টারে যায় সবাই। ভাড়া দেড়শো জায়গায় আড়াইশো। অত টাকা ভাড়া দিয়ে
যাওয়া তাদের পোষাবে না। একটু এগিয়ে যায় গাবতলী ব্রিজের সন্নিকটে। কিছু মফিজ গাড়ির
হেলপার, সুপার ভাইজার ডাকে,
-এই আহো আহো, এদিকে আহো, আরো সামনে আহো।
সেখানে গাড়ির এক শ্রেণির
দালালচক্র বেশভূষা আর ঘাড়ে ব্যাগ দেখলেই চিনতে পারে। খালেক সামনে, পেছনে খবির আলী,
অন্যরা
তার পেছনে। দালাল হেঁড়ে গলায় বলে ওঠে,
-হে-য় রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, ন্যালফামারী, নালমনিরহাট, ঠাকুরগা, পচাগড় আহো, যাবে আহো...
ভাড়া জিজ্ঞেস করে খালেক,
-কুড়িগ্রাম যামু কতো নিবেন?
-তোরা কয় জন
আছিস?
দালাল জিজ্ঞেস করে।
-হামরা পাঁচ জন
আছি।
-ঈদের ভাড়া
বেশি লাইগবো। ভিতরে আড়াইশো উপরে একশো পারবা?
ওই ভাড়াতে
পোষায়না তাদের। গাড়ি চলে যায়। আরো গাড়ি আসে। এবার ছাদে জনপ্রতি পঞ্চাশ টাকায় ভাড়া
মিটিয়ে নিয়ে পেছনের মই দিয়ে ওঠে সবাই।
গাড়ি চলতে থাকে। প্রথম প্রথম
গাড়ির ঝাঁকুনিতে বেশ মজাই লাগছিলো খবির আলীর। কিন্তু আমিন বাজার, হেমায়েতপুর, সাভার, নবীনগর, বাইপাইল, ইপিজেড ও চন্দ্রায় এসে গাড়ির অবস্থা ভয়ংকর। ভিতরে ও ছাদে
শুধু মানুষ আর মানুষ। যাত্রীর মাঝে তিল পরিমাণ ফাঁকা নেই। এক জনের সাথে অন্যজন
যেন লেপ্টে আছে। গাড়ি চলে আপন মনে,
কিন্তু
খবির আলীর মন গেছে নিভৃত পল্লিতে রেখে আসা তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকা আপন জনের প্রতি।
যেন মনের চোখে সে দেখছে অনাহার অনশনক্লিষ্ট ছেলে-মেয়ের মলিন
মুখ এবং হাড়া ভাঙা খাটুনি করা রমিজার পোড়া দেহখানা। খুব মায়া
লাগে তার। ছোট ছেলেটি খোকা নাল জামাখান পড়ি এ্যালা খুব খুশি হইবে আর কইবে মোর বাপ
কত্ত ভাল। রমিজার মিষ্টি কালার শাড়ি পছন্দ। সৎমায়ের কচু পাতার রং। বাপ সগির আলীর
জন্যে কলারওয়ালা পাঞ্জাবি। অনেক কথা।
গাড়ি ততক্ষণে টাঙ্গাইল পার
হয়েছে। আর একটু গেলেই এলেঙ্গা। তার আগেই একটি ব্রিজ। মির্জাপুরের পর থেকেই গাড়ির
লক্ষণটি ভাল ঠেকছিল না চালকের কাছে। গাড়িটি কেমন যেন খুব ঝাঁকুনি দিচ্ছিল। চালকের
কাছে সামলানো কঠিন মনে হয়েছিল। প্রায় কয়েকশত যাত্রীর প্রাণ নির্ভর করছে তার
নিয়ন্ত্রণের উপর। প্রাণপণ চেষ্টা করছেন তিনি। কিন্তু অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের কারণে গাড়ির এই করুণ অবস্থা! তবুও চেষ্টার কোনো কমতি নেই তার। অবশেষে ব্রিজের
উপর উঠে যা হবার তাই হল। গাড়িটি ব্রিজের রেলিং ভেঙে নদীতে
পড়ে গেল। বিধি বাম! সিংহভাগ লোক সলিল-সমাধি বরণ করল। অনেকেই মুমুর্ষূ হয়ে হাসপাতালে। আহতদের মধ্যে খালেকও আছে। নিহতদের মধ্যে অনেক লাশের
খোঁজ মেলেনি। তবে যে কয়টি লাশ নদী হতে তোলা হয়েছে তার মধ্যে হতভাগা খবির আলীর
নিথর দেহটিও ছিল।
দুদিন পর খবির আলীর
ক্ষতবিক্ষত লাশটি গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলে এলাকায় যেন শোকের মাতম চলতে থাকে।
আশেপাশের কয়েক গ্রামের মানুষের ঢল নামে খবির আলীকে এক নজর শেষ দেখার জন্যে।
স্বামীর মৃত্যু শোকে রমিজা বার বার মূর্ছা যায়। কে যেন তার নাক থেকে নাকফুলটি খুলে
রেখেছে। কোলের শিশুটি মায়ের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। সে হয়তো এখনো
বুঝে ওঠেনি যে, সে পিতৃহারা হয়েছে। দাফন শেষে
গ্রামের লোকজন দোয়া পড়তে পড়তে যে যার বাড়িতে পৌঁছে। তখনও রমিজা বেওয়ার কান্নার
রোল সবার কানে বেদনা বিধুর হয়ে বাজে।
~~000~~

No comments:
Post a Comment