বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪৪তম
সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি
| ছোটগল্প
অদিতি চ্যাটার্জি
অন্তর-বাহির
"ইঁদারা থেকে জল তুলে ঝপ করে একবার ঝুমুর একবার মুনমুনকে স্নান করিয়ে দিল অরুণবাবু। পাতলা ভেজা টেপ জামা পরে দু’জনেই হি হি করে হাসছে। কোন ক্লাস থ্রি? ফোর? বড়দের যে কী হয়?"
-মা কী গো দ্যাখো মুনমুন এসেছে...
-মা ও মা।
ঝুমুরের অসহায় ডাক। আহ্ রোদ
পোহাতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ফুলকপি দিয়ে কই মাছের পাতলা ঝোল বড় ভাল রান্না করেছে
মেয়ে আজ, ভাইঝিকে খেতে বলেছেন
শান্তিলতা, কিন্তু ওই শরীরটা তো
বশেই নেই, মোহনার দিকে যাওয়ার
পথে এখন। গ্রাসটা মুখে দিয়েই মনে পড়ে গেল ঠাকুমার কথা।
-মুনমুন জানিস আমার ঠাকুমা না কই মাছটা বড় ভাল রান্না করত।
বড়ি দিত তার মধ্যে। আমি যখন রানাঘাট থেকে বৈঠকখানা বাজারে আমাদের ওই বাড়িতে
যেতাম, রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে
দেখতাম লাল সিঁদুরের টিপ কপালে ফর্সা হাতে সোনার বালা এক মাথা কাঁচা-পাকা চুলে
আমার সুন্দরী ঠাকুমা কী ভালবেসে রান্না করে আমাদের ভাত বেড়ে
দিচ্ছে। মুনমুন আর যাওয়া যায় না,
না রে
সেই সুরেন্দ্র নাথ কলেজের গলিতে, সেই বাড়িতে?
ভাতগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করে
যান শান্তিলতা। খিদেটা মরে গেল। চন্দনবাবুর হয়েছে বউ নিয়ে এক জ্বালা, সেদিনের সেই ডাকাবুকো মেয়েটা যার কর্মক্ষমতা, দাপটের চোটে মাঝেমধ্যে কাবু হয়ে যেতেন আজ কী করুণ পরিণতি তাঁর! এই তো চুটিয়ে প্রেম করে বিয়ে করে আনলেন শান্তিলতাকে। মনে আছে
সুরেন্দ্র হলে দু’জনে বিয়ের পর পর 'মুকাদ্দার কা সিকান্দার' দেখতে গেছিলেন। মনে মনে রাখীর মতো একটা বউ কী প্রেমিকার বড়
ইচ্ছে ছিল চন্দনবাবুর। তা রাখীর মতো নাহলেও শান্তি তো সুন্দরী, রসিকা একটা মেয়েই ছিল। আজ কে বলবে এই মানুষটাকে দেখলে! এখন
তো বাথরুমে যেতে গিয়েও অনেক সময় সামলাতে পারেন না। চোখটা করকর করে ওঠে চন্দনবাবুর।
-মা দ্যাখো কই মাছ তো তোমার প্রিয় মাছ, খাবে একটা? খাও-না! একটু ঝোল
দিই, সাদা ভাতগুলো মাখো-না গো...
-পিসি...
চমকে ওঠেন শান্তিলতা,
-একি এত বড় মাছটা দিলি কেন?
বড় বিরক্ত লাগে এদের! এই তাঁর
নাতি চলল এখন আবার হইচই করবে। শান্তিলতা বোঝাতে পারেন না আজকাল তাঁর মনটা ঠিক বশে
নেই। মনে হয় কেউ বোধহয় মনের গায়ে ভেজা কম্বল জড়িয়ে রেখেছে। অনিচ্ছা নিয়েও ভাতগুলো
শেষ করেন শান্তিলতা। ঈশ্বরের কৃপায় তাঁর কোনো অন্ন কষ্ট নেই, তবু ভাতের একটা কণাও ফেলতে পারেন না শান্তিলতা।
তিনটে বেজে গেছে, দালানে রোদটা এসে পড়েছে, চেয়ারটা নিয়ে বসলেন। ভাগনিটা আঙুর এনেছে,
মেয়ে কয়েকটা
দিল। কী সবুজ! রসাল! মুখের ভেতরটা লালা-রসে জড়িমড়ি করে গেছে... বড় তৃপ্তি! বড়
তৃপ্তি!
সামনে তাকান, ইঁদারাটা বন্ধ
করে দেওয়া হয়েছে বুবলির বিয়ের পর, কাঁঠাল গাছ আর একটা
নারকেল গাছ আছে এখন। ভাড়াটেদের ঘর-বাথরুমটা ভেঙে দিয়েছে কবেই, হয়তো পরে বুবলি,
ঝুমুররা
এইসব ঘর-দালান ভেঙে ফ্ল্যাট বানাবে। বানাতেই পারে। শান্তিলতার নিজের বাড়িটা কোথায়
ছিল ঘটক পাড়ায়, বৈঠকখানা বাজারে নাকি
বহরমপুরে? ইশশ যারা বলে
দিতে পারত তাঁরা সবাই শান্তিলতাকে ছেড়ে অন্য পৃথিবীতে চলে গেল! নিষ্ঠুর কোথাকারের!
-মা কী বলছ? এই তো মুনমুনকে দেখব
বলে ব্যস্ত হয়ে পড়লে এখন কথা বলো? একি!
ঝুমুরের অসহায় লাগে নিজেকে। ও
জানে মা-র শরীরের কোনো সমস্যা নেই কিন্তু মনটাই অকেজো হয়ে পড়ছে দিন দিন। বোনকে বলে,
-বোস তুই তোর পিসির কাছে আমি আসছি।
মুনমুন খুব নরম করে ডাকে,
-পিসি...
সম্বিত ফেরে শান্তির, একটু হাসেন।
-মুনমুন তুই
তোর মাকে স্বপ্নে দেখিস?
প্রায় চল্লিশ ছোঁয়া মুনমুন
ভেবলে যায়, ও বুঝতেই পারছে না পিসি ঠিক কী বলছে! ভুরু
কুঁচকে তাকিয়ে থাকে মানুষটার দিকে,
চুলে
কাঁচার সংখ্যা অবিশ্বাস্য হলেও বেশি, ক্রিম তেল না মাখলেও
চামড়ায় রুক্ষ্মতা কম, তবু পিসি বয়সের
তুলনায় বুড়ি হয়ে গেছে, সেটা কী অসুখে নাকি
মনের কোনো চাপা কষ্টে! কথা ঘুরিয়ে মুনমুন জানতে চায়,
-কেন বল-তো পিসি? তুমি ঠাকুমাকে দ্যাখো
স্বপ্নে?
-না রে, তবে বৌদিকে দেখি এখন
মাঝে মাঝে। এই পাশে এসে বসল, এই অন্য ঘরে চলে গেল।
জানিস ঘটক পাড়ায় যেখানে আমরা থাকতাম বিয়ে করে এসে তোর মা আগে সিদ্ধেশ্বরী কালী
বাড়িতে প্রণাম করে সেই বাড়িটাতে পা দিয়েছিল। খুব স্বপ্নে দেখি, জেগে জেগেও দেখি। মুনমুন তুই আর ওই বাড়িটা
দেখিসনি না?
মুনমুন ভাবে ওপরে বসে আছে খুব
রসিক কেউ, নাহলে পাকেচক্রে ওর এমন
জায়গায় বিয়ে হয়! ও তো সিদ্ধেশ্বরী কালী বাড়িতে প্রণাম করতে গেছিল বিয়ের পর। ও শোনে
পিসি আপন খেয়ালে বলে চলেছে,
-এক ভাই, এক বোন ছিলাম আমরা। দাদা কত
তাড়াতাড়ি চলে গেল, বৈঠকখানা বাজারের
বাড়ি, ঠাকুমা, দাদু, অঞ্জলি সবাই সবাই চলে
গেল। একটা সময় তোরা দূরে ছিলিস কিন্তু আমি জানতাম তবু বৌদিটা আছে, তুই আছিস। কিন্তু এখন শুধুই তুই আছিস আমার, আর কেউ নেই। কত কথা হারিয়ে যাচ্ছে, কত ঘটনা ছুঁতে যাই, পিছলে চলে যাচ্ছে, সারাদিন ধরে ওদের পেছনে ছোটাছুটি করে যাই কিন্তু তারপর হেরে
যাই। কেউ যদি একটু আমাকে ভুলে যাওয়া, ঝাপসা হয়ে যাওয়া
ঘটনাগুলো ধরিয়ে দিত শান্তি পেতাম রে...
ইঁদারা থেকে জল তুলে ঝপ করে
একবার ঝুমুর একবার মুনমুনকে স্নান করিয়ে দিল অরুণবাবু। পাতলা ভেজা টেপ জামা পরে দু’জনেই হি হি
করে হাসছে। কোন ক্লাস থ্রি? ফোর? বড়দের যে কী হয়? থমথমে মুখে মা মুখ ধুয়ে দিচ্ছে মুনমুনের। কবে থেকে পিসির বাড়ি আসা বন্ধ হয়ে
গেল? বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে তো
বটেই।
এখন কি মানুষটার কাছে চাইলেই
ছুটে আসতে পারে মুনমুন? দু’জন মুখোমুখি
বসে, একজন মোহনার দিকে এগিয়ে চলেছে, অন্যজনের জীবনে নদীতে জোয়ারভাটার খেলা চলছে মধ্য পর্বের।
তবু দু’জনে কোথাও গিয়ে একটা বিন্দুতে মিলে গেছে, মনের একটা কোণে বড় একা, ধু-ধু করছে সেখানটা। শুষ্ক মরুভূমিতে হেঁটে চলেছে দু’জন পাশাপাশি। শুধু ওরা দু’জন। চোখটা মোছে মুনমুন।
~~000~~

No comments:
Post a Comment