বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪৬তম সংখ্যা/৬ই চৈত্র, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
পারমিতা
চ্যাটার্জি
দুটি
নিস্ফল ভালবাসা
[৩য় পর্ব]
"তুমি আমার গায়ে হাত তুললে? তোমার এত সাহস আর তো এক মুহূর্ত থাকব না, আর যদি গায়ে হাত তুলতে আস তবে আমার হাতও থেমে থাকবে না জেনে রাখ, রাস্তার লোকজন দেখবে।"
পূর্বানুবৃত্তি বাবা-মায়ের জন্যে পাঠানো
খাবার দেখে নীলেশের মা তাদের বনেদিয়ানায় খুব খুশি। নীলেশের
বাবা-মায়ের জন্যেও অনেক খাবার পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। রাত্রে নীলেশের বাহবন্ধনে আবদ্ধ বিদিশা চাকরি ছাড়বে না। তারপর…
হো হো করে হেসে উঠে বলল,
-পারব না মা
আমায় ক্ষমা করবেন। সেজেগুজে স্বামীর মন ভোলানো ও আমার হয়ে
উঠবে না তার চেয়ে মেয়ে নিয়ে আমি চলে যাব আর আপনার ছেলের সাথে একেবারে কোর্টে দেখা
হবে। আমার একটা আত্মমর্যাদা আছে মা তবে আপনাদের বিদিশা চিরকাল আপনাদেরই থাকবে
কোনদিনই আপনাদের কাছ থেকে সরে যাবে না যে ভালবাসা আপনাদের কাছ থেকে পেয়েছি তা
কোনদিন ভুলব না।
বিদিশা কলেজে ফোন করে আজকের দিনটা ছুটি চায়, ঘরে এসে নিজের বিয়ের দুটো বিশাল সুটকেস নামিয়ে
সব গোছাতে লাগল। নীলেশ ঘরে এসে ওর বাহু ধরে টেনে বলল,
-কী হচ্ছে কী? এই সামান্য কারণে কেউ বাড়ি ছেড়ে চলে যায়?
-সামান্য কারণ? একে তুমি সামান্য কারণ বল? পরকীয়া করে বেড়াচ্ছ আবার বলছ সামান্য কারণ?
নীলেশ সজোরে ওর গালে একটা চড়
মারল, গালটা নীল হয়ে গেল।
-তুমি আমার
গায়ে হাত তুললে? তোমার এত সাহস আর তো
এক মুহূর্ত থাকব না, আর যদি গায়ে হাত তুলতে আস তবে আমার হাতও থেমে থাকবে না জেনে
রাখ, রাস্তার লোকজন দেখবে।
নীলেশের খারাপ লাগছিল বিদিশার
গালের নীল দাগটা দেখে,
-প্লিজ সংসারটা
ভেঙে দিও-না।
-না আমি যাবই, এ যুগের মেয়ে হয়ে বরের হাতে মার খেয়ে আর তার দুশ্চরিত্রতা
দেখে তার সাথে ঘর করার কোন প্রবৃত্তি আমার নেই।
বিদিশা ওর ঘরের সামনের দরজাটা
খুলে মেয়েকে কোলে নিয়ে শ্বশুর-শাশুড়িকে প্রণাম করে একটা ট্যাক্সি ডেকে চলে
গেল। নীলেশেরও সব যেন শূন্য মনে হল ওর বাবা-মা কান্নায় ভেঙে
পড়লেন। নীলেশকে বললেন,
-এমন বউকে ধরে
রাখতে পারলি না জানি না ভবিষ্যতে তোর জন্য কী অপেক্ষা করছে?
মাঝে অনেকগুলো বছর কেটে গেছে
বিদিশার বাবা-মা শ্বশুর-শাশুড়ি সবাই মারা গেছেন। এখন তাদের বাড়ি
সব ভাগ হয়ে গেছে। তাদের ভাগে একটা বড় দোতলা বাড়ি আর পাশে বেশ অনেকটা জমি, একমাত্র মেয়ে বলে এখন সবকিছুই বিদিশার। তার মেয়ে এখন আমেরিকায়
প্রতিষ্ঠিত। পাশের জমিটায় সে একটা বৃদ্ধাশ্রম খুলেছে। মনে একটা আশা আছে যদি কখনও
নীলেশ আসে! সে নীলেশদের বাড়ি যেত যতদিন তার শ্বশুর-শাশুড়ি
বেঁচে ছিলেন, যা সে করত তাদের
ওষুধের ভার সে নিয়েছিল তাঁরা যতদিন বেঁচে ছিলেন, এই দায়িত্ব সে পালন করে গেছে, তাছাড়া শাশুড়ির হাতে একটা ভাল অঙ্কের টাকা দিয়ে আসত। বাবা-মা মারা যাবার পর নীলেশ বাড়ি বিক্রি করে কোথায় চলে গেছে কে জানে!
মেয়ে আসছে এবার মেয়ের বিয়ে
হবে, তার নিজের পছন্দের ছেলে যে কোম্পানিতে সে কাজ করে সেই কোম্পানিতে ছেলেটিও
কাজ করে তবে সে মিমির বস। বিয়ের তোরজোর চলছে, বিদিশা খুব নীলেশকে খুঁজছিল যতই হোক এমন শুভদিনে তার মেয়ে বাবার
আশীর্বাদ পাবে না তা কি হয়? হঠাৎ দেখল নীলেশ সেই
বৃদ্ধাশ্রমের বাড়ির সামনে বিয়ে বাড়ির গেট দেখে মনে হল তার মেয়ের কি বিয়ে? সে এত বড় হয়ে গেছে। বিদিশা বাইরে বেরিয়ে এসে হঠাৎ নীলেশকে
দেখে চমকে উঠল যাকে সে খুঁজছিল সে নিজেই এসে গেল কী করে? বিদিশা নীলেশকে ডাকল,
নীলেশ
ফিরে তাকিয়ে বলল,
-তোমাদের কাছে
এলাম বিশেষ দরকারে না এসে উপায় ছিল না।
বিদিশা তার ভদ্রতা বজায় রেখে
আসতে বলল, নীলেশ বলল,
-তোমার সাথে
আমার একটু দরকার আছে।
-কী দরকার বলো? আগে একটু চা খেয়ে নাও তারপর নাহয় বোলো।
নীলেশ বলল,
-না আগে বলেই নিই।
বিদিশা বলল,
-ঠিক আছে বলো তবে।
-হ্যাঁ আগে
বলেই নিই। না বলে আমি শান্তি পাচ্ছি না, বিদিশা ওই বাড়িটা বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছি তা তোমার আর
মামনির নামে বাবা-মা দিয়ে গেছেন কারণ তুমিই চিরকাল বাবা-মাকে
দেখে গেছ।
বিদিশা মাথা নীচু করে বলল,
-আমি বাড়ি পাওয়ার জন্য কিছু করিনি।
-জানি আমি তা, কিন্তু যে দায়িত্ব নেয় বিনা স্বার্থে, তারই পাওয়া উচিৎ। আর আমি তো যা পেয়েছিলাম তা যে হারে
সে খরচ করছিল তখন আমি বুঝতে পারলাম শুধু টাকার জন্যে আমার সাথে থাকে। কোথায় সেই শান্ত স্নিগ্ধ বিদিশা আর কোথায় এ? তোমার-আমার জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট ছিল আমি তখন তাকে বলেছিলাম আমার সব টাকা তো শেষ
করলে তাও আশ মিটছে না, বাকি যা আছে তা
বিদিশার, ওর পরিশ্রমের টাকা আমি কিছুতেই তোমাকে দেব না। অফিস থেকে যা পেয়েছিলাম তা
আমার নামে আছে। তোমাকে যখন পেলাম তখন তোমার সাথে জয়েন্ট করে
দেব। ওই টাকার সুদ দিয়ে আমার চিকিৎসা চলছে।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment