প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Sunday, March 8, 2026

প্রায়শ্চিত্ত [২য় পর্ব] | মমিনুল পথিক

বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪তম সংখ্যা/২৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
মমিনুল পথিক
 
প্রায়শ্চিত্ত
[২য় পর্ব]

"জ্ঞান ফিরলে দেখেনতিনি একটি অপরিচিত জায়গায় একটি ঘরের মধ্যে শুয়ে আছেন। খাটের চারদিকে ঘিরে রয়েছেন কয়েকজন পুরুষ-মহিলা। কিছুক্ষণ পর তার বয়সি কলেজ পড়ুয়া দুটো মেয়ে আসে। তাদের হাতে বিয়ের সব কাপড়চোপড়।"

 
পূর্বানুবৃত্তি আদালতে নাহারের জয় হওয়ায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বাবা-মাকে বলল, বলেছিলাম আমি জিতবই। এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে নাসিরুল ইসলামের সংসারে করাল মূর্তিতে সুজনের প্রবেশ। তারপর…

এদিকে নাহারের বাবা সুজনের খোঁজখবর নিয়েছেন বলে সুজন নাহারের উপরে উত্যক্ত করার মাত্রা আরও বাড়াতে মনস্থির করলেন। তারই জের হিসেবে তিনি নাহারকে বখাটে লেলিয়ে দেন। প্রায়ই পথরোধ করেন
। এমনকি তাদেরকে এলাকা ছাড়ার হুমকি পর্যন্ত দেন। রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠান ইত্যাদি ইত্যাদি। মোট কথা বিভিন্ন ভাবে তিনি নাহারকে মানসিক অস্বস্তিতে রাখেন। তবে এখনো পর্যন্ত শারীরিক ভাবে কোন কিছু করেননি। করতেই বা কতক্ষণ? এসব দুশ্চরিত্র বখাটে অমানুষদের কোন সময়-অসময় নেই। হিতাহিত জ্ঞান নেই। থানা পুলিশ করেও লাভ নেই জেনে মেয়েকে সাবধানে চলার পরামর্শ দেন নাসিরুল ইসলাম। এরকম চড়াই উরাইয়ের মধ্যে ছয় মাস কেটে যায়।
 
প্রতিদিনের মতো নাহার সেদিনও কলেজে যান। ক্লাশ শেষে রিকশা নিয়ে বাড়িতে ফিরছেন। এমতাবস্থায়, তিনজন যুবক দুটো মোটর সাইকেলে এসে তাঁর রিকশার গতিরোধ করেন। তাদের দুজনের হাতে ছিল পিস্তল। বীভৎস চেহারার হায়েনারূপী মানুষগুলো বিকট চিৎকারে নাহারের শরীরে পিস্তল ঠেকায়। অন্যজন তাঁর চোখ-মুখে কাপড় পেঁচায়। নাহার ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় কোন কথা বলতে পারেননি। প্রতিবাদ করার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছেন। তারপর যা হওয়ার তাই হয়েছে।
 
সন্ধ্যার পর যখন জ্ঞান ফিরলে দেখেন, তিনি একটি অপরিচিত জায়গায় একটি ঘরের মধ্যে শুয়ে আছেন। খাটের চারদিকে ঘিরে রয়েছেন কয়েকজন পুরুষ-মহিলা। কিছুক্ষণ পর তার বয়সি কলেজ পড়ুয়া দুটো মেয়ে আসে। তাদের হাতে বিয়ের সব কাপড়চোপড়। নাহার এতক্ষণে বুঝতে পারলেন কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। একটি মেয়ে তাকে বললেন, ভাবী তাড়াতাড়ি করে কাপড়গুলো পরে নিন। কাজী সাহেব আসতে বেশি দেরি নেই। রাগে শরীর রিরি করছে তার। মনে মনে ভাবছেন, এ বিয়েতে আমি কক্ষনোই রাজি হবো না। তারপরও মেয়েটি কাপড়ের প্যাকেটগুলো খুলে হাতে দেওয়া মাত্রই রাগে গরগর করে মেঝেতে ছড়িয়ে দিলেন তিনি। অন্য মেয়েটি তৎক্ষণাৎ সুজনকে ডেকে আনে। সুজন এসে দ্যাখেন শাড়ি, ওড়না, ব্লাউজ, পেটিকোট, অন্তর্বাস সব যে যার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিথর মূর্তিবৎ পড়ে আছে। তিনি তার এই অপমান সহ্য করতে না পেরে নাহারের অশ্রু বিধৌত গালে সজোরে একটি চপেটাঘাত করলেন। তার গালে সুজনের পাঁচ আঙুলের দাগ রক্তের আভার মতো ফুটে উঠল। তাতেও তিনি ক্ষান্ত হলেন না। নাহারের বাবাকে মোবাইল করে বললেন, আপনার মেয়েকে বিয়েতে রাজি হতে বলেন নইলে গুষ্ঠীসুদ্ধ জাহান্নামে পাঠাব। নাহার নিজেকে সামলিয়ে নিলেন। ভাবলেন সন্ত্রাসীদের দ্বারা সব কিছুই সম্ভব। বাবা-মার জীবন ও মানসম্মান বাঁচাতে অগত্যা বিয়েতে মত দেন তিনি।
 
বিয়ের পর নাহারকে নিয়ে বাড়িতে ওঠেন সুজন। শ্বশুরবাড়িতে এসে শাশুড়িকে কদমবুচি করতে গিয়ে শুরুতেই ভৎর্সনা শুনতে হয় তাকে। শাশুড়ি ফোড়ন কেটে বললেন, কেমন তোমার বাপ-মা। আমার ছেলের সাথে চুপ করে বিয়ে দিয়ে দিল, আমাদেরকে পর্যন্ত জানানোর প্রয়োজন বোধ করল না? হাতের, নাকের, কানের, গলার কই। কিছুই তো দেখছি না। খালি গায়ে মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়েছেন? শাশুড়ির মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে শ্বশুর বললেন, রাজপুত্রের মতো ছেলেকে আমার বশ করে কাঙালের ঘরের মেয়েকে পাঠিয়েছে আমাদের ঘরে। লজ্জা করে না তোমার বাবা-মার।
 
নাহার মুখ বুজে শ্বশুর-শাশুড়ির কথাগুলো নীরবে হজম করেন আর দুচোখ ভাসান। তবুও মুরুব্বিদের কথার কোন প্রতি উত্তর করেননি। যদিও-বা তাদের কথাগুলো সবই অযৌক্তিক ও ডাহা মিথ্যা।
 
এভাবেই অত্যাচার ও অপমানে এক বছর কেটে গেল। যত দিন যায় ততই নাহারের উপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের মাত্রা বেড়েই চলে। পাশবিক নির্যাতনে শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে আঘাতের চিহ্ন ফুটে ওঠে। কোন কোন স্থানে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। স্বামীর পাশাপাশি শ্বশুর-শাশুড়ির অপমান পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। কত রাত যে নির্ঘুমে রোদন করেছেন তার ইয়ত্তা নেই।
 
বাবা-মাও শান্তিতে নেই। এক বছরের বেশি হয়ে গেল একমাত্র মেয়েকে দেখে না। মেয়ের সাথে দেখা ও কথা বলার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন তারা কিন্তু কোন উপায় করতে পারেননি। মেয়ের কোন খোঁজখবর না পেয়ে মহা দুশ্চিন্তা দিনাতিপাত করেন তারা।
 
এমন ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যে মেঘের এক কোণে সূর্য উঁকি দেয়। পেটে সন্তান আসে নাহারের। আগত সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অত্যাচার নীরবে সইতে থাকেন তিনি। তবে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন, সন্তান প্রসবের পর একটা ব্যবস্থা তিনি করবেন। এমনকি সুজনকে জেলের ভাত পর্যন্ত খাইয়ে ছাড়বেন।
 
অত্যাচারের কথাগুলো নাহার কখনোই তার বাবা-মাকে জানাতেন না। কারণ এসব খবর জানালে হয়তো তার বাবা-মা প্রতিবাদ করবেন। তখন হিতে বিপরীত হতে পারে। তাছাড়া সুজনও সাবধান করে দিয়েছিলেন যে, এ বাড়ির খবর যেন কোনভাবেই তার বাবা-মার কানে না যায়।
 
সন্তান প্রসবের একমাস আগে নাহারকে তার বাবা-মার কাছে রেখে আসেন সুজন। নাহারের চোখজোড়া যেন আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বন্দির যেরকম অনুভূতি হয় সেরকম মনে হয়েছিল নাহারকে। অনেকদিন পর মেয়েকে দেখে বাবা-মার চোখে যেন আনন্দের বন্যা বয়ে যেতে লাগল। কয়েকদিনের মধ্যে নাহার বাবা-মার কাছে সব ঘটনা খুলে বললেন। তারা হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। মানুষ কী এমনই হয়। পশুরও অধম। মেয়ের সিদ্ধান্তে সায় দিলেন তারা। কখনোই আর শ্বশুরবাড়িতে পাঠাবেন না।
 
মাস-খানেক পর নাহারের কোলজুড়ে আসে এক কন্যা সন্তান। নাহার নবজাতকের গালে চিবুক রেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। এর কিছুদিন পর উকিলের সাথে পরামর্শ করে সুজনের নিকট ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেন তিনি।
 
নাহারের এবার সামনে যাওয়ার পালা। এতদিন প্রতিবাদ না করতে পারলেও এখন প্রতিশোধ নেবার সময় এসেছে। কারণ নাহারের জীবন থেকে বেশ কটি বছর নষ্ট হয়ে গেছে। মেয়ের বয়স যখন দেড় বছর তখন বাবা-মার নিকট মেয়েকে রেখে বুকে পাথর চাপা দিয়ে ঢাকায় রওনা দেন তিনি। সেখানে একটি কলেজে আবার উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হন তিনি।
 
সুযোগ বুঝে মেয়েকে পাওয়ার জন্য সুজন আদালতে মামলা করেন। নাহারও জানতে পেরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে সুজনের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি মামলা করেন। তারপরও তিনি নিরুপায়। কারণ কখন যে, আদালত সুজনের পক্ষে রায় দেন সে চিন্তা তিনি চিন্তিত।
 
একদিন মামলার শুনানিতে হাজিরা দিতে এসে হাজিরা শেষে আদালত চত্বরে মেয়েকে দেখতে চাইলে বাক্‌বিতণ্ডায় জাড়িয়ে পড়েন নাহার ও সুজন। এক পর্যায়ে নাহারের গায়ে হাত তোলার উপক্রম হলে উপস্থিত জনতা সুজনকে থামিয়ে দেন। তিনি রাগে গর গর করে বলেন,
-রায়টা হাতে পেয়ে নিই দেখাব মজা।
মজা কে কাকে দেখায় সে অপেক্ষায় থাক।
নাহার বলেন।
-কী করবে তুমি আমাকে? কিছুই করতে পারবে না।
সুজনের পাল্টা জবাব।
-আমিও তোমাকে দেখিয়ে ছাড়ব। মেয়েকে তো পাবেই না বরং একদিনের জন্য হলেও তোমাকে জেলে পুরব। এ আমার দৃঢ প্রতিজ্ঞা
নাহারের চোখ দিয়ে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বের হয়। সুজন অট্টহাসি দিয়ে বলেন,
-সে প্রতিজ্ঞা তোমার কোনদিনই পূরণ হবে না নাহার। আর আমার মেয়েকে আমি একদিন পাবই।
নাহারও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে আদালত চত্বর ত্যাগ করেন। ইতিমধ্যে দীর্ঘদিন আদালতে মামলা জট পড়ে যায়। সুজন সাময়িকভাবে মেয়েকে নেওয়ার এখতিয়ার হারিয়ে ফেলেন।
 
নাহার উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। মাঝে মাঝে বাড়িতে এসে মেয়েকে দেখে যান। সুজন মাঝে মাঝেই ফোনে নাহারকে শাসান। কিন্তু নাহার এতে কোন কর্ণপাত করতেন না। কারণ, তিনি এখন আইনের বই নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন। আইন আদালত সম্পর্কে তিনি অনেকটাই ওয়াকিবহাল।
 
এক শুভক্ষণে নাহার ওকালতি সম্পন্ন করেন। তারপর হাইকোর্টের একজন সিনিয়র উকিলের সাথে জুনিয়র হিসেবে ওকালতি পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। তার মনে এখন একটা স্বপ্ন আইনগতভাবে মেয়েকে তার নিকট পাওয়া।
 
এবার নাহার অত্যাচারিত হিসেবে নয়, আইনজীবী হিসেবে বাড়িতে ফিরেছেন। সুজন ও নাহারের করা মামলা দুটোই ফাইল চাপা পড়ে আছে। তিনি মামলার নথিটি আবার মুভ করান। নিজেই সেই মামলার আইনজীবী হিসেবে শুনানি শুরু করেন।
 
দুটো মামলারই বিভিন্ন তারিখে বেশ কয়টি শুনানি হয়েছে। অবশেষে মহামান্য আদালত নাহারের পক্ষে রায় দেন। মেয়ের আইনগত অভিভাবক হন নাহার এবং সুজনকে নারী নির্যাতনের দায়ে জেল হাজতে প্রেরণ করেন।
 
~~000~~

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)