বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪৭তম সংখ্যা/১৩ই চৈত্র, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
পারমিতা
চ্যাটার্জি
দুটি
নিস্ফল ভালবাসা
[৪র্থ পর্ব]
"আমি যে এখন রোজ কাঁদি চোখের জলটা মুছে দেবার কেউ নেই। তুমি দেখতে পাও না? শুধু শুকনো চোখ দুটো সবাই দেখবে অন্তরের কান্নাটা কেউ দেখবে না?"
পূর্বানুবৃত্তি কিন্তু চাকরি করা নিয়ে নীলেশ একদিন বিদিশাকে চড় মারে।
বিদিশা তাৎক্ষণিক ডিভোর্সের সিদ্ধান্তে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে সংসার ছেড়ে চলে যায়। তারপর…
-চিকিৎসা? কী হয়েছে তোমার? কোথায় থাক তুমি এখন?
নীলেশ ধীরে-সুস্থে বলল,
-মানে? কোথায় চিকিৎসা করাচ্ছ?
-চিন্তা কোর-না ভাল অঙ্কলজিস্ট দেখছে।
-টাটা
মেমোরিয়ালে যাওনি কেন?
-ও তো অনেক
খরচের ব্যাপার, আমাকে তো নিঃস্ব করে
দিয়ে গেছে।
-আমার টাকা তো
ছিল?
-আমি এতটাও
অবিবেচক নই যার সারাজীবন কোন দায়িত্ব নিলাম না উপরন্তু সে আমার সব দায়িত্ব নিয়ে
গেল, যাক গে এবার চা খাওয়াও আর
মামনিকে যদি একবার…
-হ্যাঁ ডেকে
দিচ্ছি।
কিছুক্ষণ পর একটি সুন্দর
লাবণ্যে ঢলঢল মেয়ের সাথে বিদিশা এল, মেয়েকে বলল,
-প্রণাম কর
মামনি তোমার বাবা আজ নিজেই এসেছেন তোমাকে দেখার জন্য।
-কেন এতদিন পরে
হঠাৎ আমাকে মনে পড়ল?
-হ্যাঁ মা
প্রতি মুহূর্তে তোমাদের কথাই মনে হয়েছে কিন্তু জীবনে একবার মহা ভুল হয়ে গেলে আর
ফেরা যায় না, তাই ইচ্ছে থাকলেও তোমাদের কাছে ফিরতে পারিনি।
বিদিশা বলল,
-মামনি প্রণাম কর মা।
মামনি তখন নীচু হয়ে নীলেশকে
প্রণাম করল। নীলেশ মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে একটা চেক
দিল তিনলাখ টাকার,
-তোমার বিয়ের
উপহার।
-বাবার দায়িত্ব
নিয়ে যে বিয়ে দিতে পারে না শুধু উপহার দিয়ে কাজ সারে সে উপহার আমি নেব না।
-নাও মা আমি
খুব অসুস্থ হয়তো বেশিদিন থাকব না,
তোমার মা যদি মত দেন তবে আমি এখন থেকে বাকি দায়িত্ব নিতে পারি।
নীলেশ যে ভাবে খেত ঠিক সেই
ভাবে বিদিশা গরম গরম স্যান্ডউইচ আর কফি নিয়ে এল, নীলেশ বলল,
-মায়ের মতন
হয়েও বাবার মতন উশৃঙ্খল হয়ো না তাহলে সব হারিয়ে যায় দিনের
শেষে। একা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা শুধু।
মামনি অত কঠিন কথা বুঝল না
শুধু বলল,
-আমি এবার যাই?
-হ্যাঁ মা যাও।
বিদিশা খাবারের ট্রেটা
নীলেশের সামনে রাখল। নীলেশ বলল,
-কিছুই ভোলনি
দেখছি আমি যেভাবে খেতাম ঠিক সেই ভাবে কতদিন পরে পেলাম এত যত্নের খাবার।
বিদিশা বলল,
-সব কিছু ভুলব বললেই কি আর ভোলা যায়?
-তোমার এই
বৃদ্ধাশ্রমে কি একটা ঘর হবে?
-তোমার জন্য
একটা ভাল ঘর আর অ্যাটাচ বাথরুমের ব্যবস্থা করে দিতে পারি
এখানে।
নীলেশ বলল,
-আমার দিন শেষ
হয়ে এসেছে, কার্সিনোমার লাস্ট
স্টেজ। মেয়ের বিয়েটা দেখতে দেবে আমায়?
-হ্যাঁ নিশ্চয়ই। তোমার মেয়ে এটা তো আমি অস্বীকার করতে পারি না।
-আর আমি মেয়ের
জন্য সামান্য কিছু টাকা দিতে এসেছি আর তোমার জন্যেও সামান্য কিছু আছে। নিজের
চিকিৎসার জন্য অনেকটা খরচ হয়ে গেছে।
-বেশ করেছ, নিজের এই অসুখের জন্য খরচ করবে না তো কী করবে, আর আমার জন্য কিছু রাখতে হবে না।
-এখনও অভিমান?
-অভিমান তো নয়, তুমি আমার সন্তানের পিতা তোমার জন্য আমার কর্তব্যের ত্রুটি
হবে না।
-আচ্ছা বিদিশা
একটা সইতে কি সব সম্পর্ক মিটে যায়?
আমাদের
ভালবাসার দিনগুলো সবই মিথ্যে ছিল? তবে তুমি আমাকে বাধা
দাওনি কেন বল? কেন আমাকে ওই মেয়েটার কাছ
থেকে তোমার ভালবাসা দিয়ে তোমার কাছে ফিরিয়ে আননি?
-জোর করে
অধিকার বোধ দেখিয়ে কি কিছু ফিরিয়ে আনা যায়? তাছাড়া আমার শিক্ষা আমার আত্মমর্যাদা আমাকে ফিরিয়ে আনতে বাধা দিয়েছিল, ভেবেছিলাম ভালবাসায় ভুল ছিল।
-তাই সারাজীবন
ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করলে?
বিদিশা কোন উত্তর দিল না, শুধু চোখের জলটা লুকিয়ে ফেলল। আর কীবা বলবে? একদিন যাকে প্রাণ দিয়ে ভালবেসেছিল সে এখন মৃত্যু পথযাত্রী
তাকে কি কিছু বলা যায়? নীলেশের চেহারা দেখে
মনে হচ্ছিল সে খুব ক্লান্ত বিধ্বস্ত, জীবনটা যেন তার কাছে
এক বিরাট বোঝা।
নীলেশকে সে বৃদ্ধাশ্রমে
পাঠাতে পারেনি, যদিও তার বৃদ্ধাশ্রম ঝকঝকে হোটেলের মতন কিন্তু তবুও মনে হল শেষ সময়টা
নিজের কাছে থাক। মেয়ের তত্ত্বাবধানে গেস্টরুমটা ভাল করে পরিষ্কার করিয়ে নীলেশকে বলল,
-তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি খুব ক্লান্ত, চল তোমার ঘরে
পৌঁছে দিই। চান করে ফ্রেস হয়ে নাও।
তারপর নিজে হাতে নীলেশের জন্য
হালকা অথচ খুব টেস্টি রান্না করল যা নীলেশ চিরকাল খেত, নীলেশ খেতে বসে ভাত মুখে দিয়ে বলল,
-কতদিন পরে
আবার সেই পুরানো রান্নার স্বাদ ফিরে পেলাম। তোমার আমার যে জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট ছিল
তাতে আমি প্রতি মাসে অনেকটা টাকা জমা করতাম, ইচ্ছে ছিল মামনির বিয়ের সময় তোমার হাতে দিয়ে যাব যাতে তুমি খুব জমজমাট করে
বিয়ে দিতে পার আমাদের একমাত্র সন্তানকে, আর বাকিটা তোমার থাকবে কেউ জানতে পারবে না।
-সে কোথায়? তোমার সেই বউ?
নীলেশ আর থাকতে পারল না, সে উঠে বসে দু’হাতে বিদিশার মুখটা তুলে ধরে বলল,
-বউ তো আমার এই একটাই আর তো কোন বউ নেই।
-বিয়ে করনি
তোমরা?
-না সেও চায়নি
আর আমি ওর হাত থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলাম আর ভাবছিলাম কী
ছেড়ে কোথায় এলাম।
আমার সাথে জোর করে জয়েন্ট
অ্যাকাউন্ট করিয়েছিল, কয়েক লক্ষ হবার জন্য
অপেক্ষা করছিল তারপরই সব অ্যাকাউন্ট খালি করে কেটে পড়ল আর আমিও বাঁচলাম।
বিদিশাকে কাছে পেয়ে বহুদিন
পরে দুহাতে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল,
বিদিশার
চোখও শুকনো থাকল না।
এরপর মেয়ের ভাল ভাবে বিয়ে হয়ে
গেল। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে নীলেশ আবার কেঁদে ফেলল।
নীলেশ তারপর আর দুমাস বেঁচে
ছিল, শেষ সময়ে বিদিশাকে বলেছিল,
-আমি চলে যাবার
পরে কিন্তু কাঁদবে না, কথা দাও কাঁদবে না?
-কেন কাঁদব? যে মানুষটা সারাজীবন শুধু কাঁদিয়ে গেল তার জন্য আর নতুন করে
কী কাঁদব? চলেই যদি যাবে তবে
আবার নতুন করে ফিরে এলে কেন?
-এর কোন উত্তর
নেই আমার কাছে হয়তো অন্তরে কোথাও তোমার সেবা পাওয়ায় বাসনা
ছিল তাই।
নীলেশ চলে গেল আর বিদিশা আবার
তার পুরানো জীবনে ফিরে এল। শুধু রাতে শোবার সময় একবার করে
নীলেশের ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলত,
-আমি যে এখন
রোজ কাঁদি চোখের জলটা মুছে দেবার কেউ নেই। তুমি দেখতে পাও না? শুধু শুকনো চোখ দুটো সবাই দেখবে অন্তরের কান্নাটা কেউ দেখবে
না?
~~000~~

No comments:
Post a Comment