বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪৫তম সংখ্যা/২৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
মনোজ চ্যাটার্জী
পেয়ারাবাগানের
অতিথি
[২য় পর্ব]
"বিষ্টুর ঝোপে আলো পড়ে। বুঝতে পারে তাকে দেখে ফেলেছে। মুখ কাঁচুমাচু করে সে বেরিয়ে আসে। লোকটা তার জোরালো টর্চের আলোয় তার আপাদমস্তক দেখতে থাকে। তার পায়ে জড়ানো মস্ত ক্রেপ ব্যান্ডেজটা ভাল করে দেখতে থাকে।"
পূর্বানুবৃত্তি বেপরোয়া বাইকের ধাক্কায় গুরুতর আহত বিষ্টুপদর একটা পা
দুর্বল হয়ে যাওয়ায় সে আর আগের মতো রিকশা চালাতে পারে না। প্যাসেঞ্জার তার রিকশা এড়িয়ে
চলে। এভাবেই চলতে চলতে এক সময় অধৈর্য হয়ে পড়ে। তারপর…
বাহ্! কী সুন্দর বড় বড় ডাঁশা পেয়ারা ধরে আছে। সে
একটু ভেতরে ঢুকে সবচেয়ে কাছের একটা পেয়ারা পাড়ার
জন্য গাছের ডাল ধরে নড়াচড়া
করতেই,
বিষ্টু হকচকিয়ে গিয়ে একটা ছোট
পেয়ারা ঝোপের আড়ালে লুকোয়।
-কে, কে ওখানে পেয়ারা চুরি
করছে?
ডাকটা এগিয়ে আসছে একটু একটু
করে। ঝোপের আড়াল থেকে বিষ্টু দেখে লম্বা রোগা বয়সের ভারে বেঁকে যাওয়া একটা লোক বড়
লাঠি নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে আসছে। দূরে গাছের আড়ালে একটা ছোট্ট
কুঁড়েঘর দেখতে পায়। খোঁড়াতে
খোঁড়াতেও খুব তাড়াতাড়ি লোকটা তার কাছে চলে এল। ডানহাতে শক্ত লাঠি, বাঁহাতে ছোট কিন্তু জোরালো আলোর একটা টর্চ। এদিক-ওদিক আলো
মারছে, কিন্তু এখনো তাকে দেখতে
পায়নি।
-কোথায় লুকিয়ে আছ চোরবাবাজি। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসো, পালানোর চেষ্টা করনি। ওদিকের লোককে খবর করা আছে, ধরা পড়লে মেরে তোমার হাড়গোড় ভেঙে দেবে।
বিষ্টুর ঝোপে আলো পড়ে। বুঝতে
পারে তাকে দেখে ফেলেছে। মুখ কাঁচুমাচু করে সে বেরিয়ে আসে। লোকটা তার জোরালো টর্চের
আলোয় তার আপাদমস্তক দেখতে থাকে। তার পায়ে জড়ানো মস্ত ক্রেপ ব্যান্ডেজটা ভাল করে
দেখতে থাকে। দূরে জ্যোৎস্নার হালকা মিঠে আলোয় রিকশাটাও লোকটার চোখে পড়ে।
-উরিব্বাস্! একেবারে রিকশা নিয়ে এসেছ। তা সুমুন্দির পো, অতদূরে রিকশা রেখে তুমি ক’ বস্তা মাল তুলবে?
-না, না বিশ্বাস করো আমি
পেয়ারা চুরি করতে আসিনি।
-তা কেন, এই ভরসন্ধেয় তুমি তো
আমার বাগান পাহারা
দিতে এসেছ, শালা হারামজাদা
কোথাকার! আবার ঢং করে পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধেছে শালা। আর একটা মিথ্যে বললে তোমার ওই খোঁড়া
পায়েই মারব এক লাঠি।
বিষ্টু তার হাতেপায়ে ধরে অনেক
অনুনয়-বিনয় করে তার পালিয়ে আসার সব কথা বিশেষ করে রিকশার লাইনের প্রথমে হতাশ ভাবে
দাঁড়িয়ে থাকার কথা বলে।
-রিকশাটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল, এ তো পাকা চোর নয়,
তা খিদে
পেয়েছে তো পেয়ারা খাচ্ছ যে বড়, দুটোর বেশি তিনটে খেলেই
তো পেট ছাড়বে। চলো আমার ঝুপড়িতে চলো,
দেখি এই
অসময়ে তোমাকে কী খাবার দেওয়া যায়। পালানোর চেষ্টা করবে না কিন্তু।
-না, পালিয়েই তো এসেছি, নতুন করে আর কী পালাব।
-চুপ করো, শুধু জেনো এই
জগৎসংসার থেকে পালানোর কোন রাস্তা নাই।
লোকটার ঘুপচি ঘরে ঢুকে বিষ্টু
দেখতে পায় চারপাশে এলোমেলো ঘরের জিনিসের মধ্যে এক কোণে একটা ছোট খাটে লোকটার
রুগ্ন পঙ্গু বৌ শুয়ে আছে। মাঝখানে কিছুটা ফাঁকা জায়গা, লোকটা বোধহয় মাটিতে বিছানা করে শোয়।
-অ্যাই নাও, সকালের একটু বাড়তি
পান্তাভাত, শাকচচ্চরি আছে, এই খাও, এর বেশি তোমাকে আর
কিছু দিতে পারলুম না।
-আমার না খেলেও হবে,
তোমাদের
কম পড়ে যাবে।
-না খাও, কম পড়বে না।
যাইহোক বিষ্টু বেশ তৃপ্তি করে
খেল। খাওয়ার পর কিছুক্ষণ লোকটার সাথে কথা বলছিল,
-তুমি বাপু আর রাত করো না, এদিকে চারপাশ ফাঁকা, কোথায় কী হবে বলা যায়
না, তাড়াতাড়ি রিকশা নিয়ে বাড়ি চলে
যাও।
বিষ্টু আবার তার রিকশায় চলতে
শুরু করে, পায়ের ব্যথাটা আছে কী নেই, ঠিক বুঝতে পারছে না। বাইপাসে উঠেই সে এক টান মেরে পায়ের
ক্রেপ ব্যান্ডেজটা রাস্তার ধারে ফেলে দিল। তার রিকশাটা সাঁ সাঁ করে এগিয়ে যাচ্ছে
স্ট্যান্ডের দিকে। প্রথমে গিয়ে দাঁড়াতে হবে।
~~000~~

No comments:
Post a Comment