বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪৫তম সংখ্যা/২৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
বীথিকা ঘোষ
ক্ষণিকের অতিথি
[২য় পর্ব]
"এভাবেই বাসি ছাই মাখাতে হবে, তারপর রৌদ্রে শুয়িয়ে রাখবি, দু’ মাসের মধ্যে হাঁটতে পারবে। তোর স্বামীও ভাল হয়ে গেছে, আরও কিছু দিন পর গিয়ে নিয়ে আসবি। তোর মন এত ভাল এত পবিত্র, মানুষের এত উপকার করিস তোর ক্ষতি কেউ করতে পারবে না"
পূর্বানুবৃত্তি বাগানের ম্যানেজারের ভাইপো কানু চাকরির সন্ধানে এসেছে। কানুর পরামর্শে ডাক্তারের
কথায় কোম্পানির থেকে সব ব্যবস্থা হল একেবারে প্লেনের টিকিট পর্যন্ত। তারপর…
প্রায় দেড় মাস হয়ে
গেল এখনো কোন ইম্প্রুভ হয়নি, বড়দি অভিমান করে চিঠি
লিখেছে ‘আমরা থাকতেও এমন কাজ কী করে করলি? শরীর একদম ছেড়ে দিয়েছে তারপর আমাদের কথা মনে পড়লে, এখন সম্পূর্ণ ভাল হতে দেরি হবে। এতগুলো ছেলে-মেয়ে নিয়ে একা একা কী করছিস কে জানে, খুব চিন্তা হচ্ছে রে অরু, কাছের রাস্তা তো নয় যে দৌড়ে গিয়ে তোদের নিয়ে আসব।’ চিঠি পড়তে
পড়তে কান্না পেয়ে গেল অরুণার কিন্তু বাচ্চাদের সামনে
কাঁদতেও পারে না। মা'র কান্না দেখে
বাচ্চারাও কান্না জুড়ে দেবে, বাগানের অন্য
স্টাফদের বাড়ি থেকে সবাই সবসময় খোঁজ খবর করে,
বিকেলে
অনেকে এসে আড্ডা দেয় সেই সময় দমচাপা ভাবটা একটু কম থাকে কিন্তু ওরা চলে গেলেই সেই
দমবন্ধ ভাব, নিশ্বাসের কষ্ট হতে থাকে।
প্রায় দু’ মাস পার হয়ে
গেল কিন্তু কোথায় ভাল খবর, কী যে হবে আমাদের, কোলের ছেলেটা কাঁদছিল ওকে নিয়ে আদর-টাদর করে
বারান্দায় একটি ছোট বিছানার মতো আছে সেখানে শুইয়ে দিয়ে কেবল উনান ধরাবার জন্য হাত
দিয়েছি ঠিক সেই সময় ঘরের পাশ দিয়ে মেথর, কাজের লোকেরা ঢোকে সেই পথ দিয়ে কেউ ঢুকছে মুখে উচ্চারণ করলেন ‘জয় শিব
শম্ভু, জয় মাতাজি’ থতমত খেয়ে
ঘোমটা টেনে জিজ্ঞাসার দৃষ্টি মেলে বলি, 'আপ কৌন হ্যায় বাবাজি?' মত ডরো বেটি, ম্যায় হিমালয় সে আয়া,
তু ইতনি
ডরী হুয়ি থি, এতনি রো রহি থি ম্যায় রহ নেই
পায়া। ইসিলিয়ে চলা অ্যায়া, তেরি মরদ অউর বেটা দোনো আচ্ছা হো
জায়গা।’ আমি মনে মনে ভাবলাম আমার সংসারের কথা উনি জানতে
পারলেন কী করে! এই দেবদূতদের সাথে আমার
কথোপকথন। আমি ভাবছি—
কী
কন্দর্পকান্তি চেহারা, কী রূপ তাঁর যেন জ্যোতি ছড়িয়ে পরছে চারপাশে। আমার মনে হল
স্বয়ং শিব ঠাকুর ধরায় নেমে এসেছে। আমি তখন ঘামছি, কী করব বুঝতে পারছি না। রান্নাঘরের বারান্দা থেকে মোড়াটা এগিয়ে দিতে গেলাম। উনি
হেসে বললেন, ‘এতে বসতে পারব না, কাঠের কিছু থাকলে…’ আমি ঠাকুরঘর থেকে কাঁঠাল কাঠের একটি বড়
পিঁড়ি আঁচল দিয়ে মুছে বসতে দিলাম। উনি খুশি হয়ে যোগাসনে
বসলেন। তখন তো আরও মনে হল, উনি স্বয়ং শিব ঠাকুরই
বসে আছেন। কিন্তু ক্ষণিকের জন্য তারপরই উঠে গিয়ে উনান থেকে এক মুট ছাই নিয়ে ছেলের
দুই পায়ে মাখাতে লাগলেন। বললেন, ‘এভাবেই
বাসি ছাই মাখাতে হবে, তারপর রৌদ্রে শুয়িয়ে
রাখবি, দু’ মাসের মধ্যে
হাঁটতে পারবে। তোর স্বামীও ভাল হয়ে গেছে, আরও কিছু দিন পর গিয়ে নিয়ে আসবি। তোর মন এত ভাল এত পবিত্র, মানুষের এত উপকার করিস তোর ক্ষতি কেউ করতে পারবে না, ছেলে হাঁটতে পারবে এবং পড়াশোনায় খুব ভাল হবে, হয় অনেক ওপরে উঠবে নয়তো মাঝামাঝি থাকবে কিন্তু অনেক শত্রু
হবে, এই অতিরিক্ত পড়াশোনায় ভালর
জন্য লোকে হিংসা করবে, তার থেকে রক্ষা তোদেরই করতে হবে। কিছুই করার নেই আমার।’ বিধির বিধান খন্ডন করার ক্ষমতা নেই কার। আমায় হাত পাততে
বললেন, হাতের ওপর দুটো পাথর দিলেন
একটা জলপাইয়ের মতন শিবমূর্তি বললেন, বাণেশ্বর
শিব মূর্তি অপরটি দশ হাতের দেবীমূর্তি। চকচক করছে কালো পাথরের তবে ছোট্ট মূর্তি।
হঠাৎ কতগুলো দূর্বাঘাস তুলে এনে হাতে মুঠ করে ধরে কী বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ল ফুঁ দিল, টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ল, মুখে হাসি ফুটে উঠল। তারপরই খোলা দু’ হাত ঘাড়ের দু’ পাশে তুলে এমন ভাবটা করল যেন সব ঠিক হয়ে গেছে। আমি
জল বাতাসা দিলাম, খুশি হয়ে খেয়ে নিলেন
মুখে বললেন, ‘এবার ফিরে যাব, আর থাকার অধিকার নেই।’ রৌদ্রের ছায়া দেখালেন, নিমেষে বেরিয়ে গেলেন। আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম
খানিকক্ষণ তারপরই দৌড়ে বের হলাম কিন্তু কেউ কোথাও নেই। পাগলের মতো সবাইকে জিজ্ঞেস
করতে লাগলাম গেরুয়া পোশাক পরা কোন সন্ন্যাসীকে দেখেছ? কেউ বলতে পারল না তার সন্ধান, কী আশ্চর্য 'ক্ষণিকের অতিথি' হয়ে এসে আমার আমূল পরিবর্তন করে দিয়ে গেলেন। আমার
জীবনীশক্তি এত বাড়িয়ে দিয়ে গেলেন আর পেছনে ফিরে তাকাতে হল না। এই নিয়ে অনেক দিন
বিচারবিশ্লেষণ করেও এর কোন সদুত্তর পাওয়া গেল না। বাগান থেকে বেরতে গেলে অনেকটা পথ
হাঁটতে হয়, সে পথেও কেউ দেখতে পায়নি, নিমেষে কোথায় উবে গেলেন। এমনই বোধহয় হয় ‘বিশ্বাসীকে
দেখা দেন কিন্তু তার কাছেও ধরা দেন না!’
ইএমফস্টার তার ‘এ প্যাসেজ টু
ইন্ডিয়ায়’ লিখেছিলেন শিব মন্দির দর্শন করার পর, ‘ইহাই ভারতবর্ষ, ইহাই ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিকতা!’
~~000~~

অনেক দিন পর একটা মন ভালো করা লেখা পড়লাম, সত্যি কখন যে ' ক্ষণিকের অতিথি ' এসে কৃপা করে যান জীবনে, বোঝা যায় না ।
ReplyDelete