বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪৫তম সংখ্যা/২৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
মমিনুল পথিক
রমিজা
বেওয়া
[২য় পর্ব]
"গোলামের ব্যাটা গোলাম, সারাদিন তোক মুই খুঁজি মরো, তুই কোন সাগাইয়ের বাড়িত মরবার গেছিলু। এ্যালাই আইসে কস মোক ভাত দেও। এ্যালাই ভাত হবার নয়। তোর বাপ আসুক আইতত হইবে এ্যালা।"
পূর্বানুবৃত্তি খবিরের ছোটবেলায় মা মারা যায়। বাবা সগির আলী আবার বিয়ে
করে। সৎমা জরিমন আগের পক্ষের ছেলের বিরুদ্ধে স্বামীর কান ভারী করতে থাকে। তারপর…
বুড়িকে গোয়াল ঘরে রেখে ঘাড়
হতে গামছা আর লুঙ্গিটি উঠোনের দড়িতে ছড়িয়ে দেয় খবির আলী। ডোবা থেকে গোসলটিও সেরে
এসেছে সে। বড্ড খিদে পেয়েছে তার, একেবারে পেট চোঁ-চোঁ
করছে। কিন্তু কী করে
যে মাকে বলবে? এমনিতেই সে আজ কামলা
দিতে যায়নি, যদি ভাত না দেয়? সাহস হচ্ছে না তার। খিদে পেটে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে। কিছু ভাল
লাগে না। এবার সাহস করে জরিমনের কাছে এসে বলল,
-মা মোক ভাত খাবার দেওতো।
কাঁথা সেলাই করতে ঘরের দরজায়
বসেছিল জরিমন। খবিরের কথা শেষ না হতেই মূহূর্তের মধ্যে সুঁইটি কাঁথার মধ্যে আটকে
রেখে গোখরা সাপের মতো ফণা তুলে বলে উঠল,
-গোলামের ব্যাটা গোলাম,
সারাদিন
তোক মুই খুঁজি মরো, তুই কোন সাগাইয়ের
বাড়িত মরবার গেছিলু। এ্যালাই আইসে কস মোক ভাত দেও। এ্যালাই ভাত হবার নয়। তোর বাপ
আসুক আইতত হইবে এ্যালা।
খবির হাল ছাড়ার পাত্র নয়।
আবার ঘ্যান ঘ্যান করে ভাতের জন্য। বারান্দার চালের বাতা ধরে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে
থাকে সৎমা জরিমনের দিকে। হাজারো হলেও মায়ের জাত জরিমন। হৃদয়ের জমাট বাঁধা বরফগুলো
অজান্তেই কেমন গলে যায়। তবুও খবির আলীর দিকে চোখ পাকিয়ে বলল,
-থালি খান আকলিয়া পানি ধরি আয়।
খবির আলী আয়রন পরা বাদামি
বর্ণের একটি স্টিলের থালা ধুয়ে জরিমনকে দেয়। জরিমন আধা থালা
ভাত আর শাক জাতীয় একটু তরকারি দিয়ে বলল,
-ডালার মাঝত আকালি আছে,
নাগলে
নিস।
খবির আলী গপাগপ ভাতটুকুন খেয়ে
ফেলল। পেট ভরল কী না সে-ই জানে। রাতে স্বামী বাড়ি ফিরলে জরিমন খবির আলীর ব্যাপারে অনেক
কথায় কান ভারি করল। তাতে তার বাপের ভিটা ছাড়ার উপক্রম হল। তবুও কষ্ট করে সৎমায়ের
গঞ্জনা আর বাপের অবহেলা সহ্য করে নিয়তির কাছে নতি স্বীকার করে থাকে।
এখন খবির আলী বাপের সাথে
নিয়মিত কামলা দিতে যায়। বাপ-বেটার কামাইয়ে দু’বেলা পেট পুরে খেতে পায় সবাই।
মাঝেমধ্যে রমনার বাজার হতে বাছনাপড়া কিছু মাছ-মাংস কিনে আনে সগির আলী।
উদ্ভিজ্জ আমিষ কচুঘেঁচুর সাথে প্রাণিজ আমিষের কদাচিৎ সংমিশ্রণ ঘটে। সর্বগ্রাসী পেট
ভালমন্দ চালান নিয়ে তৃপ্ত হয়। সগির আলীর চোখ জোড়া পূর্ণিমার চাঁদের মতো ঝলমল করে
ওঠে। আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করে।
(৩)
সময় আর স্রোত কার সাধ্যি আছে
আটকে রাখে? এভাবে কালের গর্ভে বিলীন হয়
আরো কয়টি বছর। খবির আলী জাঁতাকলের মতো পিষ্ট হতে থাকে সৎমায়ের সংসারে। কলুর বলদের মতো
খাটুনি করেও তার মন ভরাতে পারত না। সে যেন সৎমায়ের চোখের বালি।
সগির আলী পড়ে যায় মহাবিপদে।
তার জীবন নদীর এক কুলে মা মরা ছেলে, অন্য কুলে স্ত্রী।
কিন্তু তাকে যে দু কুলই রক্ষা করতে
হবে। ভাগ্যিস মেয়েটিকে আগেই বিয়ে দিয়েছিল। স্বামীর বাড়িতে কষ্ট হলেও অন্তত সৎমায়ের
জ্বালা থেকে রেহায় পেয়েছে সে।
এদিকে জরিমনের কোলের শিশুটি
ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে। এখন জরিমন সব সময় তার ছেলের প্রতিপক্ষ মনে করে খবির
আলীকে। জরিমনের এহেন ব্যবহার দেখে বড়ই চিন্তায় পড়ে সগির আলী।
শ্রাবন মাস। পুরোদমে আমন
ধানের রোয়া লাগানো চলছে। পাশের গ্রাম কৃষ্ণপুরের নমিরুদ্দিন অনেক দিন ধরেই সগির
আলীর সাথে কামলা দেয়। গতকাল এলাকার তালুকদার লতিফ চৌধুরীর পাঁচ বিঘা জমি কয়েকজন
মিলে রোয়া লাগানোর চুক্তি নিয়েছে। অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। সকাল থেকেই রোয়া
লাগানোর কাজ করছে চারজনে। বৃষ্টির ছন্দের তালে পল্লীগীতি আর ভাওয়াইয়া গানে সারা
মাঠ যেন মুখরিত হয়ে উঠেছে।
অনেকক্ষণ যাবত বৃষ্টির পানিতে
ভিজে খবির আলীকে খুব ঠান্ডা লেগেছিল। চারার আঁটি খুলতে খুলতে ভাবে একখান বিড়ি খাবার পাইলে ভাল হইতো, গাখানও গরম হয়া যাইত। কিন্তু আব্বা? তবুও চালাকি করে সগির আলীকে বলে,
-আব্বা মুই এ্যাকনা জঙ্গল থাকি আসবার নাগজো।
সগির আলী মূর্খ হলেও ছেলের
ব্যাপারে তার কাছে পানির মতো পরিষ্কার। লুঙ্গির প্যাঁচের ভেতর পলিথিন থেকে এক
টাকার একটি ময়লা নোট বের করে বলল,
-ফিরার সমায় পাশের দোকান থাকি এক প্যাকেট বিড়ি ধরি আনিস, বাঁকি পাইসা চাইলে কস আব্বা পরে শোধ করি দিবে। এ্যালাই খুব
ঠান্ডা নাগবার নাগজে।
খবির আলী জঙ্গল থেকে ফেরার পর
সকালের নাস্তা চলে আসে। পান্তাভাত আর খেসারি ডালের ভর্তা; সাথে কাঁচা মরিচ ও পিঁয়াজ। জমির আইলের উপর পান্তা নিয়ে বসে
চারজন। যেই পান্তা খাওয়া শুরু অমনি শ্রাবনের স্বভাব সুলভ বর্ষণ। পান্তার ঝোল
আর বৃষ্টির পানি মিলে থালা ভরে একাকার হয়ে যায়। ক্ষুধা পেটে সবই সমান।
খাওয়া শেষে কাদামাখা লুঙ্গির
নিম্নাংশ দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে সগির আলীকে উদ্দেশ্যে করে বলে নমির উদ্দিন,
-বিহাই মুই তোমাক এ্যাকনা কথা কবার চাঁং।
-তোমরা ফির কী কবার চান?
পান্তার ঢোঁক গিলতে গিলতে
বলে সগির আলী।
-না, তেমন কিছু না। তোমার ছাওয়া তো বিয়ার লায়েক হলো বলে, বিয়া দিবা নাগবার নয়?
-দুর বিহাই
তোমার চোখ না চুলা। ছাওয়ার মোর বিয়ার বয়স হইচে নাকি?
-এর চেয়ে ছোট
ছাওয়া বিয়া করিয়া বাপ হইবার নাগিল। আর তাছাড়া তোমার বাড়িত এ্যাকনা সমস্যাও আছে।
ঘরে সৎমা। ছাওয়া তোমার কামাই করিবার নাগজে, বিয়া দিয়া জুদা করি দেও, ছাওয়ার ঝামেলা একি
বারে চুকি যাইবে।
-তোমরা ঠিকই
কইছেন বিহাই। মুইতো আগত ওইরকম চিন্তা করো নাই।
নমিরুদ্দিন অশিক্ষিত হলেও
চালাক। রমিজার সাথে খবির আলীর বিয়াখান দিবার পাইলে ভাল হয়। বিড়ি টানতে টানতে ভাবে।
রমিজা নমিরুদ্দিনের বড় মেয়ে।
কেবল গায়েগতরেই বড় হয়েছে সে। বয়স বা কতই হল তার। গেল বানের সময় জন্ম। ঘরের মধ্যে
বানের পানি ঢুকে যাওয়ায় ঘরের এক কোণে বাঁশের মাচায় ভুমিষ্ঠ হয়। এই
কয়েক বছরে লাউয়ের ডগার মতো তরতর করে বেড়ে উঠেছে সে। পড়তে থাকলে এতদিনে হাইস্কুলে
যেত। কিন্তু গ্রামের স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে আর যায়নি। মক্তবে আমপারা
পর্যন্ত ছবক নিয়েছে। নমিরুদ্দিন মনে করে, বেটি হামার যা শিখবার নাগজে তাই ম্যালা,
দুই কাল
এমনেই পার হয়া যাইবে।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment